কুমারখালী প্রতিনিধি ॥ ড্রেন নির্মাণের জন্য এক বছর আগে সড়কের পাশে নালা খুঁড়েছিলেন ঠিকাদার। এরপর নির্মাণকাজ শেষ করেননি, নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থাও নেননি। সেই নালা ভেঙে ভেঙে পরিণত হয়েছে গর্তে। সেখানে জমা পানিতে পড়ে গত সোমবার মারা যায় ছয় বছর বয়সী শিশু ইফাদ হাসান। মঙ্গলবার সকালে কুমারখালী স্পোর্টিং মাঠে জানাজা শেষে পৌর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। নিহত ইফাদ এলংগী নাতুড়িয়া পাড়ার লুঙ্গি ব্যবসায়ী কামরুল হাসানের ছোট ছেলে।
একটি মাদ্রাসার প্রথম শ্রেণির ছাত্র ছিল সে। কুমারখালী পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের এলংগী এলাকায় ড্রেন নির্মাণের জন্য ওই নালা খোঁড়া হয়েছিল। স্থানীয়রা বলছেন, ঠিকাদার ও কর্তৃপক্ষের অবহেলায় ঝরে গেল শিশুটির প্রাণ। দোষীদের শাস্তির দাবি জানান তারা। এলংগী এলাকায় ব্যাংক কর্মকর্তা মানিক শেখের বাড়ি থেকে গড়াই নদী পর্যন্ত সড়কের পাশে প্রায় ৫০০ মিটার ড্রেন নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেয় কুমারখালী পৌর কর্তৃপক্ষ।
গত বর্ষা মৌসুমে ড্রেন নির্মাণে মাটি কেটে নালা তৈরি করেন ঠিকাদার। পরে তিনি গড়াই নদীর প্রান্তে কাজ শুরু করেন। কিন্তু মানিক শেখের বাড়ির প্রান্তে খোঁড়া নালা অরক্ষিত থাকে। ধীরে ধীরে নালার পাশের মাটি ভেঙে একটি খাদ বা গর্তে রূপ নিয়েছে। নিহত শিশুটির মামা স্বাধীন হোসেন বলেন, সোমবার বিকেল ৩টার দিকে ইফাদ ও তার চাচাতো ভাই সামাদ (১১) ছাগল চরানোর জন্য বাড়ি থেকে বের হয়। ঘণ্টাখানেক পরে সামাদ বাড়ি ফিরে আসে।
বিকেল ৪টার দিকে স্যান্ডেল দেখে মানিক শেখের বাড়ির সামনের খাদ থেকে তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। স্বাধীন হোসেন বলেন, সময়মতো ড্রেন নির্মাণ হলে হয়তো আমার ভাগনের এমন করুণ মৃত্যু হতো না। চাচা সামছুম আলম অভিযোগ করে বলেন, এক বছর আগে ড্রেনের জন্য গর্ত কেটেছেন ঠিকাদার। কিন্তু এতদিনেও কাজ শেষ হয়নি। সেখানে মানুষসমান পানি জমে আছে।
পানিতে পড়ে আমার ভাতিজার মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এই মৃত্যুর জন্য ঠিকাদার দায়ী। আমরা এর বিচার চাই। সন্তান হারিয়ে বাকরুদ্ধ বাবা কামরুল হাসান। কথা বলার মতো মানসিক অবস্থা নেই তাঁর।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আইইউজিআইপি প্রকল্পের অধীনে প্রায় আট কোটি টাকা ব্যয়ে ড্রেনেজ ও সড়ক নির্মাণকাজের টেন্ডার পায় মাদারীপুরের কিংডম বিল্ডার্স ও নুরজাহান রিসোর্স ইন্টারন্যাশনাল (জেভি)। স্থানীয় লিটন আলী ঠিকাদারের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন। ফোনে যোগাযোগ করা হলে লিটন আলী প্রথমে জানান, এলংগী এলাকায় তাঁর ড্রেনের কাজ চলছে। পরে শিশুটির মৃত্যুর বিষয়ে জানতে চাইলে লিটন বলেন, ‘আমি কিছুই জানি না। বাইরে গাড়িতে আছি।’ পরে কথা বলবেন বলে ফোনের সংযোগ কেটে দেন। এরপর থেকে তাঁর ফোন বন্ধ।
কুমারখালী থানার ওসি জামাল উদ্দিন বলেন, নির্মাণাধীন ড্রেনে জমে থাকা পানিতে ডুবে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে শুনেছি। লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইউএনও ও পৌরসভার প্রশাসক ফারজানা আখতার বলেন, ঠিকাদারের অবহেলা আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গতকাল সকালে দেখা যায়, প্রকৌশলী ও সহকারী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে তালা ঝুলছে। প্রধান প্রকৌশলীর পদ শূন্য দীর্ঘদিন ধরে।
সহকারী প্রকৌশলী বদলি হয়ে নাটোরে চলে গেছেন। ফোনে সদ্য সাবেক সহকারী প্রকৌশলী মো. আকরামুজ্জামান বলেন, আমি বদলি হয়ে নাটোরে যোগদানের জন্য এসেছি। ফাইল না দেখে বিস্তারিত বলা সম্ভব হচ্ছে না। কুমারখালী দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক হাবীব চৌহান বলেন, ঠিকাদার দীর্ঘদিন ধরে গর্ত খুঁড়ে ফেলে রেখেছেন। প্রশাসনের নজরদারি নেই। কাজের কোনো অগ্রগতিও নেই। এখানে প্রশাসন ও ঠিকাদারের অবহেলায় শিশুটির মৃত্যু হয়েছে।
