স্থানীয় রাজনীতিতে মেরুকরণ: চ্যালেঞ্জের মুখে হানিফ, ইনু এবং জর্জ
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ নিয়ে সংশয় থাকলেও কুষ্টিয়া- ৩ (সদর) আসনে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী মাহবুবউল আলম হানিফ এবার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। কুষ্টিয়া পৌরসভার জনপ্রিয় মেয়র আনোয়ার আলীর ছেলে পারভেজ আনোয়ার তনু প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেওয়ায় এমনটা ভাবছেন নেতাকর্মীরা। বিষয়টি এখন টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয় রাজনীতিতে মেরুকরণ: চ্যালেঞ্জের মুখে হানিফ, ইনু এবং জর্জ
অপর দিকে কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা) আসনে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে যাচ্ছেন। মিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কামারুল আরেফিন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। উপজেলা চেয়ারম্যানের পদ ছেড়ে দিয়ে তিনি স্বতন্ত্র নির্বাচন করতে যাচ্ছেন। এছাড়াও কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসনের বর্তমান এমপি ও আওয়ামী যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সেলিম আলতাফ জর্জকে ঐ আসনের সাবেক এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুর রউফ’র সাথে ভোট যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হবে। আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ার কারণে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করবেন তিনি।
কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে ক্রীড়া সংগঠক ও ব্যবসায়ী পারভেজ আনোয়ার তনু এরই মধ্যে মনোনয়নপত্র তুলেছেন। তরুণদের মধ্যে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। নেতাকর্মীরা মনে করেন, ভোটের মাঠে শেষ পর্যন্ত তনু থাকলে হিসাব-নিকাশ বদলে যেতে পারে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী দিলেও নেতাকর্মী মাঠে নামতে পারেননি। হামলা-মামলায় আক্রান্ত হয়ে তাদের ঘরে বসে থাকতে হয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে অপেক্ষাকৃত বিএনএফের দুর্বল প্রার্থী ছিলেন নৌকার প্রতিপক্ষ।
সেই তুলনায় তনু শক্ত প্রার্থী বলে মনে করেন অনেকে। তনুর বাবা আনোয়ার আলী কুষ্টিয়া পৌরসভার পাঁচবারের নির্বাচিত মেয়র। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে সামান্য ভোটে আনোয়ার আলী পরাজিত হন। জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার আলী এখনো দলে জনপ্রিয় নেতা। পৌর এলাকায় তার নিজস্ব ভোট ব্যাংক আছে। তার ছেলে যুব নেতা তনু প্রার্থী হলে একটু বাড়তি সুবিধা পাবেন।
অন্যদিকে টানা দুইবারের সংসদ-সদস্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হানিফ এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন কাজ করেছেন। যা অন্য কারও সময় হয়নি। তবে নেতাকর্মীদের অভিযোগ, হানিফের আমলে সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ ছিল তার চাচাতো ভাই সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতার হাতে। দলের ত্যাগী নেতারা কোণঠাসা হয়ে পড়েন।
নির্বাচন করার বিষয়ে জানতে চাইলে পারভেজ আনোয়ার তনু বলেন, আমার পরিবার রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গেও আমার বাবা রাজনীতি করেছেন। এবার সদর আসন থেকে আমি স্বতন্ত্র নির্বাচন করার জন্য মনোনয়নপত্র উত্তোলন করেছি। নির্বাচনের জন্য পুরোদমে প্রস্তুতি নিচ্ছি।
গত দুটি সংসদ নির্বাচনে হানিফের পক্ষে তনুর বাবা আনোয়ার আলী মাঠে নেমেছিলেন। এবার তনু মনোনয়নপত্র কেনায় সেই চিত্র বদলে যেতে পারে। আওয়ামী লীগের আনোয়ার আলীপন্থি নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ হওয়া শুরু করেছেন। এদিকে মেয়রপুত্র তনু মনোনয়নপত্র কেনায় হানিফ অনুসারী নেতাকর্মীসহ দলের অনেকে ক্ষুব্ধ হয়েছেন। বিষয়টি তারা ভালোভাবে নিচ্ছেন না। শেষ পর্যন্ত তনু মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করবেন বলে তারা মনে করছেন।
জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট হাসানুল আসকার হাসু বলেন, সদরে হানিফ ভাইয়ের কোনো বিকল্প নেই, তার নেতৃত্বে দল ঐক্যবদ্ধ। তিনি যে উন্নয়ন করেছেন তাতে দলমত নির্বিশেষে তাকে সমর্থন দিয়ে যাব। এবারও তিনি বিপুল ভোটে জয়ী হবেন।
কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা) আসনে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে আবির্ভূত হয়েছেন মিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কামারুল আরেফিন। মঙ্গলবার দুপুরে জেলা প্রশাসকের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পর আরেফিন সাংবাদিকদের বলেন, তিনি সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এ সময় তার সঙ্গে মিরপুর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের চেয়ারম্যানরা ছাড়াও জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
কামারুল আরেফিন বলেন, কুষ্টিয়া-২ আসনটি ফাঁকা রাখা হয়েছে। দল আমাকে নৌকা দিলে নির্বাচন করব। আর দল না দিলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করব। এজন্য পদত্যাগ করলাম। তিনি বলেন, জাসদ নেতা ইনু আওয়ামী লীগের ৮০ ভাগ ভোটের ওপর ভর করে তিনবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। ইনুর সময় মিরপুর ও ভেড়ামারায় আওয়ামী লীগের চার নেতাকর্মী হত্যা করা হয়েছে। তাই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তাকে (ইনু) আর এমপি হিসাবে দেখতে চায় না। দুই উপজেলার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা আমাকে ভোট দেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে।
কুষ্টিয়া- ২ আসনে টানা তিনবার জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু নির্বাচিত হয়েছেন। ২০১৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে তিনি তথ্যমন্ত্রী হন। আগের সব নির্বাচনে সহজে জয়ী হলেও এবার ইনুর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন মিরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান কামারুল আরেফিন। মিরপুর উপজেলা যুবলীগ সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান আবুল কাশেম জোয়াদ্দার বলেন, জাসদের প্রতি আমাদের নেতাকর্মীদের নানা ক্ষোভ রয়েছে। আওয়ামী লীগের ভোটে ইনু সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন না। দুই বছরে আওয়ামী লীগের দুই নেতাকে হত্যা করেছে জাসদের নেতাকর্মীরা। এছাড়া হামলা-মামলা দিয়েও আওয়ামী লীগ নেতাদের কোণঠাসা করে রাখার চেষ্টা করেছে জাসদ। এসব নিয়ে কর্মীদের মনে কষ্ট ও ক্ষোভ এবং হতাশা রয়েছে। তাই আরেফিন স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও আমরা তার নির্বাচন করতে চাই।
এদিকে কুষ্টিয়া-২ আসন থেকে পুনরায় নির্বাচন করার জন্য বর্তমান এমপি হাসানুল হক ইনুর মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তিনি বলেন, তিনটি নির্বাচনে আমরা জোটগতভাবে নির্বাচন করেছি। এবারও আমরা জোটগতভাবে নির্বাচন করব এবং আমি প্রার্থী হব। তিনি আরও বলেন, মনোনয়নপত্র যে কেউ তুলতে পারেন।
কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য সেলিম আলতাফ জর্জ এমপি হওয়ার আগ পর্যন্ত সক্রিয়ভাবে রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন না বা দলীয় ভাবে তাকে কোন পদ পদবীতে দেখা যায়নি। তবে পারিবারিকভাবে সেলিম আলতাফ জর্জ আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান। কুমারখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও সাবেক সাংসদ গোলাম কিবরিয়ার দৌহিত্র তিনি। সবাই মনে করেন সেই কারনেই সেলিম আলতাফ জজ’র্র একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধূমকেতুর মত অর্বিভাব হয় এবং নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে সংসদ সদস্য হন।
অপর দিকে কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসন থেকে কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামীলীগের সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রউফ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করবেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে । তিনি ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০০৯ সাল থেকে ২৯ নভেম্বর ২০১৩ সাল পর্যন্ত কুমারখালী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবদুর রউফ দলীয় টিকিট পান এবং নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে ৬২ হাজার ১৪৯ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। কুষ্টিয়া-৪ আসনে তার নিজস্ব ভোট ব্যাংক রয়েছে।
এছাড়াও আওয়ামীলীগের অভ্যন্তরে অর্ন্তদ্বন্দ্ব থাকায় তার পক্ষে জয়লাভ করা সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত দেখার বিষয় কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত মোতাবেক কে কে নির্বাচনে টিকে থাকবে।
