সংকটে বিপর্যস্ত কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

সংকটে বিপর্যস্ত কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: মার্চ ১০, ২০২৬

স্বাস্থ্যসেবাকে রাজনৈতিক ঢাল হিসাবে ব্যবহার!

 

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল বর্তমানে ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি রোগীর চাপ নিয়ে চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছে। সীমিত শয্যা, চিকিৎসক ও নার্সের স্বল্পতা, ওষুধের ঘাটতি এবং পরিচ্ছন্নতা সংকট, সব মিলিয়ে হাসপাতালটি এখন নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ শাসিত সরকারের পতন পরে দফায় দফায় হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে প্রিণ্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের সাথে কথাও বলেছেন তারা।

দিয়েছেন নানা প্রকার প্রতিশ্রুতি। কিন্তু কোন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তেমন কোন পদক্ষেপ অদ্যবধি দৃশ্যমান হয়নি। হাসপাতালটিতে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা না গেলেও বিগত কয়েক দশক ধরে ভোটের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা সাধারণ জনগণের। সাধারণ মানুষ মনে করেন, স্বাস্থ্যসেবাকে রাজনৈতিক ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে ভোটের আগে রাজনৈতিক নেতারা স্বাস্থ্য সেবার উন্নয়নে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু ভোট শেষে সেই সকল নেতা বা তাদের কর্মি সমর্থকরাই হাসপাতালটিকে লুটেপুটে খেতে ব্যস্ত হয়ে উঠেন। চিকিৎসা সেবার পরিবর্তে হাসপাতাল কেন্দ্রিক বাণিজ্যেই তাদের বেশী আগ্রহ দেখা যায়।

সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডেই বেডের তুলনায় অনেক বেশি রোগী ভর্তি রয়েছে। বেড না পেয়ে অনেক রোগীকে মেঝেতে পাটি বা চাদর বিছিয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। বিশেষ করে মেডিসিন, শিশু ও সার্জারি ওয়ার্ডে রোগীর চাপ সবচেয়ে বেশি। গতকাল সোমবার (৯ মার্চ) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ২৫০ হলেও বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে ৭৭৭ জন রোগী।

অর্থাৎ হাসপাতালের ধারণক্ষমতার তিনগুণেরও বেশি রোগী এখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ফলে অনেক রোগীকেই বাধ্য হয়ে ফ্লোরে শুয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তার পদ রয়েছে ৮০টি। এর বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৪২ জন। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় জনবলের প্রায় অর্ধেক দিয়েই হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। সিনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন), সিনিয়র কনসালটেন্ট (সার্জারি), সিনিয়র কনসালটেন্ট (শিশু), সিনিয়র কনসালটেন্ট (গাইনী), সিনিয়র কনসালটেন্ট (কার্ডিওলজি), সিনিয়র কনসালটেন্ট (চক্ষু), সিনিয়র কনসালটেন্ট (ডেন্টাল) এবং টিএনটি বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট পদেও বর্তমানে কোনো চিকিৎসক নেই।

এছাড়া জুনিয়র কনসালটেন্ট (চক্ষু), জুনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন), জুনিয়র কনসালটেন্ট (সার্জারি), রেডিওলজিস্ট এবং উপ-সেবা তত্ত্বাবধায়ক পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। অ্যানেসথেটিস্ট, সহকারী রেজিস্ট্রার (মেডিসিন), সহকারী রেজিস্ট্রার (সার্জারি) ও সহকারী রেজিস্ট্রার (গাইনী) পদে দুইজন করে থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে এসব পদে কেউ নেই। ফলে জটিল অপারেশন পরিচালনা ও চিকিৎসা কার্যক্রমে প্রায়ই সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। তথ্য অনুযায়ী, জরুরি বিভাগেও রয়েছে জনবল সংকট। এখানে ৮ জন ইমারজেন্সি মেডিকেল অফিসার থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ৪ জন।

