কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে স্বাস্থ্য সেবার নামে চলছে ভোগান্তী!
কুষ্টিয়া সদর হাসপাতাল দিন দিন অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হচ্ছে। সেবা নিতে আসা রোগী এবং রোগীর স্বজনদের সাথে বাজে ব্যবহার, নির্দিষ্ট সময়ে ডাক্তারদের হাসপাতালে না আসা এবং সুবিধাভোগী ডাক্তারদের টেস্ট বাণিজ্যে অতিষ্ট হয়ে উঠেছে সাধারণ রোগীরা । এই সকল অনিয়ম থেকে পরিত্রানের উপায় খুঁজেও ব্যর্থ সেবা গ্রহীতারা ।

কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে স্বাস্থ্য সেবার নামে চলছে ভোগান্তী!
এছাড়ও হাসপাতালে প্রতিনিয়ত ঘটছে চুরির ঘটনা। যা থেকে রেহায় পাচ্ছেন না স্বয়ং হাসপাতালের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও । ৩০ মার্চ বৃহঃবার দুপুর ১২ টার সময় কুষ্টিয়া সদর হাসপালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চক্ষু বিভাগের সামনে প্রায় দুই শত সেবা প্রার্থী ভিড় জমিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ।
জানতে চাইলে ভুক্তভোগীরা জানান, গত তিন দিন যাবত চক্ষু বিভাগের ডাক্তারের অনুপস্থিত থাকার কথা ।

এই বিষয়ে জোনতে চাইলে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ রফিকুল ইসলাম জানান, চক্ষু চিকিৎসক কয়েকদিন বদলি হয়ে যাওয়ার কারণে আপাতত কোন ডাক্তার না থাকায় মেডিকেল অফিসার দিয়ে চক্ষু সেবা দেওয়া হচ্ছে ।
সময় মত ডাক্তার কেন আসে না? এই বিষয়ে জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ রফিকুল ইসলাম জানান, আমি কয়েকদিন আগে এখানে জয়েন করেছি এবং ইতিমধ্যে বিষয়গুলো কাজ শুরু করেছি । আপনারা আমাকে কিছুদিন সময় দিন, আশা করি সব ঠিক হয়ে যাবে ।
এদিকে চক্ষু বিভাগে ডাক্তার ঠিকমত না আসলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগী সেবা দেওয়ার নামে হাতিয়ে নিচ্ছে টিকেটের টাকা ।
সেবা নিতে আসা বেশ কয়েকজনের সাথে কথা বললে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ডাক্তার না আসলে কেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ টিকেট বিক্রি করছে । ডাক্তার আসবে না জেনেও কেন আমাদের হয়রানি করা হচ্ছে ।

মেহেরপুর থেকে সেবা নিতে আসা একজন প্রতিবেদককে বলেন, আমি সুদূর মেহেরপুর থেকে গত তিনদিন যাবৎ চোখের সমস্যার কারণে হাসপাতালে আসছি । ডাক্তার না থাকায় তিন দিন যাবৎ আসছি এবং ফেরৎ যাচ্ছি । ডাক্তার যদি না থাকে বা না আসে তাহলে আমাদেরকে জানিয়ে দিলেই তো হয় । তাহলে আমাদের কষ্ট করে রোজার দিনে অপেক্ষা করা লাগে না ।
চক্ষু সেবা নিতে আসা অপর একজন জানান, অধিকাংশ ডাক্তাররা টাকার লোভে হাসপাতালে রোগী না দেখে প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী দেখেন । অথচ হাসাপাতালে এসে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করেও ডাক্তারের দেখা মেলে না ।
এদিকে হাসপাতালে রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত সিট না থাকার কারণে হাসপাতালের করিডোরে নোংড়া পরিবেশের মধ্যে থাকতে হচ্ছে রোগী এবং রোগীর সাথে থাকা স্বজনদের । অথচ হাসপাতালে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্ত ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নষ্ট এবং ব্যবহার অযোগ্য বেড । সেগুলো মেরামতেরও কোন উদ্যোগ নেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ।

