বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের কাবিল মোড়, শালদহ মাঠ ও আশপাশের এলাকায় দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে মাদকের বিস্তার। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকাশ্যেই গড়ে উঠেছে মাদক বেচাকেনা ও সেবনের এক ভয়ঙ্কর নেটওয়ার্ক। সন্ধ্যা নামলেই কাবিল মোড়, হরিপুর বাজার সংলগ্ন মাঠের পেছনের ফাঁকা জায়গা এবং শালদহ মাঠ পুকুরপাড় এলাকায় বসে মাদকসেবীদের আসর, যা এখন এলাকাবাসীর কাছে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, সন্ধ্যার পর থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে নেশাগ্রস্তদের আনাগোনা বাড়তে থাকে।
গভীর রাত পর্যন্ত চলে গাঁজা, ট্যাপেন্টা, ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্যের সেবন ও বেচাকেনা। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী, উঠতি বয়সী তরুণ, এমনকি কিছু বয়স্ক ব্যক্তিও এই নেশার বলয়ে জড়িয়ে পড়ছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, এই মাদক সিন্ডিকেটের অন্যতম মূল হোতা হিসেবে পরিচিত খোকন, আর তার প্রধান সহযোগী হিসেবে সক্রিয় রয়েছেন লাল্টু। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তারা এলাকায় মাদকের বিস্তার ঘটিয়ে যুবসমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, আতিয়ারের ছেলে খোকন প্রায় তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে গাঁজা, ট্যাপেন্টাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।
স্থানীয়রা জানান, একসময় ট্রেনে ট্রেনে ঘুরে ফল বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন খোকন। কিন্তু অল্প সময়ের ব্যবধানে তার আর্থিক অবস্থার নাটকীয় পরিবর্তন স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, “যে ব্যক্তি একসময় অভাব-অনটনের মধ্যে চলতেন, তিনি এখন হঠাৎ করেই আর্থিকভাবে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন এবং একতলা ভবন নির্মাণ করেছেন।”
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, মায়ের সূত্রে পাওয়া নানার জমি নিয়ে পারিবারিক বিরোধের মধ্যেই খোকন বড় ভাইকে ফাঁকি দিয়ে জমি দখলে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, মাদক ব্যবসা থেকে অর্জিত অর্থেই ওই সম্পদের বিস্তার ঘটেছে। এই খোকনের পরিবার এক সময় আর্থিক সংকটের কারণে হরিপুরে তার নানাবাড়িতে এসে বসবাস শুরু করেন।
স্থানীয়দের দাবি, তার নানা রিজন ফকিরের মাজার বর্তমানে খোকনের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। তবে এলাকাবাসীর অভিযোগ, ওই মাজারকেন্দ্রিক এলাকাতেও মাদক বিক্রি ও মাদকসেবীদের আনাগোনা রয়েছে। এমনকি সেখানে মাদক সেবনের সুযোগ করে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে খোকনের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, খোকনের অন্যতম সহযোগী হিসেবে পরিচিত লাল্টু, যিনি হরিপুর ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা জালালের ছেলে। স্থানীয়দের অভিযোগ, লাল্টু দীর্ঘদিন ধরেই মাদক সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। একসময় কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে দালালি করতেন বলেও দাবি করা হয়। পাশাপাশি অনলাইন জুয়ার সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। গত প্রায় দুই বছর ধরে তিনি খোকনের সঙ্গে সরাসরি মাদক ব্যবসায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন বলে দাবি স্থানীয়দের।
বিশ্বস্ত একাধিক সূত্র জানিয়েছে, খোকন ও লাল্টুর নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ মাদক সিন্ডিকেট এলাকায় কাজ করছে। তাদের হয়ে আরও কয়েকজন সহযোগী সারাদিন বিভিন্ন এলাকায় মাদক সরবরাহ ও বিক্রির কাজ করে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিদিন গভীর রাত—বিশেষ করে রাত ১২টার পর হরিপুর ২ নম্বর ওয়ার্ডে রশিদের দোকানের সামনের একটি চায়ের দোকানে বসে দিনের মাদক বিক্রির অর্থ ভাগাভাগি করা হয়। একই সঙ্গে বড় মাদকের চালানও সেখানে সমন্বয় করা হয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এলাকাবাসী আরও জানান, মাদকসেবীদের আনাগোনার কারণে সন্ধ্যার পর কাবিল মোড় ও সালদাহ মাঠ পুকুরপাড় এলাকায় স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের সন্ধ্যার পর বাইরে যেতে নিরুৎসাহিত করছেন। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে পুরো এলাকার তরুণ প্রজন্ম ভয়াবহ বিপদের মুখে পড়বে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনবসতিপূর্ণ এলাকার এত কাছে প্রকাশ্যে মাদক বেচাকেনা চলা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তারা বলছেন, “আজ যারা কৌতূহলবশত মাদকের সংস্পর্শে যাচ্ছে, তারাই আগামী দিনে ভয়ঙ্কর আসক্তিতে পরিণত হতে পারে। এটি শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হুমকি।” মাদকের ভয়াবহতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে স্থানীয়রা জানান, মাদক শুধু একজন মানুষকে ধ্বংস করে না বরং এটি একটি পরিবার, সমাজ এবং অর্থনৈতিক কাঠামোকেও বিপর্যস্ত করে।
মাদকাসক্তি থেকে চুরি, ছিনতাই, পারিবারিক সহিংসতা, কিশোর অপরাধ ও সামাজিক অস্থিরতা বাড়ে বলেও মত তাদের। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত খোকন ও তার প্রধান সহযোগী লাল্টুর বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে কথা বলতে কুষ্টিয়া মডেল থানার আওতাধীন হরিপুর ইউনিয়নের বিট অফিসার এসআই বাদশা মিয়ার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, দুটি লাশের সুরতহাল সংক্রান্ত কাজে ব্যস্ত রয়েছেন। পরে কথা বলার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন। এদিকে এলাকাবাসীর জোর দাবি, দ্রুত তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। তাদের মতে, সময়মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে হরিপুর এলাকার যুবসমাজ মাদকের ভয়াল থাবায় আরও গভীরভাবে নিমজ্জিত হবে এবং সামাজিক পরিবেশ ভয়াবহ সংকটে পড়বে।
