শপথ নিলেন এনসিপির নুসরাত তাবাসসুম - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

শপথ নিলেন এনসিপির নুসরাত তাবাসসুম

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: মে ৭, ২০২৬

ঢাকা অফিস ॥ শপথ নিয়েছেন সংরক্ষিত নারী আসনে নব-নির্বাচিত সংসদ-সদস্য নুসরাত তাবাসসুম জ্যোতি। গতকাল বুধবার (৬ মে) সংসদ সচিবালয়ের সচিব ব্যারিস্টার গোলাম সরওয়ার ভুঁইয়ার সঞ্চালনায় জাতীয় সংসদের স্পিকারের কার্যালয়ে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম) তাকে শপথ বাক্য পাঠ করান। সংসদ সচিবালয় থেকে জানানো হয়েছে, সংবিধানের অনুচ্ছেদ-১৪৮ এর তৃতীয় তফসিল ও জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি-৫ অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যকে শপথ পাঠ করান।

শপথ গ্রহণ শেষে নববির্বাচিত সংসদ সদস্য রীতি অনুযায়ী সংসদ সচিবের রুমে শপথ বইয়ে সই করেন। এসময় ডেপুটি স্পিকার, বিরোধী দলের চিফ হুইপ, সংসদ সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে, গত ২১ এপ্রিল বিকেল ৪টা পর্যন্ত এই নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমার শেষ সময় ছিল। কিন্তু ৪টা ১৯ মিনিটে নুসরাত তাবাসসুম মনোনয়নপত্র জমা দেন। বিলম্ব দেখিয়ে ইসি তার মনোনয়নপত্র গ্রহণ করেনি।

পরে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন তিনি। আদালত ইসিকে নুসরাতের মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও আইনানুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। পরে ইসি তার মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে বৈধ ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করে।

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার বাগোয়ান গ্রাম থেকে উঠে এসে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য হয়েছেন নুসরাত তাবাসসুম। মাত্র ২৫ বছর বয়সে তিনি দেশের সংসদীয় ইতিহাসে অন্যতম সর্বকনিষ্ঠ আইনপ্রণেতা হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন। তার এই অর্জনে আনন্দ ও গর্বে ভাসছে পুরো এলাকা। স্থানীয়রা জানান, শিক্ষক পরিবারে জন্ম নেওয়া নুসরাতের শৈশব কেটেছে গ্রামীণ পরিবেশে। বাগোয়ান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে তার শিক্ষাজীবনের শুরু। এরপর বাগোয়ান কে সি ভি এন মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং দৌলতপুরের ড. ফজলুল হক গার্লস ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন।

পড়াশোনার পাশাপাশি সহপাঠ কার্যক্রমেও ছিলেন সক্রিয়—বিতর্ক, আবৃত্তি ও নাটকে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই নুসরাত ছিলেন মেধাবী ও আত্মবিশ্বাসী। প্রতিবেশীরা বলেন, নুসরাতের বাবা-মা দুজনই শিক্ষক এবং অত্যন্ত সৎ মানুষ। সেই পরিবার থেকেই এমন সাহসী একজন মেয়ে উঠে এসেছে, যা তাদের জন্য গর্বের।

বাগোয়ান গ্রামের বাসিন্দা শামিম রেজা বলেন, নুসরাত তাবাসসুম আমাদের এলাকার গর্ব। আমরা আশা করি, তিনি সাধারণ মানুষের পাশে থেকে এলাকার উন্নয়নে কাজ করবেন। নুসরাতের নানি আছিয়া বেগম পারুল বলেন, আমার নাতনি এমপি হয়েছে, এতে আমরা খুব খুশি। আমি দোয়া করি, সে যেন তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারে। নানা আব্দুল জলিলও একই অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, ছোটবেলা থেকেই সে প্রতিবাদী ছিল। আমি চাই, সে দেশবাসীর কল্যাণে কাজ করুক।

বাগোয়ান কে সি ভি এন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মাসুদ রানা বলেন, নুসরাত আমাদের স্কুলের অন্যতম মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল। ছাত্রজীবন থেকেই তার মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলি এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রবল ইচ্ছা দেখা গেছে। জানা গেছে, ২০১৮ সালে ঢাকায় যাওয়ার পর নুসরাতের জীবনে বড় পরিবর্তন আসে। নিরাপদ সড়ক আন্দোলন থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বিভিন্ন ইস্যুতে সক্রিয় অংশগ্রহণ তাকে রাজনৈতিকভাবে দৃঢ় করে তোলে।

বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্বের ভূমিকায় সামনে আসেন তিনি। নারী শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ব্যাপক আলোচনায় আসে। আন্দোলনের সময় নুসরাতের আটক ও নির্যাতনের খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়। তবে পরবর্তীতে মুক্তি পেয়ে আবার সক্রিয় রাজনীতিতে ফেরায় স্বস্তি ফিরে আসে পরিবার ও এলাকাবাসীর মধ্যে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে নুসরাত নেতৃত্বের পর্যায়ে উঠে আসেন।

জাতীয় নারী শক্তির মাধ্যমে নারীদের সংগঠিত করতেও ভূমিকা রাখেন তিনি। বাগোয়ান গ্রামের বাসিন্দা মিজান্নুর রহমান বলেন, নুসরাত মেয়েদের নিয়ে আন্দোলনের সামনে দাঁড়িয়েছেন। এখন আমাদের গ্রামের মেয়েরা তাকে অনুসরণ করে। তিনি সব সময় মানুষের উপকার করার চেষ্টা করেছেন। সর্বশেষ সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন নিয়ে জটিলতা তৈরি হলেও আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে তা কাটিয়ে ওঠেন। শেষ পর্যন্ত প্রার্থিতা বৈধ হয় এবং সব প্রক্রিয়া শেষে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন।

এমপি নুসরাত তাবাসসুমের কাছে এলাকাবাসীর প্রত্যাশাও এখন অনেক বেশি। গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা শামসুল রহমান বলেন, ‘সে এখন দেশের মানুষকে প্রতিনিধিত্ব করছে। আমরা চাই, সে যেন গ্রামের মানুষের কথাও ভুলে না যায়।’ তরুণদের মাঝেও রয়েছে আশাবাদ। তাদের মতে, নুসরাতের এই সাফল্য গ্রাম থেকে উঠে আসা নতুন প্রজন্মকে রাজনীতি ও নেতৃত্বে এগিয়ে আসতে অনুপ্রাণিত করবে।