মিজানুর রহমান নয়ন, কুমারখালী ॥ কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ওপর দিয়ে সুন্দরবন এক্সপ্রেস ৭২৫-৭২৬ এবং বেনাপোল এক্সপ্রেস ৭৯৫-৭৯৬ নামে ট্রেন দুটি ঢাকা-খুলনায় চলাচল করে। তবে ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ব্যবসায়ী জনপদ কুমারখালীতে ট্রেন দুটির যাত্রাবিরতি নেই। এর প্রতিবাদে গতকাল সোমবার (১১ মে) সকাল ১০টায় স্টেশন চত্বরে বিক্ষোভ শুরু করেন কয়েক হাজার নানা শ্রেণি পেশার জনতা।
এরপর সকাল পৌণে ১১টার দিকে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর আলম, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাভিদ সারওয়ার, থানার ওসি জামাল হোসেনসহ অনেক কর্মকর্তারা আসেন। তাঁরা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে প্রায় ১০ মিনিট আলোচনা করেন এবং উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বিক্ষোভকারীদের ট্রেনের যাত্রাবিরতির আশ্বাস দেন।
এরপর সকাল ১১টার দিকে একে একে স্টেশন ত্যাগ করেন জনতা। এরআগে, ২০২৪ সালের ১৫ নভেম্বর স্টেশন সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেন থামিয়ে বিক্ষোভ করেছিলেন স্থানীয় জনতা। সেদিন তাঁরা ৭২ ঘণ্টার মধ্যে যাত্রাবিরতির দাবিতে আলটিমেটাম দিয়েছিলেন। পরে কুমারখালী স্টেশনমাস্টার আশ্বস্ত করলে ট্রেনটি ছেড়ে দিয়েছিলেন। সোমবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, কুমারখালী রেলস্টেশন চত্বরে রাজনৈতিক ব্যক্তি, ছাত্র, জনতা, ব্যবসায়ীসহ নানান শ্রেণির হাজারো জনতার ভিড়।
স্টেশন মাস্টারের কক্ষে সামনে বসে ও দাঁড়িয়ে বিক্ষোভ করছেন তাঁরা। এ সময় আক্ষেপ করে কুমারখালী বুলবুল টেক্সটাইল মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইকবাল হোসেন দিলু বলেন, শিল্প ও সাংস্কৃতিক জনপদ কুমারখালী। এখানে রয়েছে বৃহৎ কাপুড়িয়া হাট। আছে রেলস্টেশন।
তবু থামে না সুন্দরবন ও বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেন। এতে ব্যবসা – বাণিজসহ এখানকার মানুষ পিছিয়ে পড়ছে। সেজন্য যাত্রাবিরতির দাবিতে বিক্ষোভ চলছে। উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এরআগেও আন্দোলন – বিক্ষোভ করেছি। কর্তৃপক্ষ বারবার আশ্বাস দেন। কিন্তু ট্রেন থামেনা। তবে এবার নির্দিষ্ট দিনক্ষণ না বললে কুমারখালী দিয়ে কোনো ট্রেন আর চলতে দেওয়া হবেনা।
এলাকাবাসী জানান, গড়াই নদীর কূলঘেঁষে ১৮৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত কুমারখালী পৌরসভা। এটি শিল্প প্রসিদ্ধ ও পর্যটন এলাকা। এখানকার তাঁত ও বস্ত্রশিল্প জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রসিদ্ধ লাভ করেছে। এই সাংস্কৃতিক জনপদে রয়েছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি, বাউল সম্রাট লালন শাহের আখড়াবাড়ি, বাংলাসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেনের বাস্তভিটা, গ্রামীণ সাংবাদিকতার পথিকৃৎ কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের বাড়ি ও স্মৃতি জাদুঘর, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বীরসেনা বাঘা যতীনের জন্মভিটা।
প্রবীণ সাংবাদিক এম এ ওহাব বলেন, এক্সপ্রেস ট্রেন চালু হলে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হবে। রোগী, পর্যটক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থীরা সহজেই ঢাকা – খুলনা যাওয়া আসা করতে পারবে। সকলের জীবনমানের উন্নত হবে। কুমারখালী তাঁত বোর্ডের উপমহাব্যবস্থাপক মেহেদী হাসান জানান, সপ্তাহের শনি ও মঙ্গলবার বিশাল কাপুড়িয়ার হাট বসে। এ দিনে আট-দশ কোটি টাকার বেচাকেনা হয়। ট্রেন চালু হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের আরও প্রসার ঘটবে।
বিক্ষোভ পরিচালনাকারী কেন্দ্রীয় যুবঅধিকার পরিষদের সহসভাপতি শাকিল আহমেদ তিয়াস বলেন, সুন্দরবন ও বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেন দুটি কুমারখালীতে ২ মিনিট করে যাত্রাবিরতির জন্য বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন, সংগ্রাম ও মন্ত্রণালয়ে ঘুরাঘুরি করেছি। তখন কর্মকর্তারা শুধু আশ্বাস দেন, কিন্তু ট্রেন থামেনা। তাই পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী গতকাল সকাল ১০টা থেকে বিক্ষোভ শুরু করা হয়। পরিকল্পনা ছিলো ১১টার পরে সকল ট্রেন থামিয়ে দেওয়া হবে।
তবে আন্দোলন চলাকালীন সময়ে প্রশাসনের কর্মকর্তারা আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, যে আগামী ২৭ জুনের মধ্যে একটি ট্রেনের যাত্রাবিরতি হবে। সেই আশ্বাসে সবাই চলে যাচ্ছি। তবে এবার দাবি পূরণ না হলে কঠোর কর্মসূচি পালন করা হবে।
ইতিহাস, ঐতিহ্য, ব্যবসা – বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক জনপদে এক্সপ্রেস ট্রেন দুটির যাত্রাবিরতির প্রয়োজন আছে বলে জানিয়েছেন ইউএনও ফারজানা আখতার। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ডিসি স্যারের সঙ্গে সচিব স্যার ও ডিজি মহোদরের কথা হয়েছে। আজকেই ( সোমবার) ফাইল পুটআপ হয়েছে। আগামী ২৭ জুনের মধ্যে এইখানে একটা ট্রেন থামবে।
