নামমাত্র খরচে মিলছে প্রশাসকের স্বাক্ষরিত জাল সনদ! - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

নামমাত্র খরচে মিলছে প্রশাসকের স্বাক্ষরিত জাল সনদ!

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: এপ্রিল ৬, ২০২৬

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া পৌরসভার অভ্যন্তরে প্রকাশ্যে জালিয়াতির এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা উদঘাটিত হয়েছে। মাত্র ১শ টাকা থেকে কয়েক হাজার টাকার বিনিময়ে পৌর প্রশাসকের স্বাক্ষর জাল করে আয় সনদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সনদপত্র তৈরি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি কম্পিউটার দোকানের বিরুদ্ধে। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, কুষ্টিয়া পৌরসভার হাউজিং এলাকার গড়াই মহিলা কলেজ সংলগ্ন ‘সজিব কম্পিউটার’ নামের একটি দোকান থেকে অবাধে তৈরি করা হচ্ছে জাল আয় সনদ। এসব সনদে ব্যবহার করা হচ্ছে পৌরসভার প্যাড, প্রশাসকের স্বাক্ষর এবং সরকারি সিল যেগুলো সবই স্ক্যান করে রাখা। পরবর্তীতে শুধু নাম, পিতা-মাতার নাম ও ঠিকানা পরিবর্তন করে প্রিন্ট করে গ্রাহকের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।

এ কাজে ১শ থেকে ৫শ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় সূত্র আরও জানায়, শুধু আয় সনদ নয় নাগরিক সনদ, ওয়ারিশ সনদ, জন্মসনদসহ বিভিন্ন ধরনের সরকারি নথিও জাল করে তৈরি করা হয় ওই দোকান থেকে। এমনকি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৫ম ও ৮ম শ্রেণি পাসের সনদ, এসএসসি, এইচএসসি, অনার্স, ডিগ্রি ও মাস্টার্স পাসের ভুয়া সার্টিফিকেটও তৈরি করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব সনদের জন্য নেওয়া হয় ১শ টাকা থেকে শুরু করে ১০ হাজার, এমনকি বিশেষ ক্ষেত্রে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত।

অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে প্রতিবেদক দলের দুই সদস্য ছদ্মবেশে গত শনিবার বিকেলে দোকানটিতে যান। প্রথমে দোকান বন্ধ থাকায় মালিক মো. সজিব ইসলামের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি সন্ধ্যায় আসতে বলেন। পরে সন্ধ্যায় গিয়েও দোকান বন্ধ পাওয়া গেলে পুনরায় ফোন দিলে কিছুক্ষণ পর তিনি দোকানে এসে উপস্থিত হন। প্রথমে অপরিচিত হওয়ায় সনদ দিতে অস্বীকৃতি জানালেও পরে অনুনয়-বিনয়ের পর রাজি হন তিনি।

এ সময় তিনি একজনের জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে কম্পিউটারে সংরক্ষিত একটি ফোল্ডার থেকে পৌরসভার প্যাড, প্রশাসকের স্বাক্ষর ও সিলযুক্ত স্ক্যান কপি বের করে মুহূর্তেই একটি আয় সনদ তৈরি করেন। সেটি প্রথমে রঙিন প্রিন্ট দিয়ে পরে ফটোকপি করে সাদাকালো কপি হিসেবে তুলে দেন। পরবর্তীতে নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করে জাল সনদ তৈরির বিষয়ে জানতে চাইলে সজিব ইসলাম আয় সনদ জাল করার বিষয়টি স্বীকার করেন।

তিনি স্বীকার করেন, একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার স্বাক্ষর জাল করা গুরুতর অপরাধ। তবে অন্যান্য সনদ জালিয়াতির অভিযোগ অস্বীকার করেন। আইন সংশ্লিষ্টরা জানান, পৌরসভার প্যাড নকল, প্রশাসকের স্বাক্ষর জাল এবং সরকারি সিল ব্যবহার করে জাল সনদ তৈরি করা বাংলাদেশের দণ্ডবিধি ১৮৬০ অনুযায়ী গুরুতর অপরাধ। এ ধরনের অপরাধ প্রমাণিত হলে ২ থেকে ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডসহ অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া জাল নথি ব্যবহার ও সরকারি সিল নকলের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে শাস্তি আরও কঠোর হতে পারে।

এ বিষয়ে কুষ্টিয়া পৌর প্রশাসক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক (উপসচিব) আহমেদ মাহবুব-উল-ইসলাম বলেন, বিষয়টি আমরা জেনেছি। যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

অন্যদিকে, কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ তৌহিদ বিন-হাসান জানান, অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি এভাবে জাল হওয়ার ঘটনায় প্রশাসনের তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।