সরকারি জমিতে ভবন নির্মাণের অনুমোদন ছিল না: সাবেক ভূমি কর্মকর্তা দবির উদ্দিন - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

সরকারি জমিতে ভবন নির্মাণের অনুমোদন ছিল না: সাবেক ভূমি কর্মকর্তা দবির উদ্দিন

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: জুন ৮, ২০২৬

কুষ্টিয়া বিল্ডার্সের নয় তলা বাগান বিলাস-৪ 

 

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া শহরের বার্মিজ গলিতে ভিসা সেন্টারের সামনে সরকারি খাস জমি দখল করে ‘বাগান বিলাস-৪’ নামে নয়তলা বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে তৎকালীন ভূমি প্রশাসনের বক্তব্য। এ ঘটনায় মুখ খুলেছেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) দবির উদ্দিন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, সরকারি ওই জমিতে কোনোভাবেই ভবন নির্মাণের অনুমোদন ছিল না এবং দায়িত্বে থাকাকালীন সময়েই সরকারি অংশ আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় নির্মাণ প্রতিষ্ঠান কুষ্টিয়া বিল্ডার্স ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির পাশাপাশি সরকারি খাস জমির অংশেও ‘বাগান বিলাস-৪’ নামে বহুতল ভবনের অবকাঠামো নির্মাণ করেছে। যদিও বিষয়টি প্রশাসনিক তদন্তে উঠে আসার পরও বন্ধ হয়নি নির্মাণকাজ। বরং রহস্যজনকভাবে দ্রুতগতিতে নির্মাণ শেষ করে অধিকাংশ ফ্ল্যাট বিক্রি ও বসবাস শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২৩ নম্বর মজমপুর মৌজার ১৮৭/৮৯৫ খতিয়ানের ১৬৬৪ নম্বর দাগে আব্দুল সাত্তারের নামে মোট ০.১২৭৫ শতাংশ জমি রয়েছে। এর মধ্যে ০.১১৩৩ শতাংশ ব্যক্তি মালিকানাধীন হলেও অবশিষ্ট ০.০১৪২ শতাংশ সরকারি খাস জমি হিসেবে রেকর্ডভুক্ত।

অভিযোগ অনুযায়ী, ভবন নির্মাণের সময় সরকারি ওই অংশও ভবনের সীমানার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিষয়টি প্রথমে এলাকাবাসীর নজরে আসে এবং পরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। অভিযোগের প্রেক্ষিতে তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) দবির উদ্দিন তদন্ত শুরু করেন। তদন্তের অংশ হিসেবে পেন্টাগ্রাফ জরিপ পরিচালনা করা হয়। জরিপে এসএ রেকর্ড অনুযায়ী সরকারি খাস জমির অংশ আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। তবে তদন্ত চলাকালীন সময়েই দবির উদ্দিনের বদলির পর পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যায় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

তাদের দাবি, এরপরই রহস্যজনকভাবে দ্রুতগতিতে ভবনের নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই নয়তলা ভবনের নির্মাণ সম্পন্ন করা হয়। বর্তমানে ভবনটির অধিকাংশ ফ্ল্যাট বিক্রি হয়ে সেখানে বসবাসও শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে তৎকালীন ভূমি কর্মকর্তা দবির উদ্দিন বলেন, আমি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় ম্যাপ ও রেকর্ড অনুযায়ী সরকারি জায়গাটি স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে দিয়েছিলাম। ভবন নির্মাণ করতে হলে সরকারি অংশ বাদ রেখেই করতে হতো। সরকারি জমি অন্তর্ভুক্ত করে কোনো ধরনের নির্মাণের অনুমতি ছিল না। পরে কী হয়েছে, তা আমার জানা নেই। যদি সরকারি জায়গা ভবনের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে থাকে, তাহলে প্রশাসন অভিযান চালিয়ে জায়গাটি দখলমুক্ত করতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করে বলেন, সরকারি জমি দখল করে এত বড় একটি বহুতল ভবন নির্মাণ কোনোভাবেই সম্ভব নয়, যদি না প্রভাবশালী মহল এবং কিছু অসাধু কর্মকর্তা সহযোগিতা করেন। তাদের প্রশ্ন, তদন্তে সরকারি জমি চিহ্নিত হওয়ার পরও কেন নির্মাণকাজ বন্ধ করা হয়নি এবং কারা এর পেছনে প্রভাব খাটিয়েছে। এদিকে ভবন নির্মাণের সময় তৎকালীন পৌর কর্তৃপক্ষ যথাযথ তদারকি করেনি বলেও অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, ভবনের নকশা অনুমোদন, সীমানা যাচাই এবং সরকারি জমি দখলের বিষয়টি যথাযথভাবে খতিয়ে দেখা হয়নি।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে কুষ্টিয়া বিল্ডার্স-এর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। কুষ্টিয়া পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী (পূর্ত) এ কে সামসুজ্জামান বলেন, সে সময় ভবনটির নকশা কীভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল সে বিষয়ে আমার জানা নেই। তবে ভবনটি নয়তলা নির্মাণের অনুমোদনপ্রাপ্ত এবং প্রতিটি ফ্লোরের আয়তন ৩ হাজার ৭৩৬ বর্গফুট। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আবদুল ওয়াদুদ বলেন, সরকারি জায়গায় ভবন নির্মাণের কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তদন্ত চলমান রয়েছে। তদন্ত শেষে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হারুন অর রশিদ জানান, বিষয়টি তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সহকারী কমিশনার (ভূমি) নুসরাত ইয়াসমিন বলেন, ঘটনাস্থলে সার্ভেয়ার পাঠানো হয়েছে। সরকারি জমি দখলের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সরকারি খাস জমি দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত তদন্ত শেষ করে দখল হওয়া সরকারি জমি উদ্ধার, দায়ীদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নির্মাণ প্রক্রিয়ায় কারা সহযোগিতা করেছে তা প্রকাশ্যে আনা হোক। তদন্তে সত্যতা মিললে এটি কেবল জমি দখলের ঘটনা নয়, বরং প্রশাসনিক নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিয়েও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।