এছাড়াও বরাবরই ডাক্তার এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারেিদর সংকট দেখিয়ে আসছে হাসপতাল কর্তৃপক্ষ । কবে নাগাদ এই সংকট কাটবে তার কোন সঠিক জবাব জানা নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের । অথচ টাকা দিলেই সব সেবা পাওয়া যায় এমটাই অভিযোগ সেবা নিতে আসা রোগী এবং স্বজনদের । হাসপাতালের জরুরী বিভাগের পৌঁছানোর পর পরই শুরু হয় টাকার খেলা । ট্রলি বহনকারী থেকে শুরু করে টাকা দিতে আয়া এবং নার্সদের । টাকা না দিলে স্বাস্থ্য সেবার পাওয়া অসম্ভব বলে জানান অনেকেই ।
এছাড়াও ডায়াগনেস্টিক সেন্টারের সাথে রয়েছে হাসপাতালের প্রতিটি ডাক্তারের বিশেষ কমিশন বাণিজ্য । যার ফলে অপ্রয়োজনীয় টেস্ট দিয়ে ভোগান্তীতে ফেলা হয় আগত রোগীদের । এই টেস্ট বাণিজ্যে প্রতিটি ডাক্তারই ব্যবহার করে থাকেন নিজস্ব দালাল বা চক্র । যাদেরকে সব সময় ডাক্তাদের পাশে ছায়ার মত ঘুরঘুর করতে দেখা যায় ।
স্বাস্থ্য সেবা নিতে আসা মিরপুর উপজেলার মশান থেকে আগত লিটন আলী জানান, আমি সামন্য প্রেসারের সমস্যার কারণে ডাক্তারের কাছে গেলাম । কিন্তু ডাক্তার আমাকে তিনটা টেস্ট করার জন্য বলে এবং সেই সাথে তার পাশে থাকা দালালদের দেখিয়ে দিয়ে বলে উনাদের সাথে যান, গিয়ে টেস্ট গুলো করিয়ে নিয়ে আাসেন । অথচ টেস্ট গুলো হাসপাতালেও করা হয়। কিন্তু হাসপাতালে না দিয়ে কেন বাইরে থেকে করতে বলবে । আমি হাসাপাতালের সেবা নিয়ে মোটেও সন্তুষ্ট নয় । কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই খানকার নার্সরা সেবা দিতে গেলেও দেখি ঘুমাই ।
কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বিত্তিপাড়া থেকে আগত সিজারিয়ান রোগীর স্বজন জানান, ড্রেসিং করার জন্য সকাল থেকে দুই তিনবার নার্সদের কাছে গিয়েছি, নার্সরা খালি ঘুরা নিয়ে বেড়াই । প্রথমে ৬ নম্বর থেকে ৯ নম্বরে যাইতে বলল, ৯ নম্বরে গেলাম । এরপর সেখানকার সিস্টাররা আবার ৬ নম্বরে পাঠালো । এরপর ডাক্তারকে জানালে, ডাক্তার সিস্টারদের ডেকে বলে । সিস্টাররা তখন বললো করে দিচ্ছি । অথচ তারপর থেকে তারা হারায় গেছে । এখন বলছে তোমরা নিজেরা গিয়ে পরিস্কার করো । যা যা লাগে বাইরে থেকে কিনে আনো ।সিজারিয়ান রোগীর ঐ স্বজন আরো বলেন, হাসপাতালে যে সব জিনিস ফ্রি’তে পাওয়া যায়, সেগুলোও বাইরে থেকে কিনে আনতে হয় ।