এছাড়া ১৬ জন সহকারী সার্জনের পদ থাকলেও বর্তমানে একজনও সহকারী সার্জন নেই। হাসপাতালের দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ রয়েছে ২৩৯টি। এর বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন ২৩১ জন। তবে প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদটি দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। নার্সিং সেবাতেও রয়েছে কিছু ঘাটতি। নার্সিং সুপারভাইজার ৪ জনের বিপরীতে রয়েছেন ৩ জন, সিনিয়র স্টাফ নার্স ১৫৭ জনের বিপরীতে রয়েছেন ১৫৫ জন এবং স্টাফ নার্স ১৮ জনের বিপরীতে রয়েছেন ১৭ জন। তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও রয়েছে সংকট। ৪০টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন ৩১ জন। প্রধান সহকারী কাম হিসাবরক্ষক ও ক্যাশিয়ার পদ শূন্য রয়েছে।

অফিস সহকারী কাম মুদ্রাক্ষরিক ২ জনের বিপরীতে আছেন ১ জন এবং সহকারী নার্স ৬ জনের বিপরীতে আছেন মাত্র ২ জন। সহকারী হিসাবরক্ষক পদেও নেই কেউ। হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সংকট সবচেয়ে বেশি। ৪৭ জন থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৭ জন। ফলে হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, রোগী পরিবহনসহ বিভিন্ন দৈনন্দিন কাজে চরম সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। ২০ জন অফিস সহায়ক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে রয়েছেন মাত্র ২ জন। স্ট্রেচার বেয়ারার থাকার কথা ২ জন, কিন্তু বর্তমানে কেউ নেই। কুক বা মশালচি ৬ জনের পদও রয়েছে শূন্য। জমাদার বা সরদার ১ জন থাকার কথা থাকলেও নেই কেউ। এছাড়া ১৬ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর বিপরীতে বর্তমানে রয়েছেন মাত্র ৩ জন।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার আমলা ইউনিয়নের বাসিন্দা মোঃ নজরুল ইসলাম বলেন, আমার আট মাসের শিশু সন্তান হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে চার দিন আগে তাকে নিয়ে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করি। কিন্তু এখানে এসে দেখি শিশু ওয়ার্ডে একটি বেডও খালি নেই। গত তিন-চার দিন ধরে আমার শিশুকে ফ্লোরে রেখেই চিকিৎসা করাতে হচ্ছে। ছোট্ট একটা বাচ্চা, ফ্লোরে শুয়ে থাকতে তার খুব কষ্ট হচ্ছে। এক পাশ দিয়ে মানুষজন চলাচল করছে, অন্য পাশে আমার সন্তান চিকিৎসা নিচ্ছে। এমন পরিবেশে একটি শিশুকে রাখা খুবই কষ্টকর। তবুও বাধ্য হয়ে এখানে থাকতে হচ্ছে, কারণ আমাদের পক্ষে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করানো সম্ভব নয়। আমরা চাই শিশু ওয়ার্ডে বেডের সংখ্যা বাড়ানো হোক, যাতে ভবিষ্যতে কোনো অভিভাবককে এভাবে ফ্লোরে থেকে সন্তানের চিকিৎসা করাতে না হয়।

রোগীর স্বজন কুষ্টিয়ার কুমারগাড়া এলাকার ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মোসাম্মৎ প্রিয়া আক্তার বলেন, আমার শ্বশুর একজন বয়স্ক মানুষ। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে দুই দিন আগে তাকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করি। কিন্তু হাসপাতালে এসে দেখি কোনো বেড খালি নেই। বাধ্য হয়ে তাকে ওয়ার্ডের নোংরা ফ্লোরে রেখে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। একজন বৃদ্ধ মানুষের জন্য এভাবে ফ্লোরে শুয়ে থাকা খুবই কষ্টের বিষয়। তার শরীরের অবস্থাও খুব একটা ভালো না, তবুও আমরা কোনো উপায় না পেয়ে এভাবেই চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছি। হাসপাতালের পরিবেশ আরও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা এবং রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত বেডের ব্যবস্থা করা খুবই জরুরি বলে আমি মনে করি।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরেক রোগী ইমরান হোসেন বলেন, কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল জেলার মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্র। কিন্তু এখানে এসে আমরা যে পরিস্থিতি দেখি, তাতে অনেক সময় হতাশ হতে হয়। বেডের অভাবে অনেক রোগীকেই ফ্লোরে থেকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। ফ্লোরের পরিবেশও খুব একটা ভালো না। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কিছু উদ্যোগ দেখা গেলেও সামগ্রিকভাবে সেবার মান তেমন উন্নত হয়নি। ৫ আগস্ট ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হলেও হাসপাতালের সেবার মানোন্নয়নে দৃশ্যমান তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।

