কুমারখালীতে বোতলের ক্যাপ ছোড়ায় হামলা, গুলিবিদ্ধ ৭, বসতঘরে আগুন - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কুমারখালীতে বোতলের ক্যাপ ছোড়ায় হামলা, গুলিবিদ্ধ ৭, বসতঘরে আগুন

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: মার্চ ২৪, ২০২৬

কুমারখালী ( কুষ্টিয়া) প্রতিনিধিঃ কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে কোমল পানীয় বোতলের ক্যাপ ছোড়াকে কেন্দ্র করে গোলাগুলি ও বাড়িঘওে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে অন্তত সাতজন আহত হয়েছেন। রোববার (২২ মার্চ) বিকেল সাড়ে ৫টার থেকে রাত দেড়টা পর্যন্ত উপজেলার কয়া ইউনিয়নের বেড় কালোয়া জামে মসজিদ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় সোমবার রাতে থানায় একটি মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে।
আহতরা হলেন – কয়া ইউনিয়নের রাধাগ্রামের বাবু শেখের ছেলে মো. রাব্বি (২২), আমজাদ শেখের ছেলে আজম শেখ (৫৪) মকছেদ শেখের ছেলে মো. ওবাইদুল্লাহ (৩০), লিটন শেখের ছেলে জনি শেখ (২০), বেড় কালোয়া গ্রামের মোক্তার শেখের ছেলে শারুফ শেখ (২০), আমজাদ আলীর ছেলে জাহাঙ্গীর আলম (৪৫), মৃত আকাল উদ্দিনের ছেলে মো. শফিউদ্দিন (৬৫)। তাঁদের মধ্যে জনি, আজম ও শারুফ কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আর গুরুতর হওয়ায় আহত রাব্বিকে ঢাকা পাঠানো হয়েছে। অন্যরা গ্রামে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্বজনরা। তাঁরা কয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি রাশিদুল ইসলামের সমর্থক।
হামলার ঘটনার পর রাত দেড়টার দিকে রতন শেখের (৫০) বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এতে তার বসতঘর ও আসবাব পুড়ে ছায় হয়ে গেছে। তিনি একই এলাকার রেজন শেখের ছেলে ও জেলেপাড়ার সরদার আওয়ামী লীগ কর্মী ইয়ারুল শেখের সমর্থক।
পুলিশ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পদ্মনদীতে মাছ ধরা ও অবৈধ বালু উত্তোলন, চাঁদা তোলা ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে কয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি রাশিদুল ইসলামের সঙ্গে বেড় কালোয়া জেলেপাড়ার সরদার আওয়ামী লীগ কর্মী ইয়ারুল শেখ পক্ষের দীর্ঘদিন বিরোধ চলছে। রোববার সকালে ইয়ারুলের সমর্থক রতন শেখ কোমল পানি পান করার পর বোতলের ক্যাপ ছোড়েন। ক্যাপটি গিয়ে গ্রামের কাসেট ওমর) নামের এক ব্যক্তির মাথায় লাগে। এসময় ক্যাসেট বকাবকি করলে রতন তাকে মারধর করেন। বিষয়টি ক্যাসেট বাড়ি গিয়ে তার ছেলে মামুনকে জানান। তখন মামুন এসে তার বাবাকে মারধরের কারণ জানতে চাইলে রতন তাকেও মারধর করেন। সে সময় বিএনপি নেতা রাশিদুলের সমর্থক আলম শেখ রতনকে একটা চর মারলে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে স্থানীয়রা বিষয়টি মিটমাট করে সবাইকে নিজ নিজ বাড়িতে পাঠিয়ে দেন।
এরপর বিকেলে রতন, ইয়ারুল শেখ, নাসের উদ্দিনসহ তাদের লোকজন এসে বেড় কালোয়া জামে মসজিদ এলাকায় দেশীয় ও আগ্নেয়াস্ত্রসহ অতর্কিত হামলা চালায়। এতে বিএনপি নেতা রাশিদুলের অন্তত ৭জন গুলিবিদ্ধ হন। ওইদিন রাত দেড়টার দিকে হঠাৎ ইয়ারুলের সমর্থক রতন শেখের বাড়িতে আগুন দেখতে পান স্থানীয়রা। পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণ করলেও পুড়ে গেছে রতনের বসতঘর ও আসবাব। তবে আগুনের সুত্রপাত জানা যায়নি। সেসময় ওই বাড়িতে কেউ ছিল না।
