বিশেষ প্রতিনিধি ॥ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) কুষ্টিয়া সার্কেল অফিসে সেবা নিতে এসে চরম ভোগান্তি, অতিরিক্ত অর্থ আদায়, দীর্ঘসূত্রিতা এবং দালালচক্রের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন সাধারণ মানুষ। ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেস সনদ, রেজিস্ট্রেশন, মালিকানা বদল, লাইসেন্স নবায়ন কিংবা সংশোধনী প্রায় প্রতিটি সেবা ঘিরেই উঠেছে অনিয়ম ও হয়রানির অভিযোগ।
সরকারি নিয়মে নির্ধারিত ফির বিপরীতে কয়েকগুণ বেশি টাকা আদায়, ফাইল আটকে রেখে সেবাপ্রার্থীদের ঘোরানো এবং দালালের মাধ্যমে দ্রুত কাজ করে দেওয়ার নামে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট এমন অভিযোগ করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী। সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, কুষ্টিয়া বিআরটিএ অফিসে এখন “দালাল ছাড়া কাজ হয় না” এমন এক অঘোষিত সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।
অফিসের ভেতরে ও বাইরে একদল ব্যক্তি নিজেদের কখনো বিআরটিএ অফিসের স্টাফ, কখনো কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠ লোক পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষকে ঘিরে ধরেন। কেউ লাইসেন্স দ্রুত করিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেন, কেউ আবার গাড়ির ফিটনেস, রেজিস্ট্রেশন কিংবা মালিকানা পরিবর্তনের কাজ “ম্যানেজ” করার কথা বলে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করেন। অভিযোগ রয়েছে, এসব কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে অফিসের ১০৫ নম্বর রুম, ৩১৩ নম্বর রুম এবং তৃতীয় তলাকে ঘিরে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী দালাল চক্র। ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই চক্রে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হিসেবে যেসব নাম উঠে এসেছে, তারা হলেন মুরাদ, রিয়াজ, খোকন, আব্দুর রাজ্জাক ও জুয়েল।
অভিযোগ রয়েছে, তারা নিয়মিত অফিস এলাকায় অবস্থান করে সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে দ্রুত কাজ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। কেউ নিজেদের অফিস স্টাফ হিসেবে পরিচয় দেন, আবার কেউ দাবি করেন, তাঁরা “ভেতরের লোক” এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করেই কাজ সম্পন্ন করেন। সম্প্রতি লাইসেন্স আবেদন সংক্রান্ত অনুসন্ধানে একজন প্রতিবেদক কুষ্টিয়া বিআরটিএ অফিসে গেলে প্রথমে রিয়াজ নামের এক ব্যক্তি এগিয়ে এসে কথা বলেন।
কিছু সময় পর তিনি জানান, মোটরসাইকেল ও হালকা যানবাহনের লাইসেন্স করতে চাইলে ১১ হাজার টাকা দিলেই শুধু ছবি তোলা ও আঙুলের ছাপ দিয়ে চলে যেতে হবে, বাকি কাজ হয়ে যাবে। এরপর একে একে মুরাদ, আব্দুর রাজ্জাক, খোকন ও জুয়েলসহ আরও কয়েকজন এসে লাইসেন্স করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিআরটিএ অফিসের ভেতরে “সেটিং” করেই এসব কাজ সম্পন্ন করা হয় এবং প্রতিটি লাইসেন্সের বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বিভিন্ন জায়গায় দিতে হয়।
অথচ সরকারি হিসাবে লাইসেন্সের নির্ধারিত ফি এর তুলনায় এ অর্থ কয়েকগুণ বেশি। ১৭ মে সংগ্রহ করা তথ্য অনুযায়ী, মোটরসাইকেল বা হালকা যানবাহনের এক ক্যাটাগরির লার্নার ড্রাইভিং লাইসেন্সের সরকারি ফি মাত্র ৩৪৫ টাকা এবং দুই ক্যাটাগরির জন্য ৫১৮ টাকা। স্মার্ট কার্ড অপেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের ফি ৪১৫২ টাকা এবং পেশাদার লাইসেন্সের ফি ২৪২৭ টাকা।
কিন্তু বাস্তবে অভিযোগ রয়েছে, দালালদের মাধ্যমে লাইসেন্স করতে গেলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সাড়ে ৯ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। ফলে সরকারি সেবা নিতে গিয়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ আবেদনকারীরা। শুধু অতিরিক্ত অর্থ আদায় নয়, সেবাপ্রার্থীদের দীর্ঘসূত্রিতা ও হয়রানির অভিযোগও রয়েছে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, অনলাইনে আবেদন করার পর নিয়ম অনুযায়ী দ্রুত ই-পেপার পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেককে ১৫ থেকে ২০ দিন, কখনো মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়।
