এক দশক পর মালিক-শ্রমিকের একদিনের মিলনমেলা - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

এক দশক পর মালিক-শ্রমিকের একদিনের মিলনমেলা

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: মে ৩, ২০২৬

মিজানুর রহমান নয়ন, কুমারখালী ॥ ঘড়ির কাটায় বেলা ১২টা বাজে। বৈশাখের সূর্যকিরণ ঠিক মাথার উপর থেকে আগুন ঝরাচ্ছে। তখন তপ্ত রোদে দল বেঁধে খেলছেন ফুটবল। তাঁদের কারো বয়স ৫৫ বছর, কারোবা ৪০। কেউ ৩৫ বছর, কেউবা খেলছেন ২৪ বছর পরে ফুটবল। তাঁদের খেলা দেখে মাঠের বাইরে কেউ দিচ্ছেন করতালি। ফাঁকেফাঁকে কেউ ব্যস্ত কুশল বিনিময়ে, কেউ একে অন্যকে জড়িয়ে ধরছেন। কেউবা খুলেছেন সাংসারিক সুখ-দুঃখের গল্পের ঝাঁপি।

কেউবা তুলছেন মোবাইলে ফোনে ছবি। গত শুক্রবার দুপুরে কুষ্টিয়া-রাজাবাড়ী আঞ্চলিক মহাসড়কের কুমারখালী কাজীপাড়া ঈদগাহ মাঠে এমন দৃশ্য চোখে পড়ে। ১লা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে মালিক – শ্রমিক ভেদাভেদ ভুলে এমন খেলার আয়োজন করে লালন শাহ পরিবহন লিমিটেড। এছাড়াও শোভাযাত্রা, গানের তালেতালে চেয়ারে বসে বালিস ও চোখ বেঁধে হাড়ি ভাঙা খেলা, গানবাজনা, ভূরিভোজ ও শুভেচ্ছা পুরস্কারের বর্ণাঢ্য দিনব্যাপী আয়োজন ছিল এ পরিবহনের।

মালিক – শ্রমিক ভাই ভাই শ্লোগানে প্রায় এক দশক পরে এমন মিলনমেলায় অংশ নেন পরিবহনের মালিক, চেয়ারম্যান, পরিচালক, সুপারভাইজার, চেকার, চালকসহ অন্তত ১০২ জন। মালিক – শ্রমিকদের এমন আবেগ – উচ্ছ্বাস বুঝিয়ে দিল এই পরিবহনের মালিক – শ্রমিকদের নেই কোনো ভেদাভেদ। তাঁরা সবাই একে অপরের ভাই ভাই। এরআগে, ২০১৫ সালে কুমারখালীর রবীন্দ্র কুঠিবাড়ীতে এমন মিলনমেলার আয়োজন ছিল বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা।

মানিকগঞ্জের শামিম হোসেন (৪৮) লালন শাহ পরিবহনের পাটুরিয়া ঘাটের চেকার। আবেগ আপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, ২৪ বছর পরে ফুটবল খেললাম। তবে এবারের খেলাটা ছিল অন্যরকম। কর্মস্থলের মালিক ও সহকর্মীদের সঙ্গে খেলতে পেরে খুবই আনন্দ লাগছে। আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয় বলে মন্তব্য করেছেন চালক মাসুদ মোল্লা (৪৬)।

রাজবাড়ীর জেলখানা মোড় এলাকার বাসিন্দা মাসুদ সাত বছর ধরে লালন শাহ পরিবহনের চালকের দাঁয়িত্বে। তিনি বলেন, ছোটবেলায় অনেক খেলাধুলা করেছি। তবে কর্মব্যস্ততার কারণে আর সুযোগ হয়না। কিন্তু ৩৫ বছর পরে আবার ফুটবল খেলে খুব ভালো লাগছে। ঢাকা গোদের টেক এলাকার আরেক চালক দুলাল শেখ (৪৮) বলেন, কর্মজীবনে প্রথমবার মালিক – শ্রমিক মিলেমিশে ফুটবল, চেয়ার ও বালিস খেলায় অংশ নিয়েছি।

একদিনের জন্য হলেও সবাই একসঙ্গে থাকতে পেরে ঈদের মতো আনন্দ লাগছে। সকল ভেদাভেদ ভুলে মালিক – শ্রমিকদের মধ্যে মেলবন্ধন সৃষ্টির লক্ষে ২০১৫ সালে প্রথম এবং এক দশক পর আরও একবার দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য আয়োজন ছিল বলে জানিয়েছেন লালন শাহ পরিবহনের সিও লিটন আব্বাস। তিনি বলেন, আমাদের পরিবহনে মালিক – শ্রমিক সবাই ভাই ভাই। ভবিষ্যতেও এমন আয়োজন অব্যাহত থাকবে। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস সমন্ধে শ্রমিকদের অবহিতকরণ এবং সকলের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরির লক্ষে বাস বন্ধ রেখে দিনব্যাপী শোভাযাত্রা, খেলাধুলা, গানবাজনা, খাওয়া – দাওয়া ও পুরস্কার বিতরণ করা হয়েছে বলে জানান পরিবহনটির উপদেষ্টা গাজী জাহিদ তারিফ।

দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি ছিলেন বাংলা একাডেমির পুরস্কার প্রাপ্ত লেখক, সাহিত্যিক ও গবেষক সোহেল আমিন বাবু। তিনি বলেন, শ্রমিক দিবসেও প্রান্তিক শ্রমিকদের ছুটি থাকেনা। সেখানে লালন শাহ পরিবহনের আয়োজনটা চমকপ্রদ। তাদের মতো সকল প্রতিষ্ঠান এমন আয়োজন করলে মালিক – শ্রমিকদের মেলবন্ধন আরও সুদীর্ঘ হবে।