লালন ভক্ত চায়না বেগমের ঘরবাড়ি ভাংচুর-উচ্ছেদের প্রতিবাদে কুমারখালীতে মানববন্ধন - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

লালন ভক্ত চায়না বেগমের ঘরবাড়ি ভাংচুর-উচ্ছেদের প্রতিবাদে কুমারখালীতে মানববন্ধন

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: জুলাই ৩, ২০২৪

কুমারখালী প্রতিনিধি ॥ ্যেখানে আমার স্বামীর মাজার আছে। আমি সেখানেই থাকব। আমাকে যদি  স্বামীর কবর থেকে সাপে খাই, বাঘে খাই। তবুও আমি ওই জায়গায় থাকব। মাটির সাথে মিশে যাব। আমাকে কবর দিতে কাউকে আসা লাগবে না। তবু কোথাও যাবনা। গতকাল মঙ্গলবার (২ জুলাই) কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে মানববন্ধনে দাঁড়িয়ে কথা গুলো বলছিলেন ৮০ বছর বয়সি লালন ভক্ত চায়না বেগম। গতকাল দুপুরে উপজেলার ছেঁউরিয়ার বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের মাজারের প্রধান প্রবেশ পথের সামনে মানববন্ধনের আয়োজন করেন লালন ভক্ত অনুসারীরা। তারা ঘটনার সুষ্ঠ তদন্ত করে দোষীদের শাস্তি এবং পুনরায় একই স্থানে চায়নার ঘর নির্মাণের দাবি জানান। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধনে দাঁড়িয়ে চায়না বেগম আরো বলেন, সকাল হলে আমি ভিক্ষা করতে যাব। সারাদিন বেড়াব। দিন শেষে স্বামীর ভিটায় রাঁধে (রান্না) খাব। তবু স্বামীর ভিটা ছেড়ে কোথাও যাবনা। আমার ঘর যেভাবে ছিল। আপনারা সেভাবেই করে দেন। লালন ভক্ত চায়না বেগম কুষ্টিয়া সদর উপজেলার টাকিমারা এলাকার মৃত গাজির উদ্দিনের স্ত্রী। গত ২৬ জুন সকালে স্থানীয় মেম্বর ও মাতব্বররা তার ঘর ভাঙচুর করে বলে তিনি অভিযোগ করেন। মানববন্ধনে তার বোন ফকির আছিয়া খাতুন বলেন, আমার বোন যেখানে যেভাবে ছিল। আপনারা সেখানে সেভাবেই বসবাসের ব্যবস্থা করে দেন। এবং যারা ঘর ভেঙেছে তাদের আইনগত শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এক লালন ভক্তের ঘরবাড়ি ভাংচুর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন ফকির আলেক শাই। তিনি বলেন, দাঁড়ি রাখলে আর টুপি পড়লেই মুসলমান হওয়া যায়না। মানুষ হওয়া যায়না। মানুষ হতে হলে আগে মনুষ্যত্বের অধিকারী হতে হবে। তিনি ঘটনার সুষ্ঠ বিচারের দাবি জানান। জানা গেছে, ৮০ বছর বয়সি চায়না বেগমের ইচ্ছে ছিল লালন অনুসারী মৃত স্বামীর কবরে মাথা ঠেকিয়ে বাকিটা জীবন কাটিয়ে দিবেন। ভিটেমাটিতে প্রতিদিন জ্বালাবেন সন্ধ্যা প্রদীপ। নিজের লালন অনুসারী হওয়ায় স্বামীর কবরের পাশেই নিজ জমিতে তুলেছিলেন টিনের চালার ঘর। কিন্তু বাদ সাধলেন এলাকার মেম্বার ও মাতবররা। ভবিষ্যতে ওই স্থানে মাজার, মাদক সেবন ও কিশোর গ্যাংয়ের আড্ডাস্থল হতে পারে এমন অভিযোগ তুলে ২৬ জুন সকালে স্থানীয় আরো কয়েকজনকে নিয়ে বৃদ্ধার ঘরটি ভেঙে ফেলেন। দিশেহারা বৃদ্ধা প্রতিবাদ করতে গেলে উল্টো লাঞ্চিত হন। কোন কুল কিনারা করতে না পেরে চায়না বেগম অভিযোগ করেন কুষ্টিয়া মডেল থানায়। তবে শেষ সংবাদ পাওয়া পর্যন্ত গত শুক্রবার (২৮ জুন) বিকেলে থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত থানায় চলা উভয়পক্ষের বৈঠকে চায়না বেগমকে অন্যত্রে একটি নতুন ঘর তৈরি করে দেওয়া সত্ত্বে অভিযোগ মিমাংসা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে ইচ্ছের বিরুদ্ধে মিমাংসা করতে বাধ্য করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন চায়না বেগম। এলাকার বিভিন্ন মানুষের কাছে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চায়না বেগম ও তার স্বামী মৃত গাজির উদ্দিন দুইজনেই ছিলেন বাউল ফকির লালন সাঁইজির অনুসারী। মৃত্যুর পর গাজির উদ্দিনকে মাঠের মধ্যে নিজ জমিতে কবর দেওয়া হয়। কেন স্বামীর কবরের পাশে ঘর বানালেন চায়না বেগম: চায়না বেগমের সাথে কথা হলে তিনি জানিয়েছিলেন তার স্বামী মৃত্যুর আগে বলে গেছেন, কোথাও জায়গা নাহলে তুমি আমার কবরের পাশেই থাকবা। প্রতিবছর বাতাসার সিন্নি হলেও করবা। তার কথা রাখতেই ঘরখানা তৈয়ার করি। এলাকাবাসী তাকে কিছু জানিয়েছিল জানতে চাইলে তিনি জানিয়েছিলেন আমাকে না জানিয়েই সব ভেঙে ফেলেছে। ঘটনা জানতে পেরে প্রতিবাদ করে হামলার শিকারও হয়েছেন। কি ঘটেছিল সেদিন-স্থানীয়রা জানান, ঘটনার দিন ভোরে মুসল্লিরা স্থানীয় মসজিদে ফজরের নামাজ আদায় করতে গেলে নামাজ শেষে ইমাম সাহেব মাজারকে ইসলাম ধর্মের পরিপন্থী জানিয়ে আলোচনা করেন। এলাকার সাবেক ইউপি মেম্বার এনামুল হক, মাতবর মোশারফ হোসেনসহ বেশ কয়েকজনের ইন্ধনে এই আলোচনা হয়। এরপরেই সাবেক ইউপি সদস্যর নেতৃত্বে এলাকার কয়েকজন লালন অনুসারী ওই বৃদ্ধার ঘর ভাঙচুর করে। থানায় দায়ের করা অভিযোগ কি ছিল-চায়না বেগম এলাকার সাবেক ইউপি মেম্বার এনামুল হক, মাতবর মোশারফ