অপরদিকে হামলার কয়েকটি ভিডিও ক্লিপ ওইদিন রাতেই ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, কৃষিজমিতে অন্তত অর্ধশতাধিক মানুষ ছুটাছুটি করছেন। তাদের অনেকের মাথায় হেলমেট পড়া। অনেকের হাতে ঢাল, সরকি লাঠিসোঁটা, আগ্নেয়াস্ত্র।
রোববার সন্ধায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, আহত জনি, রাব্বি ও শারুফকে চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে। তাদের হাতে, বুকে, পায়ে ছড়রা গুলি ও রক্তাক্ত ক্ষত।
এ সময় আহত মো. রাব্বি বলেন, ‘সকালে বোতলের ক্যাপ ছোড়া নিয়ে প্রতিপক্ষের রতনের সঙ্গে হাতাহাতি হয়েছিল। আর বিকেলে রতন সন্ত্রাসী ইয়ারুলসহ তার বাহিনী দিয়ে গুলি করেছে। আমার বুক, হাত, পা সহ সবখানে অসংখ্য গুলি লেগেছে। আমি সন্ত্রাসীদের বিচার চাই। ‘
আহত জনি শেখ বলেন, ‘ আমরা ১০ – ১২ জন মসজিদের পাশের মাঠে আড্ডা দিচ্ছিলাম। তখন জেলেপাড়ার সরদার সন্ত্রাসী ইয়ারুল শেখ, নাসের উদ্দিন, সোহেলসহ কয়েক’শ সন্ত্রাসী দেশীয় অসস্ত্র ও পিস্তল, শর্টগান নিয়ে অতর্কিত হামলা চালায়। এতে আমিসহ অন্তত ৭জন গুলিবিদ্ধ হয়েছি।’
সোমবার দুপুরে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বেড় কালোয়া, রাঁধাগ্রামসহ আশপাশের এলাকায় থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। রতন শেখের টিনশেডের মেঝে পাকা বসতঘর ও আসবাব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সেসময় বাড়িতে কেউ ছিল না। উৎসুক জনতা দেখতে আসছেন।
এ সময় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রতনের এক আত্মীয় বলেন, ‘ মারামারির পর থেকেই রতনরা কেউ বাড়িতে নাই। রাতে কিভাবে আগুন লেগেছে তা জানা নেই। তবে আগুনে সব পুড়ে শেষ হয়ে গেছে।’
রাশিদুল গ্রুপের আলম শেখের ভাষ্য, সামান্য ঘটনা নিয়ে রতন অন্যগ্রামের সন্ত্রাসীদের এনে হামলা চালিয়েছে। এতে গুলিবিদ্ধ রাব্বির অবস্থা আশঙ্কাজনকের খবর শুনে নিজেরা ঘরে আগুন লাগিয়ে পালিয়েছে। এঘটনায় বিচারে আশায় রাব্বির মা জায়েদা খাতুন ৩৩ জনের নামে মামলা করেছেন।
কয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি রাশিদুল ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগ কর্মী ও পদ্মায় পুলিশ হত্যা মামলার প্রধান আসামি ইয়ারুল, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর হাজির ভাই সোহেল রানা, সন্ত্রাসী নাসের উদ্দিনরা আমার লোকদের ওপর অতর্কিত হামলা করেছেন। এতে সাতজন গুলিবিদ্ধ। থানায় মামলা করা হয়েছে।
সরেজমিন দেখা যায়, জেলেপাড়ার সরদার ইয়ারুল, সোহেল রানা ও নাসের উদ্দিন স্ব – পরিবারে বাড়িতে নেই। তাদের ঘরেবাড়িতে তালা ঝুলছে। সেজন্য তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে অভিযোগ অস্বীকার নাসের উদ্দিনের মা রশিয়া খাতুন বলেন, ‘ আমার ছেলে নদীতে মাছ ধরে। বিভিন্ন সময়ে মারামারির কারণে সে ৬ মাস বাড়িতে থাকেনা। প্রতিপক্ষরা মিথ্যা দোষ দিচ্ছে।’
কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ( আরএমও) হোচেন ইমাম বলেন, গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে চারজন ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে রাব্বির বুকে গুলি লাগায় তাকে ঢাকা রেফার্ড করা হয়েছে।
কুমারখালী থানার ওসি জামাল উদ্দিন বলেন, পূর্বশত্রুতার জের ধরে বোতলের ক্যাপ ছোড়াকে কেন্দ্র করে হামলা ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। এঘটনায় একপক্ষ থানায় এজাহার দিলে মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে। অন্যপক্ষের কেউ এখনও থানায় আসেনি।