বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ায় জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের একটি অভিযানে আটক পাঁচ ব্যক্তির মধ্যে দু’জনকে ছেড়ে দেওয়ার পরে ‘সোর্স’ হিসেবে দাবি করার ঘটনায় তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধারের পর মামলায় কম পরিমাণ দেখানো, ঘুষের বিনিময়ে আসামি ছেড়ে দেওয়াসহ নানা প্রশ্ন ঘিরে ডিবির এসআই জনি, কথিত মাদক ব্যবসায়ী আমিরুল ও তার সহযোগী জুলুর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আমিরুল একসময় ধান-চালের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ব্যবসায় লোকসানের পর তিনি মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন এবং পরবর্তীতে মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন। তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন আইলচারা ইউনিয়ন যুবলীগের সেক্রেটারি জুলু। এলাকাবাসীর দাবি, এই দু’জনের নেতৃত্বে কুষ্টিয়ার বিভিন্ন এলাকায় একটি সক্রিয় মাদক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে।
গত সোমবার দিবাগত রাত আনুমানিক ১২টার দিকে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার আইলচারা ইউনিয়নের রশিদ এগ্রো ফুড ফ্যাক্টরি সংলগ্ন আমিরুলের কার্যালয়ে অভিযান চালায় ডিবি পুলিশ। অভিযানে আমিরুল, জুলুসহ মোট পাঁচজনকে আটক করা হয়। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ট্যাবলেট এবং পাঁচটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়েছে বলে জানা যায়। তবে অভিযানের পরপরই শুরু হয় বিতর্ক।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ঘটনাস্থল থেকে আনুমানিক ১৬০০ থেকে ১৮০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হলেও মামলার এজাহারে মাত্র ৬০ পিস উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া, বটতৈল কবুর হাট এলাকার এক প্রভাবশালী ব্যক্তির মাধ্যমে প্রায় সাত লাখ টাকার বিনিময়ে আমিরুল, জুলু এবং জব্দকৃত পাঁচটি মোটরসাইকেল ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে, একই অভিযানে আটক অন্য তিনজন-মিলন মোল্লা, আমিন উদ্দিন ও পবন টাকা দিতে না পারায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
এমনকি উদ্ধার হওয়া মাদকের একটি অংশ বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে আমিরুলকে ‘সোর্স’ হিসেবে দাবি করে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে। অভিযানে অংশ নেওয়া ডিবির এসআই জনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, মাদক কারবারিদের ধরতে অনেক সময় তথ্যদাতার সহায়তা নিতে হয়। আমিরুল আমাদের সোর্স হিসেবে কাজ করেছেন। বিধি অনুযায়ী মুচলেকা নিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
তবে সচেতন মহল এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নয়। তাদের প্রশ্ন যদি আমিরুল আগে থেকেই পুলিশের সোর্স হয়ে থাকেন, তাহলে তাকে আটক করার প্রয়োজন কেন? আর যদি তিনি অভিযানে আটক একজন সন্দেহভাজন হন, তাহলে কীভাবে এত দ্রুত তাকে সোর্স হিসেবে চিহ্নিত করা হলো? বিষয়টি নিয়ে পরিষ্কার কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে কুষ্টিয়া ডিবির অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আজমল হুদা বলেন, অভিযানের সময় আমি উপস্থিত ছিলাম না।
তবে ঘটনাটি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে জবাব দিতে বলা হয়েছে এবং একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন বলেন, ঘটনাটি আমার নজরে এসেছে। তদন্ত কমিটি কাজ করছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উল্লেখ্য, আটক করার প্রায় চার ঘণ্টার মধ্যেই আমিরুল ও জুলুকে ডিবি কার্যালয় থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
পরে পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের ‘সোর্স’ দাবি করা হলে ঘটনাটি আরও বেশি আলোচনায় আসে। ঘটনার পর থেকেই স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া বিরাজ করছে। জনমনে এখন একটাই প্রশ্ন আটকের পর কীভাবে একজন কথিত মাদক ব্যবসায়ী হঠাৎ করে পুলিশের ‘সোর্স’ হয়ে যান? বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
