স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের সবুজ সংকেত না মেলায় সেবা চালু করতে পারছে না হাসপাতাল পরিচালক
বারবার পরিকল্পনা করেও সমন্বয়হীনতার কারনে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চালু করা যাচ্ছে না। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের অভিযোগ, ভবন বুঝে পেতে দেরি হওয়াসহ নানা জটিলতায় তারা বর্হিবিভাগ চালু করতে পারছেন না। কাজের দায়িত্বে থাকা কুষ্টিয়া গণপুর্ত বিভাগ থেকে সম্প্রতি হাসপাতালের একটি অংশ বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। ভবনের বাকি অংশ ডিসেম্বর মাসের আগে বুঝিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের সবুজ সংকেত না মেলায় সেবা চালু করতে পারছে না হাসপাতাল পরিচালক
ভবনের একটি অংশ বুঝে পেলেও সেবা চালু করার বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের ছাড়পত্র প্রয়োজন। অনুমতির জন্য চিঠি পাঠানো হলেও সবুজ সংকেত মেলেনি বলে জানা গেছে। চলতি বছরের জুনে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় ১৮০ কোটি টাকা খরচ করতে পারেনি গণপুর্ত ও প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয়। প্রকল্পের মেয়াদ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হলেও ফেরৎ যাওয়া ১৮০ কোটি এখনো ছাড় করা হয়নি। এদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয় থেকে হাসপাতাল চালুর বিষয়ে কোন সবুজ সংকেত মেলেনি। এদিকে জুনে ক্রয় করার দামি সব যন্ত্রপাতি ও ফার্নিচার ফেলে রাখা হয়েছে নির্মাণাধীন ভবনে। এসব যন্ত্রপাতি সময়মতো ব্যবহার করা না হলে নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে বলে মনে করেন স্বাস্থ্য বিভাগের অনেকে।
কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মারুফ হাসান বলেন, ‘প্রকল্পের পরিচালক সম্প্রতি হাসপাতালের একটি অংশ আমাদেরকে বুঝিয়ে দিয়েছেন। আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ে অনুমতির জন্য আবেদন করেছি। অনুমতি পাওয়া গেলে বর্হি:বিভাগে সেবা চালু করা হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছি। আমাদের চিকিৎসকসহ জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা যোগদানও করেছে। তবে ভবন বুঝিয়ে দেওয়ার বিষয়ে বারবার সময় নিলেও তারা তা পারেনি। এসব কারনে কিছুটা দেরি হচ্ছে।’
তবে একাধিক সূত্র জানিয়েছে, হাসপাতাল ভবনের সব কিছু বুঝে না পাওয়া পর্যন্ত সেবা চালুর বিষয়ে অনুমতি মিলবে না। সেবা চালু করতে হলে এর সাথে অনেক বিষয় থাকে। এসব বিষয় ফয়সালা না হলে সেবা চালু করলে মানুষ সঠিক চিকিৎসা সেবা পাবে না বলে মনে করেন অনেকে। কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল ভবনের নির্মাণ কাজ শেষে চলতি বছরের জুনের মধ্যে চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা ছিল। তবে এ সময়ের মধ্যে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও কাজ শেষ করতে পারেনি ঠিকাদার ও গণপুর্ত। এরপর মেয়াদ শেষে আবার ৬ মাসের জন্য বাড়িয়ে ডিসেম্বরে প্রকল্পের সমাপ্ত করার কথা বলা হয়েছে মন্ত্রনালয় থেকে। এ সময়ের মধ্যে হাসপাতালসহ অন্যান্য ভবনের কাজ শেষ করা ছাড়াও সকল সড়ক, প্রাচীর ও গেট নির্মাণ করতে হবে।
গণপুর্ত বিভাগ জানিয়েছে, নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত প্রকল্পের ৮৮ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। ১০তলা ভিত্তির ওপর এখন ৭তলা বিশিষ্ট হাসপাতালের কাজ শেষ হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগকে গত মাসের ২২ তারিখ একটি অংশ বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। ডিসেম্বরের মধ্যে বাকি সব কাজ শেষ করার চেষ্টা করছে তারা।
গণপুর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলাম বলেন,‘ মেয়াদ বাড়লেও ফেরৎ যাওয়া অর্থ এখনো ছাড় হয়নি। অর্থ মন্ত্রনালয় থেকে অর্থ ছাড়ের বিষয়ে সবুজ সংকেত মিলেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয় থেকে ছাড়ের বিষয়ে কাজ চলছে। আমরা হাসপাতালের পুরো কাজ শেষ করেছি। ইতিমধ্যে সেবা চালুর করার জন্য বুঝিয়ে দিয়েছে। এখন বাকি কাজ তাদের।’