লিখিত, মৌখিক ও মাঠ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও অনেক আবেদনকারীর ফাইল ঝুলে থাকে। সংশোধনী, পেশাদার ও অপেশাদার লাইসেন্স নবায়নের আবেদন প্রতিদিন জমা হলেও দীর্ঘদিন অনুমোদনের অপেক্ষায় পড়ে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষকে দিনের পর দিন বিআরটিএ কার্যালয়ে ঘুরতে হচ্ছে। অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, “নিজে করতে গেলে শুধু ঘুরতে হয়, কিন্তু দালাল ধরলে কয়েক দিনের মধ্যেই কাজ হয়ে যায়।”
অভিযোগের আরেকটি বড় অংশ ঘিরে রয়েছে অফিসের ৩১৩ নম্বর রুম। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন অফিস স্টাফ ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জুয়েল নামের এক ব্যক্তি নিয়মিত ওই কক্ষে বসে কম্পিউটার পরিচালনা করেন এবং নিজেকে অফিস সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দেন। যদিও কম্পিউটার ব্যবহারের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হওয়ার কথা। অফিসে একাধিক কম্পিউটার অপারেটর নিয়োগ থাকলেও বাস্তবে বহিরাগতদের প্রভাব বেশি বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে অন্য দালালদের তুলনায় অফিসের বিভিন্ন অংশে মুরাদ, রিয়াজ, খোকন ও আব্দুর রাজ্জাকের উপস্থিতি এবং সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে তাদের সরাসরি যোগাযোগ বেশি চোখে পড়ে বলে জানিয়েছেন একাধিক ভুক্তভোগী। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অতীতে একাধিকবার দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বিআরটিএ কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে দালালদের আটক করেছেন। বিভিন্ন সময় তাদের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডও দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু তারপরও থামছে না দালালদের দৌরাত্ম্য। অভিযোগ রয়েছে, বর্তমানে কুষ্টিয়া বিআরটিএ কার্যালয়ে অন্তত ১৫ থেকে ২০ জন সক্রিয় দালাল রয়েছে, যারা বিভিন্ন কক্ষকে কেন্দ্র করে সিন্ডিকেট গড়ে তুলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে। অভিযোগের বিষয়ে মুরাদ ও রিয়াজের সঙ্গে কথা হলে তারা প্রথমে নিজেদের অফিস স্টাফ পরিচয় দিলেও পরে অফিসের বাইরে এসে বলেন, “আমরা মানুষের সেবা করি, কাজ থাকলে করে দিবো।”
জুয়েল বলেন, “আমি দীর্ঘদিন ধরে এখানে কাজ করি।” তবে তিনি বিআরটিএর কর্মকর্তা-কর্মচারী কি না—এ বিষয়ে স্পষ্ট জবাব না দিয়েই দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন। এ বিষয়ে ইতিপূর্বে মোটরযান পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ বলেছিলেন, “অফিস স্টাফ ছাড়া ১০৫ নম্বর রুম বা তৃতীয় তলায় বহিরাগত কারও বসা ঠিক নয়। যদি এ ধরনের কেউ সেখানে অবস্থান করে বা কার্যক্রম পরিচালনা করে, তাহলে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
একই সময়ে কুষ্টিয়া বিআরটিএ সার্কেলের সহকারী পরিচালক মাহাবুব রব্বানী বলেছিলেন, “বর্তমানে বিআরটিএর অধিকাংশ কার্যক্রম অনলাইনভিত্তিক এবং সকল সরকারি ফি ব্যাংকের মাধ্যমে জমা হয়। যদি কেউ অবৈধভাবে অর্থ লেনদেন করে থাকে এবং তার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে সবকিছু অনলাইনে হওয়ার পরও কেন সেবাপ্রার্থীদের দিনের পর দিন ঘুরতে হচ্ছে, কেন সরকারি ফির বাইরে কয়েকগুণ বেশি টাকা ছাড়া কাজ হচ্ছে না, আর কেনই বা দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধ হচ্ছে না? ভুক্তভোগীদের দাবি, কুষ্টিয়া বিআরটিএ অফিসে দালালচক্রের বিরুদ্ধে জরুরি অভিযান পরিচালনা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সেবায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