কুষ্টিয়া সদর উপজেলার দহকুলা থেকে আগত বশির জানান, টিউমারের অপারেশন হবে বলে আমি আট দিন বয়সের বাচ্চা আজকে দীর্ঘ ৪/৫ দিন আসছি । আসার পরে জন্ডিস ধরা পড়ে । জন্ডিস ধরা পড়ার পরে সিসি’তে নিয়ে গেছে । গতকাল রাতেই আমার বাচ্চাকে বের করে দেয় । বের করে দেওয়ার পরে জন্ডিস কমেনি, বরং বাড়ছে । কেন বের করা হলো, কি কারণে বের করা হলো এই জিনিসটা আমি শুনতে চাচ্ছি । বশির আরো বলেন, এইটা নিজেরে সুযোগ সুবিধা জন্য এমনটা করছে । রাত্রে এখানে কোন রকমই কোন বাচ্চাকে ট্রিটমেন দেওয়া হয় না । রাত্রে নার্স ঘুমাই ।
কুষ্টিয়া কুমারখালী উপজেলার নন্দলালপুর থেকে আগত রবিউল ইসলাম জানান, রাত্রে আমার রোগী নিয়ে আসছি । হাসপাতালে খালি টাকার কারবার । খালী এইটুক ঠেলে নিয়ে আসতে ৫০ টাকা নিয়েছে । টাকা না দিতে চাইলে, রোগীকে আবার ফিরেত নিয়ে যাচ্ছিল । জোর করেই টাকা নিয়েছে ।
ডাক্তার বা নার্স ডাকলে ঠিকমত পাওয়া যায় কিনা প্রশ্নের জবাবে রবিউল ইসলাম বলেন, টিকিক করলে তখন দেখে আর দুইবার ডাক্তার দেখে । সকাল বেলা ১২ টার সময় আর রাতে । এর ভিতর কোন সমস্যা হলে সিস্টার আসে, ডাক্তার আসে না । বড় ডাক্তার খালি একবার আসে ।
ভেড়ামারা থেকে সেবা নিতে আসা রোগীর স্বজন মনিরুল ইসলাম জানান, সকালে রোগী নিয়ে আসছি । রোগীটা যন্ত্রনায় ছটফট করছিলো । আমার কাছে খুচরো টাকা ছিলো না । কাউন্টার থেকেও টাকা ভাঙ্গিয়ে দেয় নাই । অথচ টাকা ভাঙ্গিয়ে না আনা পর্যন্ত আমাকে টিকেট দেয়নি । টাকা ভাঙ্গিয়ে এনে টিকেট নেওয়ার পরও আমার সাথে অনেক দূঃব্যবহার করেছে । টিকেট ছুড়ে ফেলে দিয়েছে । টিকেট নেওয়া আধা ঘন্টা পরে আমার রোগীর চিকিৎসা শুরু করেছে । বারবার অনুরোধ করেলেও উনারা কোন কথা শোনেনি । উল্টা আমাদের বকাবাদ্য করছে ।

এদিকে গত সোমবার (২৭ মার্চ) বিকেল ৪ টার দিকে পারিবারিক কলহের জেরে গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করে কুষ্টিয়া শহরের চৌড়হাস ফুলতলা এলাকার মৃত মুসার ছেলে রাসেল (৩৫)। পরিবারের লোকজন বিকেল ৫ টা ২৫ শে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যায়।
সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। সেদিন রাত হয়ে যাওয়ায় লাশের ময়নাতদন্ত করা সম্ভব হয় না। ফলে লাশ নিয়ে ময়নাতদন্তের অপেক্ষায় পরিবার ও স্বজনদের রাত কাটাতে হয় মর্গের সামনেই।
সেই রাত পেরিয়ে পরদিন ঘড়ির কাঁটায় দুপুর ২ টা বাজলেও শোকার্ত পরিবার ও স্বজনদের অশ্রুসিক্ত অপেক্ষার অবসান হয়নি। বারংবার কর্তব্যরত চিকিৎসককে খবর দেওয়ার পরও তিনি মর্গে আসেননি। পরবর্তীতে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডাঃ হোসেন ইমাম এসে ওই মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন।
এই সমস্ত অনিয়মের বিষয়ে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডাঃ হোসেন ইমাম এর মুঠোফোনে ফোন দিলে তিনি রিসিভ না করার কারণে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি ।
সমস্ত অনিয়মের বিষয়ে জনাতে চাইলে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ রফিকুল ইসলাম রুমে গেলে তিনি ক্যামেরার সামনে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, আমি এখানে নতুন এসেছি । আমি আপনাদের কাছ থেকে অভিযোগ গুলো শুনলাম । আমাকে আপনার ৩ থেকে ৬ মাস সময় দিন । সব ঠিক হয়ে যাবে ।