বর্তমানে জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষে আমরা নতুন জনপ্রতিনিধি পেয়েছি। তিনি মাঝে মাঝে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করছেন, যা অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। তবে শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালালেই সমস্যার সমাধান হবে না। হাসপাতালের জনবল সংকট, বেড সংকট ও চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। আমরা আশা করি আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি এসব বিষয়ে গুরুত্ব দেবেন। আরেক রোগীর স্বজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, হাসপাতালে প্রতিদিন এত রোগী ভর্তি হয় যে অনেক সময় ওয়ার্ডে ঠিকমতো চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়ে। রোগীদের পাশে স্বজনদের বসার বা থাকারও তেমন কোনো জায়গা নেই। অনেক সময় ডাক্তার ও নার্সরাও রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেয়ে যান। আমরা চাই হাসপাতালের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হোক, যাতে সাধারণ মানুষ স্বস্তিতে চিকিৎসা নিতে পারে।

হাসপাতালের নার্সিং সুপারিনটেনডেন্ট ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে বাস্তবে প্রতিদিন প্রায় ৮০০ থেকে ৯০০ জন রোগী ভর্তি থাকে। কখনো সেই সংখ্যা হাজারও ছাড়িয়ে যায়। এত রোগীর তুলনায় জনবল সীমিত হওয়ায় সেবা দিতে আমাদের অনেক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। তিনি জানান, বিকেলের সময় পুরুষ ও মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডে মাত্র দুইজন নার্স দায়িত্ব পালন করেন। তখন একজন নার্সের অধীনে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জন রোগী থাকে, যা সামাল দেওয়া অত্যন্ত কঠিন।

কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. হোসেন ইমাম বলেন, হাসপাতালটি ২৫০ শয্যার হলেও বাস্তবে প্রতিদিন প্রায় ৮০০ থেকে ৯০০ জন রোগী ভর্তি থাকে। এত সংখ্যক রোগীর তুলনায় ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য জনবল খুবই কম। ফলে অনেক সময় প্রত্যাশিত সেবা দিতে আমাদের হিমশিম খেতে হয়। তিনি আরও বলেন, সরকারিভাবে ওষুধ সরবরাহ করা হয় ২৫০ শয্যার হিসাব ধরে। কিন্তু বাস্তবে অনেক বেশি রোগীকে সেবা দিতে হওয়ায় ওষুধ প্রায়ই অপর্যাপ্ত হয়ে পড়ে। এছাড়া অনেক সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিরা বেড বা কেবিনের জন্য চাপ সৃষ্টি করেন, যা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

ডা. হোসেন ইমাম আরও বলেন, হাসপাতালে দীর্ঘ দিন ধরে জলাতঙ্ক ও ইপিআই টিকা সংকট রয়েছে। বার বার উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করার পরও টিকা পাওয়া যাচ্ছে না। যার ফলে জলাতঙ্ক রোগী আসলে আমরা চিকিৎসা দিতে পারছি না এবং ইপিআইট টিকা কর্মসূচী মারাত্বক হুমকির মুখে পড়েছে।

স্থানীয়দের মতে, কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালটি জেলার প্রধান সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্র হওয়ায় প্রতিদিনই বিভিন্ন উপজেলা থেকে বিপুল সংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু হাসপাতালের অবকাঠামো ও জনবল সেই তুলনায় বৃদ্ধি না পাওয়ায় দিন দিন রোগীদের ভোগান্তি বাড়ছে। সচেতন মহলের দাবি, দ্রুত প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবল নিয়োগ, শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা না হলে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে রোগীদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।