ইবি প্রতিনিধি ॥ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শিক্ষকদের পাওনা প্রায় ১০ কোটি বকেয়া টাকা দিতে গড়িমসি করছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সেমিস্টার প্রতি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র, উত্তরপত্র এবং মডারেশনসহ বিভিন্ন খাতে শিক্ষকদের এ বকেয়া রয়েছে। নিয়মিত টাকা না দেওয়া ও পাওনা টাকার তুলনায় কম পরিশোধ করায় বর্তমানে এ সংকট তৈরি হয়েছে। বাজেট সংকট কাটলে পরবর্তী সময়ে এই ঘাটতি পূরণ করার আশ্বাস দিয়েছে প্রশাসন।
ানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগগুলোতে প্রতি সেমিস্টারে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, উত্তরপত্র মূল্যায়ন, প্রশ্নপত্র মডারেশন, মৌখিক পরীক্ষা, পরীক্ষা পরিদর্শন, অপ্যায়ন, থিসিসসহ বিভিন্ন খাতে বিল বাবদ শিক্ষকদের জন্য নির্দিষ্ট টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এই টাকাগুলো বছরে ২-৩ বারে শিক্ষকদের প্রদান করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে বিগত প্রায় ৫ বছর ধরে পরীক্ষার বিলের টাকা নিয়মিত না দেওয়া ও পাওনা টাকার তুলনায় কম পরিশোধ করায় পাহাড়সম বকেয়া তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া যেসব বিভাগ বেশি টাকা পাওনা রয়েছে তাদেরও অন্য বিভাগের সঙ্গে মিলিয়ে সমহারে টাকা দেওয়া হচ্ছে।
ফলে কিছু বিভাগ বৈষম্যের শিকার হচ্ছে বলে অভিযোগ শিক্ষকদের। বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বিগত বছরগুলোতে বিভাগভিত্তিক পরীক্ষার বিলের বাজেট থাকলেও বর্তমানে তা শিক্ষক প্রতি বাজেট দেওয়া হয়। এতে যেসব বিভাগে শিক্ষক বেশি সেই বিভাগগুলো বেশি বিল এবং যে বিভাগগুলোতে শিক্ষক কম সেখানে কম বিল পাস হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সমজাতীয় বিভাগগুলোর শিক্ষক কম বেশি যাই হোক শিক্ষার্থী ও পরীক্ষা সমান হয়। ফলে এসব বিভাগের বিলও সমান হয়। তবে যেসব বিভাগে শিক্ষক বেশি তারা বেশি বিল পাওয়ায় তাদের পাওনা প্রায় পরিশোধ হয়ে গেছে।
অপরদিকে যেসব বিভাগে শিক্ষক কম তারা কম বিল পাওয়ায় এসব বিভাগের শিক্ষকদের বকেয়া বিলের পরিমাণ বেড়েই চলছে। এদিকে গত ঈদে এই খাত থেকে শিক্ষক প্রতি দেড় লক্ষ টাকা দেওয়া হলেও এবার তা কমিয়ে মাত্র ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ও হিসাব শাখা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৬টি বিভাগের পরীক্ষার বিল বাবদ প্রায় ৭ কোটি ২৯ লাখ ৮৯ হাজার ২১৩ টাকা বকেয়া রয়েছে। এর মধ্যে দাওয়াহ বিভাগে ২০ লাখ ৯৭ হাজার ৪২২ টাকা, আল-হাদিসে ২৫ লাখ ১৭ হাজার ৮৪০, আরবিতে ১৭ লাখ ২৩ হাজার ৪৪,
