সর্বোচ্চ আদালতের আইনজীবীদের সংগঠন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণ হলেও ভোট গণনা নিয়ে হট্টগোল-মারামারির ঘটনা ঘটে। ফলে ভোট গণনা স্থগিত করা হয়। গতকাল শুক্রবার (৮ মার্চ) সারাদিন ভোটগণনা নিয়ে কারো কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। নির্বাচন পরিচালনা উপ কমিটির আহŸায়ক আবুল খায়ের জানিয়েছেন, ব্যালট সিলগালা অবস্থায় পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে। ভোট গণনা করে ফলাফল ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি গত বৃহস্পতিবার (৭ মার্চ বিকেলে ৫টা পর্যন্ত) পর্যন্ত কোনোরকম ঝামেলা ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবে দুই দিনের ভোটগ্রহণ শেষ হয়। নির্বিঘœ ভোট নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন প্রার্থীরাও। ভোটগ্রহণ শেষে নির্বাচন পরিচালনা উপ কমিটি জানায়, এবারের নির্বাচনে ৭ হাজার ৮৮৮টি ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। রাতেই ভোটগণনা করে ফলাফল ঘোষণার কথা ছিল প্রত্যক্ষদর্শী আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রদেয় ভোট যাচাই-বাছাই করতেই রাত প্রায় ৩টা বেজে যায়। তখন ভোটগণনা নিয়ে প্রার্থীদের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়। কিন্তু রাতে প্রার্থীদের এজেন্ট না থাকার কথা উলেখ করে আওয়ামী লীগ সমর্থিত সাদা প্যানেলের সম্পাদক পদপ্রার্থী শাহ মঞ্জুরুল হকসহ বেশ কয়েকজন প্রার্থী শুক্রবার দিনে ভোটগণনার দাবি তোলেন। আর সম্পাদক প্রার্থী নাহিদ সুলতানা যুথী ও বিএনপি সমর্থিত নীল প্যানেলের সম্পাদক প্রার্থী রুহু“ল কুদ্দুস কাজলসহ কয়েকজন রাতেই ভোটগণনার পক্ষে অবস্থান নেন। এ নিয়ে বাদানুবাদের এক পর্যায়ে গতকাল শুক্রবার ভোরে প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতি-মারামারির ঘটনা ঘটে। মারামারিতে একজন সহকারী আইন কর্মকর্তাসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। ভোটগণনা নিয়ে হট্টগোলের বেশ কয়েকটি ভিডিও গতকাল শুক্রবার সকালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এসব ভিডিওর একটিতে সম্পাদক প্রার্থী নাহিদ সুলতানা যুথীকে বেশ উত্তেজিত অবস্থায় দেখা যায়। আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, নির্বাচন পরিচালনা উপ কমিটির আহŸায়ক আবুল খায়ের সম্পাদক পদে নাহিদ সুলতানা যুথীকে বিজয়ী ঘোষণা করতে। জানতে চাইলে নির্বাচন পরিচালনা উপ কমিটির আহŸায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল খায়ের শুক্রবার সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ভোটগণনা হয়নি। ব্যালট সিলগালা অবস্থায় পুলিশ হেফাজতে আছে। ভোট গণনা করে দু-একদিনের মধ্যে ফলাফল ঘোষণা করা হবে।’ কবে ভোট গণনায় বসবেন জানতে চাইলে জ্যেষ্ঠ এ আইনজীবী বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, সমিতির সাবেক নেতৃত্ব এবং প্রার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করেই ভোট গণনার দিনক্ষণ ঠিক করা হবে।’ একজন সম্পাদক প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণার বিষয়ে আবুল খায়ের বলেন, ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এ ভিডিও ছড়ানো হয়েছে। কেন, কোন পরিস্থিতিতে এ ঘোষণা দিতে হয়েছিল, তা বুঝতে পেরেছেন আশা করি। কারণ আমি ফলাফল ঘোষণা করলে তো আর একটা পদের ফলাফল ঘোষণা করব না। যেখানে ভোটগণনাই হয় নাই, সেখানে ফলাফল ঘোষণা হয় কিভাবে?’ এ পরিস্থিতি নিয়ে সম্পাদক প্রার্থী শাহ মঞ্জুরুল হক বলেন, ‘খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি। নির্বাচন পরিচালনা উপ কমিটির আহŸায়ককে চাপের মুখে ফেলে একটি ঘোষণা দেওয়ানো হয়েছে। ভোটগণনা হয় নাই। ভোটগণনার পর যিনি জিতবেন তিনি সম্পাদক হবেন। আশা করছি কাল ভোটগণনা হবে।’ নীল প্যানেলের সম্পাদক প্রার্থী রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘নির্বাচন পরিচালনা উপ কমিটির আহŸায়ক অকস্মাৎ একজনকে সম্পাদক ঘোষণা করলেন। সমিতি থেকে ব্যালট বাক্স হাওয়া হয়ে গেল। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে নিউজ এসেছে কে বা কারা ব্যালট বাক্স নিয়ে চলে গেছে। এখন ফলাফল ঘোষণা করলে সেটা হবে আরেকটি নতুন নাটক। এ নাটক দিয়ে আওয়ামী লীগ তাদের প্যানেলের লোকজনদের বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করবে।’ সম্পাদক প্রার্থী নাহিদ সুলতানা যুথীর বক্তব্য জানতে বেশ কয়েকবার ফোন দেওয়া হয়। একবার তিনি ফোন কেটে দেন। গত ১১ ফেব্র“য়ারি এক নোটিশে সমিতির দুই দিনব্যাপী নির্বাচনের (২০২৪-২৫) তারিখ ঘোষণা করা হয়। তফসিল অনুসারে, গত ৬ ও ৭ মার্চ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হয়। অরাজনৈতিক পেশাজীবী সংগঠন হলেও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীরা বরাবরই প্যানেলভিত্তিক পরিচিতি পেয়েছেন। আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীদের সংগঠন বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের মনোনীত প্রার্থীরা ‘সাদা প্যানেল’র প্রার্থী হিসেবে হিসেবে পরিচিত। আর বিএনপি-জামায়াতপন্থী আইনজীবীদের সংগঠন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী প্যানেলের সমর্থিত প্রার্থীরা ‘নীল প্যানেল’র প্রার্থী হিসেবে পরিচিত। প্রতি বছর সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ১৪টি পদে নির্বাচন করে থাকে। এর মধ্যে সভাপতি-সম্পাদকসহ দাপ্তরিক পদ ৭টি, বাকি ৭টি সদস্য পদ। সাদা-নীল দুই প্যানেলই বরাবরের মত ১৪টি পদে প্রার্থিতা ঘোষণা করেছে। এ দুই প্যানেলের বাইরে সভাপতি পদে দুইজন, সম্পাদক পদে দুইজন এবং কোষাধ্যক্ষ পদে একজন নির্বাচন করছেন। অর্থাৎ এবারের নির্বাচনে মোট ৩৩ জন প্রার্থী হয়েছেন। গত বছর সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচন ঘিরে সাদা-নীল প্যানেলের প্রার্থী-সমর্থক আইনজীবীদের মধ্যে ব্যাপক হট্টগোল হয়। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, হাতাহাতি-ভাঙচুরের মধ্যে পুলিশি হামলার ঘটনাও ঘটে। পুলিশের হামলায় আইনজীবীদের পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্ট বিটের বেশ কয়েকজন সাংবাদিকও আহত হন। আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন বর্জন না করলেও নীল প্যানেলের প্রার্থীরা ভোট থেকে সরে দাঁড়ায়। গত বছর ১৫-১৬ মার্চ ভোট হয়। দ্বিতীয় দিনের একপেশে ভোটের পরদিন অর্থাৎ ১৭ মার্চ ফল প্রকাশ করে নির্বাচন পরিচালনা উপ কমিটি। নিরঙ্কুশ জয় পায় বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ সমর্থিত সাদা প্যানেল।
