সংসারের অর্ধেক খরচ চলতো কুমারখালীতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত মনিরের টাকায় - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

সংসারের অর্ধেক খরচ চলতো কুমারখালীতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত মনিরের টাকায়

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৪

মিজানুর রহমান নয়ন ॥  আমি পরের বাড়ি কামলা দিই। ও (মনির) মসজিদে ইমামতি করে চার হাজার পেত। এক জায়গা টিউশনিও করত। যেদিন কাম থাকত না। সেদিন ওর কাছ থেকে টাকা নিতাম। আবার কখনও আমিও ওকে দিতাম। খুব কষ্ট করে এ পর্যন্ত এসেছিল। এখন সব শ্যাষ। সবকিছু পিছিয়ে ও এগিয়ে গেল। আমার কোনো অভিযোগ নেই। ওর কপাল এ পর্যন্তই লেখা ছিল।’ গত বৃহস্পতিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) আক্ষেপ করে কথা গুলো বলছিলেন নিহত ইবি শিক্ষার্থী মনির হোসেনের (২০) বাবা মো. বিল্লাল হোসাইন। বিকেল সাড়ে ৩ টার দিকে কুষ্টিয়ার কুমারখালী হলবাজার এলাকায় একটি ফার্মেসীতে বসে তার সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের।

এসময় তার চোখে মুখে গভীর হতাশার ছাপ ছিল। তিনি কুমারখালী পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের খয়েরচারা এলাকার বাসিন্দা। বিল্লাল হোসাইন বলেন, মনির খুব ভাল মানুষ ছিল। মাওলানা হতে চেয়েছিল। তবে আমি চেয়েছিলাম ও (মনির) পড়াশোনা করে একটি চাকুরি করবে। কষ্টের সংসারে হাল ধরবে। ছোট ছেলে বলত ভাইয়া একদিন চাকুরি করে তোমার পাঞ্জাবী কিনে দিবে।

জানা গেছে, মনির হোসেন কুমারখালী ফাজিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল ও আলিম শেষ করে ২০২২- ২০২৩ শিক্ষাবর্ষে কুষ্টিয়ার ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে ভর্তি হন। গত বুধবার দুপুরে কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী সড়কের কুমারখালীর কালুড় মোড় এলাকায় ড্রাম ট্রাকের সঙ্গে মাহেন্দ্র গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মনির ও শহিদুল ইসলাম নামের পুলিশের এক উপ পরিদর্শক নিহত হন। এছাড়াও এ দুর্ঘটনায় আহত হয়ে আরো ৭ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সেদিন মনির বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শেষে বাড়ি ফিরছিলেন। গত বৃহস্পতিবার সকালে তেবাড়িয়া সামাজিক কবর স্থানে মনদেহটি দাফন করা হয়েছে।

আরো জানা গেছে, মনির পড়াশোনার পাশাপাশি কুমারখালীর তেবাড়িয়া তিন গম্বুজ জামে মসজিদের ইমাম ছিলেন। তাঁর পরিবারে বাবা, মা, ছোট এক ভাই ও বোন রয়েছে। তিনি পড়াশোনার খরচ মিটিয়ে ইমামতি ও টিউশনির টাকা সংসারে দিতেন। দুপুরে সরেজমিন মনিরের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তাঁর বাবা বিল্লাল হোসেন বাড়িতে নেই। তিনি হাইওয়ে পুলিশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছেন। তিনি না থাকায় তাঁর বাড়ির ভিতরে প্রবেশের অনুমতি মেলেনি প্রতিবেদকের।

পরে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে কুমারখালীর হলবাজার এলাকায় তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত হয়। এসময় বিল্লাল হোসাইন বলেন, ১৬ শতাংশ জমির ওপর বসত বাড়িতে ছোট দুইখানা টিনশেড ঘর আছে। তাও কিছুদিন আগে করা হয়েছে। অল্প অল্প করে জমিয়ে যার অর্ধেক দিয়েছিল মনির। মাঠে কোনো জায়গা জমি নেই। মনির পরিবারের বড় সন্তান। দ্বিতীয় সন্তান ছিল মেয়ে। ওর বিয়ে হয়ে গেছে। তৃতীয় সন্তান ( মেয়ে) দশম শ্রেণিতে আর ছোট ছেলে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে।

দুর্ঘটনার বিষয়ে তিনি বলেন, আমার কোনো অভিযোগ নেই। চাওয়া পাওয়াও নেই। কপালে যা ছিল, তা ঘটেছে। তবে জুলুম করবোনা। কেউ ( ট্রাক মালিক) স্বেচ্ছায় কিছু দিলে তা গ্রহণ করব। খয়েরচারা গ্রামের বাসিন্দা ব্যবসায়ী শফিকুল আলম বলেন, এলাকায় সবচেয়ে ভাল ছেলে ছিল মনির। একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রও ছিল ও (মনির)। ওরা খুব কষ্ট করে বড় হচ্ছিল। এলাকার সবাই ওদের পছন্দ করতো। সহযোগীতা করতো। মনিরের মৃত্যুতে সবাই শোকাহত। কুষ্টিয়া হাইওয়ে পুলিশের ওসি আকুল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, এ সংক্রান্ত আইনী প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।