কুষ্টিয়ায় পেঁয়াজের বীজ চাষের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কুষ্টিয়ায় পেঁয়াজের বীজ চাষের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: মার্চ ১৮, ২০২৬

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ায় দিন দিন বাড়ছে পেঁয়াজের বীজ চাষের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ। কম জমিতে তুলনামূলক বেশি লাভের সম্ভাবনা থাকায় অনেক কৃষকই এখন এই চাষে ঝুঁকছেন। এরই মধ্যে সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছেন জেলার এক কৃষি উদ্যোক্তা মনিরুল ইসলাম। কুষ্টিয়া সদর ও কুমারখালী উপজেলার বিভিন্ন মাঠে এবার তিনি বৃহৎ পরিসরে পেঁয়াজের বীজ আবাদ করেছেন।

সদর উপজেলায় প্রায় ২৮ বিঘা এবং কুমারখালী উপজেলাসহ উত্তরাঞ্চলে ১৭ বিঘাসহ মোট ৪৫ বিঘা জমিতে পেঁয়াজের বীজের চাষ করেছেন তিনি। পেঁয়াজ বীজের এই আবাদ বর্তমানে স্থানীয় কৃষকদের মাঝেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। সরেজমিনে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বাড়াদি এলাকার মাঠে গিয়ে দেখা যায় নারী শ্রমিকরা পেঁয়াজ ফুলে পরাগায়নে ব্যস্ত। সারিবদ্ধভাবে সবাই একদিক থেকে আরেকদিকে ফুলের পরাগায়নের মাধ্যমে তাদের কার্য সম্পাদন করছেন।

প্রবীণ এক কৃষক জানান, পেঁয়াজ চাষের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো ফুলে পরাগায়ন। আগে পেঁয়াজ ক্ষেতে দেখা যেত মৌমাছি ও বিভিন্ন উপকারী পোকামাকড়ের ব্যস্ততা। পেঁয়াজ গাছ ফুল ধরার পর মৌমাছিরা ফুলে বসে মধু সংগ্রহের পাশাপাশি এক ফুল থেকে অন্য ফুলে পরাগ স্থানান্তর করতো, যার মাধ্যমে পরাগায়ন সম্পন্ন হতো। তবে এখন মাঠে অতিরিক্ত সার কীটনাশক ব্যবহারের ফলে আর মৌমাছি বসে না তাই হাত দিয়েই প্রাকৃতিকভাবে পরাগায়ন করতে হচ্ছে। সম্ভাবনাময় একটি কৃষিখাত বাংলাদেশে পেঁয়াজ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মসলা ফসল।

প্রতি বছর দেশে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজের চাহিদা থাকলেও বীজ উৎপাদনে ঘাটতির কারণে অনেক সময় বিদেশ থেকে বীজ আমদানি করতে হয়। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশেই যদি উন্নত মানের বীজ উৎপাদন বাড়ানো যায়, তাহলে আমদানির ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কমানো সম্ভব। পেঁয়াজের বীজ চাষ সাধারণ পেঁয়াজ চাষের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন এবং শ্রমনির্ভর। জমি প্রস্তুত, সেচ, আগাছা দমন, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং সময়মতো পরিচর্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সঠিক পরিচর্যা করতে পারলে এটি কৃষকের জন্য লাভজনক হয়ে ওঠে।

কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের ডিগ্রি শেষ বর্ষের ছাত্র মনিরুল ইসলাম। পড়াশোনা করে সফল কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার ইচ্ছা ছিল তাঁর। ইউটিউব দেখে এবং কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে পেঁয়াজ চাষ শুরুও করেন। ২০১৫ সালে মাত্র ১৬ শতাংশ জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করেন তিনি। এরপর লাভের মুখ দেখায় প্রতি বছর পেঁয়াজ চাষ বাড়িয়ে দেন তিনি। গত বছরে ৪০ বিঘা জমিতে হাইব্রিড পেঁয়াজের চাষ করেছেন। এই কৃষি উদ্যোক্তা মনিরুল ইসলাম কুমারখালি উপজেলার কবুরাট এলাকার মো. কিনাজ উদ্দিনের ছেলে। পেঁয়াজ চাষের আগে বীজ সংগ্রহ করতে গিয়ে উচ্চমুল্য তাকে ভাবিয়ে তোলে।

তাই পেঁয়াজ চাষের পাশাপাশি পরিকল্পনা করেন কিভাবে পেঁয়াজ বীজ উৎপাদন করা যায়। বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ ও বিভিন্ন এলাকায় ছুটে গেছেন কিভাবে পেঁয়াজ বীজ উৎপাদন করা যায়। এরপর কৃষি উদ্যোক্তা মনিরুল ইসলাম কয়েক বছর ধরেই নতুন কৃষি প্রযুক্তি ও লাভজনক ফসল নিয়ে কাজ করছেন। এ বছর তিনি বড় পরিসরে পেঁয়াজের বীজ আবাদ করে স্থানীয় কৃষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি জানান, ভালো মানের বীজ উৎপাদনের জন্য উন্নত জাতের পেঁয়াজ ব্যবহার করা হয়েছে এবং নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে ফসলকে রোগমুক্ত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার বাম্পার ফলনের আশা করছেন তিনি। তার ভাষায়, “পেঁয়াজের বীজ চাষে শ্রম বেশি লাগে, কিন্তু ফলন ভালো হলে লাভও ভালো হয়।

কৃষকরা যদি পরিকল্পিতভাবে এই চাষে এগিয়ে আসে, তাহলে এটি একটি সম্ভাবনাময় কৃষিখাতে পরিণত হতে পারে। বড় পরিসরে পেঁয়াজের বীজ চাষের ফলে স্থানীয় পর্যায়ে শ্রমিকদের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়েছে। জমি পরিচর্যা, সেচ, আগাছা পরিষ্কার এবং ফসল সংগ্রহের সময় বহু শ্রমিক কাজের সুযোগ পাচ্ছেন। কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, কুষ্টিয়া অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া পেঁয়াজ ও পেঁয়াজের বীজ চাষের জন্য বেশ উপযোগী।

সঠিক প্রশিক্ষণ ও কৃষি বিভাগের সহযোগিতা পেলে এই অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন আরও বাড়তে পারে। বর্তমানে মাঠজুড়ে সবুজ গাছ ও ফুলে ভরে উঠেছে মনিরুল ইসলামের পেঁয়াজের বীজের ক্ষেত। সময়মতো আবহাওয়া সহায়তা করলে এবার ভালো ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি মনে করছেন। স্থানীয় কৃষকেরাও তার এই উদ্যোগ দেখে উৎসাহিত হচ্ছেন। অনেকেই ভবিষ্যতে পেঁয়াজের বীজ চাষে আগ্রহী হওয়ার কথা জানিয়েছেন। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি মৌসুমেই মনিরুল ইসলামের এই উদ্যোগ কুষ্টিয়ায় পেঁয়াজের বীজ উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।

তার সফলতা অন্য কৃষকদেরও এ পথে এগিয়ে আসতে অনুপ্রাণিত করবে এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক কৃষিবিদ শওকত হোসেন ভুইয়া বলেন, ভালো মানের বীজ উৎপাদনের জন্য উন্নত জাতের পেঁয়াজ ব্যবহার করা হয়েছে এবং নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে ফসলকে রোগমুক্ত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার বাম্পার ফলনের আশা করছেন তিনি। তিনি বলেন, জেলায় ৬২ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ বীজের আবাদ হয়েছে। এতে করে আমরা কৃষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করেছি।