কুষ্টিয়ায় জুয়ার টাকা নিয়ে দ্বন্দ্ব: থানায় বসে মীমাংসার দাবি, অস্বীকার পুলিশের - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কুষ্টিয়ায় জুয়ার টাকা নিয়ে দ্বন্দ্ব: থানায় বসে মীমাংসার দাবি, অস্বীকার পুলিশের

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: মার্চ ১৩, ২০২৬

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ায় অনলাইন জুয়ার টাকা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের অবসান থানায় বসে হয়েছে—এমন দাবি করেছেন অভিযুক্ত এক ব্যক্তির বাবা। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো মীমাংসার বিষয়টি অস্বীকার করা হয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে এলাকাজুড়ে নানা আলোচনা ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

জানা যায়, কুষ্টিয়া পৌরসভার ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের ঢাকা পূর্বপাড়ার বাসিন্দা শিশিরের বিরুদ্ধে কৌশলে জুয়ার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ এনে সম্প্রতি কুষ্টিয়া মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন রাকিব নামের এক ব্যক্তি। অভিযোগের পর বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার বৈঠক ও আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও দীর্ঘদিন কোনো সমাধান হচ্ছিল না।

অভিযুক্ত শিশিরের বাবা শাহাবুল দাবি করেছেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে থানায় বসেই উভয় পক্ষের মধ্যে বিরোধের সমাধান হয়েছে। তিনি বলেন, “অনেকবার চেষ্টা করার পর শেষ পর্যন্ত কুষ্টিয়া মডেল থানায় বসে বিষয়টির মীমাংসা হয়েছে।”

গত ৮ মার্চ রবিবার বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে প্রতিবেদকের সঙ্গে প্রায় ২ মিনিট ১১ সেকেন্ডের কথোপকথনে শাহাবুল বলেন, “হয়েছে তো, থানায় বসেই মীমাংসা হয়েছে। এসআই শামসুল ভাই ছিলেন।” তবে কীভাবে মীমাংসা হয়েছে—এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “আপনারা থানায় গিয়ে জেনে নেন।”

অন্যদিকে অভিযুক্ত হিসেবে নাম ওঠা এসআই শামসুল এ ধরনের কোনো মীমাংসার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “কেউ অভিযোগ দিলে তাকে বসিয়ে কথা বলতে হয়। আমরা বসে যখন দেখেছি তাদের বক্তব্যে মিল নেই, তখন বলেছি তোমরা নিজেদের মতো ব্যবস্থা নাও। থানায় কোনো আপোষ বা মীমাংসা হয়নি।”

এ বিষয়ে কথা বলতে বাদী রাকিবের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এমনকি অভিযুক্ত শিশিরের সাথেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। 

স্থানীয় সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে রাকিব ও শিশিরের মধ্যে অনলাইন জুয়ার টাকা নিয়ে বিরোধ চলছিল। বিষয়টি নিয়ে তারা বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে একাধিকবার বসেছেন। এমনকি জগতি পুলিশ ক্যাম্পেও আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে, তবে কোনো স্থায়ী সমাধান মেলেনি।

সূত্রের দাবি, রাকিব ও শিশির দুজনই একটি অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্মে খেলতেন। শিশিরের রেফারেন্সে রাকিবের আইডি খোলা হয়েছিল। ওই ব্যবস্থায় রাকিবের জয়-পরাজয়ের ওপর ভিত্তি করে শিশির কমিশন পেতেন। রাকিব হারলে কমিশনের পরিমাণ আরও বাড়ত। একইভাবে আরও কয়েকজন খেলোয়াড়ের আইডিও শিশিরের রেফারেন্সে খোলা ছিল বলে জানা যায়। খেলতে খেলতে এক পর্যায়ে রাকিব বড় অঙ্কের অর্থ হারিয়ে ফেলেন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, তিনি ওই অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রায় ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত হারিয়েছেন। পরে তিনি সেই অর্থ শিশিরের কাছ থেকে দাবি করতে শুরু করেন।

সূত্র আরও জানায়, বিষয়টি সমাধানের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে শালিস বৈঠক হয়েছে। এক পর্যায়ে শিশির রাকিবকে আড়াই লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হলেও রাকিব তাতে সম্মত হননি।

এদিকে আরেকটি সূত্রের দাবি, রাকিব বিষয়টি নিয়ে কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছেও গিয়েছিলেন। এমনকি পুরো টাকা আদায় করতে পারলে তা ভাগাভাগির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলেও এলাকায় গুঞ্জন রয়েছে। শেষ পর্যন্ত ছেউড়িয়া এলাকার একটি প্রভাবশালী গ্রুপের মাধ্যমে থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয় বলে সূত্রটি জানিয়েছে।

স্থানীয়দের মধ্যে আরও গুঞ্জন রয়েছে, শেষ পর্যন্ত প্রায় তিন লাখ টাকায় বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়েছে। এমনকি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে থানার এক কর্মকর্তা বিবাদী পক্ষের কাছ থেকে অতিরিক্ত এক লাখ টাকা নিয়েছেন—এমন অভিযোগও শোনা যাচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু নিশ্চিত করা হয়নি।

এ বিষয়ে কুষ্টিয়া মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কবির হোসেন মাতুব্বর বলেন, “এসব বিষয়ে থানায় কোনো মীমাংসার সুযোগ নেই। যদি কেউ ব্যক্তিগতভাবে কিছু করে থাকে, তবে তার দায়ভার ব্যক্তিগত।”

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে জুয়া খেলা নিজেই দণ্ডনীয় অপরাধ। Public Gambling Act, 1867 অনুযায়ী জুয়া খেলা বা জুয়ার আসর পরিচালনা করা আইনত অপরাধ। ফলে জুয়ার টাকা নিয়ে বিরোধ হলে থানায় বসে সেটির আপস-মীমাংসা করার কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের অভিযোগ এলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই পুলিশের দায়িত্ব।

প্রসঙ্গত, গত ৫ মার্চ রাত ৭টা ১৬ মিনিটে প্রতিবেদকের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলার সময় শাহাবুল অভিযোগ করেন, রাকিব তার ছেলের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলকভাবে থানায় অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, “শনিবার থানায় বসাবসি আছে। তারপর ওসি সাহেবের সঙ্গে কথা বলে যেটা হওয়ার হবে। এটা নিয়ে ইতিমধ্যে ছয়বার বৈঠক হয়েছে। কিন্তু রাকিব একেক সময় একেক কথা বলে।”

ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা চলছে। জুয়ার অর্থ নিয়ে দ্বন্দ্ব, থানায় বসে মীমাংসার দাবি এবং পুলিশের অস্বীকার—সব মিলিয়ে বিষয়টি ঘিরে আইন প্রয়োগ ও প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে কথা বলতে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন, পিপিএম (বার)-এর সরকারি মুঠোফোন নম্বরে ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।