ধারণ ক্ষমতার চারগুণ বেশি রোগীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে চলেছে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ
কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের রোগী ধারণ ক্ষমতা ২৫০ জন । কুষ্টিয়া জেলার প্রায় ২১ লক্ষ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে এই জেনারেল হাসপাতাল। সেই সাথে কুষ্টিয়া জেলার পার্শবর্তী জেলা ঝিনাইদহ, মেহেরপুর এবং চুয়াডাঙ্গা জেলা থেকেও প্রতিদিন স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী।

ধারণ ক্ষমতার চারগুণ বেশি রোগীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে চলেছে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ
এই হাসপাতালের অবকাঠামোগত সমস্যা ছাড়াও রয়েছে নানাবিধ সমস্যা। সম্প্রতি সমগ্র বাংলাদেশে ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার কারণে আরো অতিরিক্ত রোগী চিকিৎসা সেবা নিয়ে আসছে এই হাসপাতালে। রোগীদের অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে হাসপাতালের ডাক্তার এবং নার্সসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দিন রাত একাগ্রচিত্তে কাজ করে চলেছেন ।
বুধবার (২৫ অক্টোবর) সরেজমিনে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ধারণ ক্ষমতার চারগুণ রোগী ভর্তি রয়েছে এই হাসপাতালে। শয্যা সংকটের কারণে অধিকাংশ রোগীর ঠাঁই হয়েছে ওয়ার্ডের মেঝে অথবা বারান্দায়। অতিরিক্ত রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিতে ডাক্তার এবং নার্সরা ছুটে বেড়াচ্ছেন এক রোগী থেকে অন্য রোগীর কাছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, শুধু মঙ্গলবার (২৪ অক্টোবর) কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালে নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন ২৯৪ জন। গতকাল বুধবার দুপুর ২টা পর্যন্ত মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৯০৫ জন। কোন কোন ওয়ার্ডে বেডের সংখ্যার চেয়ে রোগী ভর্তি প্রায় ৪ থেকে ৫ গুণ বেশী । হাসপাতাল সূত্রে আরো জানা যায়, ১নং ( পুরুষ ও মহিলা অর্থোপেডিস) ওয়ার্ডের ধারণ ক্ষমতা ২৫ জনের বিপরীতে রোগী ভর্তি রয়েছেন ৫৮ জন, ২ নং (পুরুষ মেডিসিন) ওয়ার্ডের ধারণ ক্ষমতা ২৪ জনের বিপরীতে রোগী ভর্তি রয়েছেন ১২৮ জন, ৩নং (মহিলা মেডিসিন) ওয়ার্ডের ধারণ ক্ষমতা ২৪ জনের বিপরীতে রোগী ভর্তি রয়েছেন ১১২ জন, ৪ নং শিশু ওয়ার্ডের ধারণ ক্ষমতা ২০ জনের বিপরীতে রোগী ভর্তি রয়েছেন ২১২ জন, ৫নং ডায়েরিয়া ওয়ার্ডের ধারণ ক্ষমতা ১২ জনের বিপরীতে রোগী ভর্তি রয়েছেন ৪৬ জন, ৬নং (মহিলা সার্জারি) ওয়ার্ডের ধারণ ক্ষমতা ২০ জনের বিপরীতে রোগী ভর্তি রয়েছেন ৯১ জন, ৭নং (সিসিইউ) ওয়ার্ডের ধারণ ক্ষমতা ১৬ জনের বিপরীতে রোগী ভর্তি রয়েছেন ১৬ জন, ৮নং (গায়নী) ওয়ার্ডের ধারণ ক্ষমতা ২৪ জনের বিপরীতে রোগী ভর্তি রয়েছেন ৩৯ জন, ৯ নং (লেবার) ওয়ার্ডের ধারণ ক্ষমতা ২০ জনের বিপরীতে রোগী ভর্তি রয়েছেন ৪২ জন, ১০নং (পুরুষ সার্জারি) ওয়ার্ডের ধারণ ক্ষমতা ২৫ জনের বিপরীতে রোগী ভর্তি রয়েছেন ৬৩ জন, ডেঙ্গু বা পেইং ওয়ার্ডের ধারণ ক্ষমতা ১৬ জনের বিপরীতে রোগী ভর্তি রয়েছেন ৭০ জন, আইসিইউ ওয়ার্ডের ধারণ ক্ষমতা ১০ জনের বিপরীতে রোগী ভর্তি রয়েছেন ১০ জন, স্ক্যানু ওয়ার্ডের ধারণ ক্ষমতা ১০ জনের বিপরীতে রোগী ভর্তি রয়েছেন ১৩ জন এবং ৫ জন রোগী ক্যাবিনে চিকিৎসা সেবা গ্রহন করছেন ।

ধারণ ক্ষমতার চারগুণ বেশি রোগীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে চলেছে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ
হাসপাতাল সূত্রে আরো জানা যায়, কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে সেবা কার্য পরিচালনার জন্য ২২৩ জন সেবিকা রয়েছেন। যার মধ্যে ৩ জন সুপারভাইজার এবং একজন সেবা তত্ত্বাবধায়ক। মূলত ৩ শিফটে বিভক্ত হয়ে ২২৩ জন সেবিকা রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করে থাকেন। সকালে ১৬৫ জন, বিকেল ৩৫ জন এবং রাতে মাত্র ২৩ জন । যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম।
হাসপাতালে কয়েকজন নার্স এর সাথে কথা বললে তারা জানান, রোগীদের চাপ যেভাবে বাড়তে শুরু করেছে তাতে সেবিকার সংখ্যা না বাড়ালে এবং রোগীর সংখ্যা এই ভাবে বাড়তে থাকলে সেবার মান মুখ থুবড়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
চিকিৎসা সেবা নিতে আসা কয়েকজন রোগী এবং তাদের স্বজনদের সাথে কথা হলে তারা বলেন, হাসপাতালে বর্তমানে রোগীর সংখ্যা অনেক বেশী। রোগীদের ভীড়ে কোথাও পা ফেলাবার জায়গা নাই। তারপর ডাক্তার ও নার্সরা আন্তরিকভাবে তাদের কাজ করছেন। যে কোন প্রয়োজনে তাদের কাছে গেলে তারা সাথে সাথে সেটার সমাধান করে দিচ্ছেন।
এই বিষয়ে হাসপাতালের সেবা তত্ত্বাবধায়ক হামিদা খাতুনের সাথে কথা হলে তিনি জানান, হাসপাতালে পা ফেলার মত জায়গা নাই। আমরা চেষ্টা করছি এর মধ্যেই পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার। হাসপাতালে সেবার মান অবশ্যই ভালো, তা না হলে এত রোগী কেন আমাদের কাছে আসছে। সেবা দিতে গিয়ে আমাদের মেয়েরা (নার্স) অসুস্থ হয়ে পড়ছে, আমাদের খুবই কষ্ট হচ্ছে। তারপরেও আমরা কষ্ট করেই রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছি। জনবল কম থাকার কারণে প্রত্যেক মেয়ারা (নার্সরা) কয়েক দিন পর পরই নাইট ডিউটি করছে। সরকার জনবল নিয়োগ না দেওয়া পর্যন্ত আমাদেও এই বেই কষ্ট করে যেতে হবে। দ্রুত জনবল নিয়োগ হলে আমাদেও কষ্ট লাঘব হতো ।
![]()
কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক ডাক্তার ডাঃ তাপস কুমার পাল জানান, অর্ন্তবিভাগের প্রতিদিন ৮ শতাধিক রোগী ভর্তি হচ্ছে। অতিরিক্ত রোগী ভর্তির কারণে বর্তমানে হাসপাতালে জায়গার সমস্যা প্রচুর। যার ফলে বারান্দায়, সিঁড়িঘরে রোগীরা অবস্থান করে চিকিৎসা নিচ্ছে। যা অমানবিক। বিছানা তো দূরের কথা, আমরা তাদেরকে বসার জায়গা পর্যন্ত দিতে পারছি না। এই অবস্থায় রোগীদেরকে সুষ্ঠ চিকিৎসা সেবা দেওয়াটার কষ্টকর। তারপরও আমরা আমাদের সাধ্যের মধ্যে মান সম্পন্ন সেবা দেওয়া চেষ্টা করছি । এছাড়াও চিকিৎসা সেবা কর্মির কারণেও মাঝে মাঝে রোগীদের সেবা দিতে সমস্যা হয়। প্রত্যেকটা রোগীর চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে আমাদের সকল কর্মকর্তা কর্মচারী তাদেও সাধ্যমত চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এতে বিপুল সংখ্যক রোগীর সেবা দেওয়ার জন্য যে পরিমান জনবল প্রয়োজন সেই পরিমান জনবল আমাদের নেই। আমরা কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করেছি। আশা করি কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।
কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ রফিকুল ইসলাম জানান, আমাদের আড়াই’শ বেড ধারণ ক্ষমতা সেখানে আজকে রোগীর সংখ্যা ৯০৫ জন । এখানে প্রতিদিন ধারণ ক্ষমতার চেয়েও বেশী রোগী এখানে সেবা নিতে আসে। আমাদের চিকিৎসকরা আপ্রাণ চেষ্টা কওে যাচ্ছে রোগীর মানসম্পন্ন সেবা দেওয়ার জন্য। এখন পর্যন্ত রোগীদের সেবা দিতে কোন সমস্যা হয়নি। আমরা আমাদের চিকিৎসক দিয়েই এই স্বল্প জায়গার মধ্যে রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছি। এই অবস্থায় আমরা সকলের সহযোগিতা কামনা করছি।