সময়মতো প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় পরিদর্শনে গিয়ে বেশ কয়েকবার ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ এমপি। হাসপাতালটি তার নির্বাচনী আসন সদরের মধ্যে অবস্থিত হওয়ায় ভোটের আগেই এটি চালুর বিষয়ে তার কড়া নির্দেশনা ছিল। তারপরও এটি চালু করতে পারেনি স্বাস্থ্য বিভাগ। কয়েকবার জোড়াতালি দিয়ে চালুর উদ্যোগ নিলেও মন্ত্রনালয় তাতে সাই দেয়নি। এখন নির্বাচনের তফশিলের আগেই হাসপাতাল চালুর বিষয়ে তোড়জোড় চলছে বলে জানা গেছে।
প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয় জানায়, চলতি বছরের জুনের মধ্যে হাসপাতাল চালু করার জন্য নির্দেশনা ছিল মন্ত্রনালয়ের। তারা বারবার তাগাদা দিলেও আমরা করতে পারেনি। আমাদের যন্ত্রপাতি ও ফার্নিচার ক্রয়ের জন্য যে বরাদ্দ ছিল তাও খরচ করতে পারেনি। মাত্র ২৮ কোটি টাকার টেন্ডার শেষ করেছি। বাকি টাকা ফেরত গেছে। এখনো ১০০ কোটি টাকার ক্রয় বাকি আছে আমার কার্যালয়ের। এদিকে জুনের দিকে তড়িঘড়ি যন্ত্রপাতি ও ফার্নিচার ক্রয়ের জন্য কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এসব যন্ত্রপাতির মধ্যে এমআরআই মেশিন, সিটিস্ক্যানসহ ভারী আরো যন্ত্রপাতি আছে। এসব যন্ত্রপাতি নির্মাণাধীন হাসপাতালের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় বিভিন্ন কক্ষে তালা মেরে রাখা হয়েছে।
সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, বিভিন্ন কক্ষে গাদাগাদি করে নানা রকম ফার্নিচার ও যন্ত্রপাতি রাখা হয়েছে। তালা মেরে রাখা হলেও সেখানে নিরাপত্তার জন্য কোন ব্যবস্থা নেওয়া নেই। যে কোন সময় কক্ষের দরজা ভেঙ্গে এসব মালামাল ও যন্ত্রপাতি চুরি হয়ে গেলেও দেখার মত তেমন কোন লোকবল নেই। জুনের পর জুলাই ও আগষ্ট মাসেও কয়েক দফা হাসপাতালে সেবা চালুর উদ্যোগ নিলেও সে প্রচেষ্টা সফল হয়নি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক হাসপাতাল ভবনে নিযুক্ত ভান্ডার কর্মকর্তা মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘বিদ্যমান অবস্থায় হাসপাতাল ভবন চালু করতে গেলে এখনও অনেক কাজ বাকি আছে। এখানে কোটি কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জামাদি চরম অরক্ষিত ও নিরাপত্তাহীন অবস্থায় বিক্ষিপ্তভাবে রাখা আছে। যে কোন সময় বড় কোন অনিষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
হাসপাতাল ভবন নির্মানের কাজের প্রকল্প পরিচালক চৌধুরী ডা: সরওয়ার জাহান জানান, কাজ চলমান আছে। আমরা নতুন করে টেন্ডার শেষে সব মালামাল ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ের চেষ্টা করছি। হাসপাতালে বহির্বিভাগ চালু করার জন্য সামনের একটি অংশ বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে পরিচালককে। আশা করা যাতে অনুমতি পেলেই সেটি চালু করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন,‘ এছাড়া ফেরৎ যাওয়া অর্থ ছাড়ের বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন আছে। অর্থ না পেলে অনেক কাজও করা যাচ্ছে না।’
প্রকল্প দপ্তর সূত্রের তথ্যে জানা যায়, ২০১২-১৩ অর্থ বছরে ২৭৫ কোটি টাকা প্রাক্কলন ব্যয় ধরে অনুমোদন প্রাপ্ত কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রকল্পের নির্মান কাজ শেষ করে ২০১৮ সালের ৩০জুন সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য বিভাগে হস্তান্তর করার কথা। কিন্তু এই প্রকল্পের কার্যাদেশ প্রাপ্ত নির্মানকারী ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান নানা অনিয়ম ও জটিলতা সৃষ্টি করে ধাপে ধাপে একাধিকবার প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে করেন। সর্বশেষ এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৮২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এবং নির্মান বাস্তবায়নের নির্ধারিত সময়সীমা বেধে দেয়া হয় ৩০জুন ২০২৩ পর্যন্ত। কিন্তু সর্বশেষ সময়ের মধ্যেও কাজ শেষ করতে পারেনি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। বর্হিবিভাগের রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণসহ পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপনের চলমান কাজ দ্রুত শেষ করে হাসপাতাল ভবন চালু করা হবে’। সেবা চালু হলে কুষ্টিয়াসহ আশেপাশের ৫টি জেলার মানুষ উন্নত স্বাস্থ্য সেবা পাবে।