বাংলাতে ১১ লাখ ১২ হাজার ৩০৫, ইংরেজিতে ৪ লাখ ৬০ হাজার ৩১৬, ইসলামের ইতিহাসে ২৪ লাখ ৩৫ হাজার ৬৫২, অর্থনীতিতে ৭ লাখ ৮৭ হাজার ৩২৪, রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ১১ লাখ ৬৭ হাজার ৫১৩, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে ২৮ লাখ ৪০ হাজার ৯৫৮, ফোকলোর স্টাডিজে ৬ লাখ ৪০ হাজার ৬৪১, সমাজকল্যাণে ২০ লাখ ৪৯ হাজার ২২৭, আইনে ১১ লাখ ২৫ হাজার ৬৯১, আল-ফিকহে ৯ লাখ ৯৪ হাজার ২২৮, ল’ অ্যান্ড ল্যান্ডে ১২ লাখ ৮৮ হাজার ১৭১, হিসাববিজ্ঞানে ১৪ লাখ ৩৮ হাজার ৭০৮, ব্যবস্থাপনায় ৩৫ লাখ ১২ হাজার ২৩৫, ফিন্যান্সে ৩৯ লাখ ৪৯ হাজার ৬৮১, মার্কেটিংয়ে ১৪ লাখ ৯১ হাজার ৬০, হিউম্যান রিসোর্সে ৩৯ লাখ ৮৯ হাজার ৬৫৬, ট্যুরিজমে ১৮ লাখ ৬৪ হাজার ২৪, গণিতে ৬৩ লাখ ৬৪ হাজার ৯০৮, পরিসংখ্যানে ২৯ লাখ ৫২৩,
জিওগ্রাফীতে ১৫ লাখ ৩৮ হাজার ৫২২, ক্রীড়া বিজ্ঞানে ৩ লাখ ৩২ হাজার ৩৬২, ইইই বিভাগে ৩৮ লাখ ৩৯ হাজার ৬১৮, ফলিত রসায়নে ৫০ লাখ ৪৮ হাজার ১৫২, সিএসইতে ১৮ লাখ ২ হাজার ৪৬৮, আইসিটিতে ২ লাখ ১০ হাজার ৬৯১, বায়োমেডিকেলে ২৮ লাখ ৭৪ হাজার ৪০৯, ফলিত পুষ্টিতে ১৯ লাখ ৯৫ হাজার ৩৭৮, বায়োটেকনোলজিতে ৯ লাখ ৫ হাজার ১০৮, ফার্মেসিতে ২২ লাখ ৯১ হাজার ৫৮২, লোকপ্রশাসনে ৩২ লাখ ১৪ হাজার ৮৫৯ এবং আল-কুরআনে ২১ লাখ ৮৪ হাজার ৯৩৭ বকেয়া টাকা রয়েছে।
এছাড়াও এসব বিভাগে বিগত সময়ের আরো কয়েক কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে বলে জানান সংশ্লষ্ট বিভাগগুলো। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, যেই বিভাগে ২০ জন শিক্ষক তাদের জন্য জনপ্রতি পরীক্ষার বিল ৫০ হাজার আবার যেই বিভাগে মাত্র ৫ জন শিক্ষক তাদের ক্ষেত্রেও ৫০ হাজার টাকা দিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এতে টাকা জমে নতুন বিভাগগুলোর বিলে পাহাড়সম চাপ তৈরি হচ্ছে। পূর্বে বিভাগভিত্তিক নির্দিষ্ট বিল বাজেট দেওয়া হতো। কিন্তু এখন সেটি এসে জনপ্রতি মাত্র ৫০ হাজার টাকায় সীমাবদ্ধ হয়েছে। কিন্তু ২০ জন শিক্ষকের বিভাগে যেই পরিমাণ পরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়, ৫ জন শিক্ষকের বিভাগেও একই কাজ করতে হয়। তুলনামূলক নতুন বিভাগগুলোতে ২০-২২ জন শিক্ষকের কাজ মাত্র ৫-৬ জন শিক্ষককে সামলাতে হচ্ছে।
কিন্তু বছরের পর বছর ধরে তাদের পাওনা পরিশোধ করা হচ্ছে না। এটা প্রশাসনের পূনরায় বিবেচনা করা উচিত। এ বিষয়ে কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘শিক্ষকদের এই খাতে প্রায় ১০ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। আমরা ইউজিসির কাছে ১২ কোটি টাকার জন্য আবেদন করেছি। কিন্তু তারা টাকার অনুমোদন না দেওয়ায় শিক্ষকদের কম করে টাকা দিতে হচ্ছে। এই টাকাটাও আমরা অন্য জায়গা থেকে ধার করে দিচ্ছি। আমাদের এই লটে ৪৩ কোটির মতো পাওনা ছিল। কিন্তু সরকার তা কমিয়ে ৩৭ কোটি টাকা দেয়। যার ফলে সবার চাহিদা মতো অর্থ অনুমোদন দেওয়া যাচ্ছে না। আগামীতে বাজেট ঠিকঠাক আসলে এই ঘাটতি পূরণ করার চেষ্টা করবো।’ উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, ‘আমার কাছে কোনো শিক্ষক এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেনি। ইউজিসির কাছে আমরা যে বরাদ্দ চেয়েছিলাম তার থেকেও তারা ৫ কোটি টাকা কমিয়ে দিয়েছে। ফলে সে অনুযায়ী আমরা শিক্ষকদের টাকা দিয়েছি।
