বিশেষ প্রতিনিধি ॥ দীর্ঘ আইনি লড়াই ও টানটান উত্তেজনার পর অবশেষে আদালতের নির্দেশে কুষ্টিয়া সদর থানাধীন বড় আইলচারা মৌজায় এক অনন্য নজির স্থাপিত হলো। দীর্ঘদিনের অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে ডিক্রিদার ইকরামুল হক জোয়ার্দারের পক্ষে জমি ও অন্যান্যদের তাঁদের প্রাপ্য জমি বুঝিয়ে দিয়েছে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন। গতকাল শনিবার (২৩ মে) সকাল থেকে শুরু হওয়া এই উচ্ছেদ ও দখল হস্তান্তর প্রক্রিয়াটি এলাকায় বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।
আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, ঢোল পিটিয়ে ও লাল নিশানা উড়িয়ে ডিক্রিদারদের জমির সীমানা বুঝিয়ে দেওয়া হয়। আদালতের নথি সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সালে মোছাঃ আনোয়ারী খাতুন বাদী হয়ে জহুরুল ইসলাম গংদের বিরুদ্ধে কুষ্টিয়া সদর সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে একটি বিভাগ বন্টন (বাটোয়ারা) মামলা দায়ের করেন (দেং ৩৪১/২০০৮)। দীর্ঘ শুনানির পর ২০১৯ সালের ২৬ নভেম্বর আদালত এই মামলায় আদেশ প্রদান করেন এবং ২০২০ সালের ২ জানুয়ারি প্রাথমিক ডিক্রি জারি হয়। প্রাথমিক ডিক্রির শর্তানুযায়ী ৬০ দিনের মধ্যে বিবাদী পক্ষ বাদীকে তাঁর প্রাপ্য অংশ বুঝিয়ে না দেওয়ায়, আদালত একজন সার্ভে অভিজ্ঞ এ্যাডভোকেট কমিশনার নিয়োগ করেন।
পরবর্তীতে নিযুক্ত এ্যাডভোকেট কমিশনার ২০২৩ সালের ২২ জুলাই উভয় পক্ষের আইনজীবী, স্থানীয় ইউপি সদস্য ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে সরজমিনে জমি পরিমাপ করেন। এ্যাডভোকেট কমিশনারের নিখুঁত জরিপ ও দাখিলকৃত ‘কমিশন প্রতিবেদন’ (ফিল্ডবুক ও স্কেচম্যাপ)-এর ভিত্তিতে বাদী পক্ষকে .৪৯৫০ একর নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। ফিল্ডবুকে বাদীর অংশ লাল অক্ষরে লাল রঙে এবং বিবাদীর অংশ লাল অক্ষরে নীল রঙে চিহ্নিত করা হয়।
ডিক্রি পাওয়ার পরও বিবাদী ও অবৈধ দখলদারদের কারণে বাদী পক্ষ জমিতে প্রবেশ করতে পারছিলেন না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কুষ্টিয়ার যুগ্ম জেলা জজ ৩য় আদালতের বিজ্ঞ বিচারক সোনালী রানী উপাধ্যায়, দেওয়ানি জারি ০২/২০২৪ নং মামলায় অভিযোগ বলে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও প্রয়োজনীয় পুলিশ ফোর্স মোতায়েনের নির্দেশ দেন। এর আগে ২৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগে বিলম্বের বিষয়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের স্বাক্ষরিত একটি সন্তোষজনক লিখিত ব্যাখ্যা আদালতে দাখিল করা হয়েছিল।
বিজ্ঞ আদালত তা পর্যালোচনা করে ২৩ মে ২০২৬ তারিখ দখল হস্তান্তরের চূড়ান্ত দিন ধার্য করেন এবং দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮-এর সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী কুষ্টিয়ার ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) ও পুলিশ সুপারকে (এসপি) আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। আদালতের পরোয়ানা (রিট ও দখল পরোয়ানা) মূলে গতকাল ২৩ মে নির্ধারিত সময়ে বড় আইলচারা মৌজার নালিশি জমিতে উপস্থিত হন নিযুক্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, কুষ্টিয়া জেলা পুলিশ ও আদালতের নেজারত বিভাগের প্রতিনিধি দল। আইনি নিয়ম মেনে ও প্রাচীন ঐতিহ্যের আদলে এলকায় “ঢাক-ঢোল পিটিয়ে” সর্বসাধারণের উদ্দেশ্যে ঘোষণা দিয়ে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা হয়।
এ্যাডভোকেট কমিশনারের নকশা ও ফিল্ডবুক অনুযায়ী লাল নিশানা গেঁড়ে বাদী মোঃ ইকরামুল হক জোয়ার্দ্দার এর জমি বুঝিয়ে দেওয়া হয়। আজ ২৪ মে ২০২৬ তারিখে এই দখল সংক্রান্ত সফল প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করার কথা রয়েছে। দীর্ঘ ১৮ বছরের আইনি প্রক্রিয়া শেষে জমি ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ডিক্রিদার পক্ষ। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আদালতের এই কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপের ফলে সাধারণ মানুষের বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা আরও দৃঢ় হলো। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে জমি উদ্ধারের এই ঘটনাটি কুষ্টিয়া সদর এলাকায় দীর্ঘকাল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