হোসেন, আনার মন্ডল ও সাইদুল হাজির নাম উল্লেখ করে তাঁদের বিরুদ্ধে বাড়িঘর ভাঙচুর করে অন্তত লক্ষাধিক টাকার ক্ষতিসাধনের অভিযোগ আনেন তিনি। থানায় উভয়পক্ষের উপস্থিতিতে মিমাংসা কি হয়েছিল-ঘটনার তদন্তকারী কর্মকর্তা মডেল থানার এস আই খায়রুজ্জামান জানিয়েছেন, গত শুক্রবার (২৮ জুন) বিকেল চারটায় কুষ্টিয়া মডেল থানায় উভয়পক্ষকে ডেকে বৈঠকে বসেন। সেখানে চায়না বেগম ও বোন জামাই সাধু শাহাবুদ্দিন সাবুসহ স্থানীয় কাউন্সিলর মাতব্বর ও অভিযুক্তরা উপস্থিত ছিলেন। চায়না বেগমের অনুমতি সাপেক্ষে এবং সকলের সম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয়, ওই জমির পাশেই চায়না বেগমের ছেলে মজিবুর রহমানের ভিটা রয়েছে। সেই ভিটায় আলাদা করে চায়না বেগমের জন্য নতুন করে বসতভিটা করে দেয়া হবে। এবং সেই বসতভিটা নির্মাণ খরচ বহন করবে অভিযুক্ত সকলেই। বৈঠকে থাকা পৌর কাউন্সিলর এজাজ আহমেদ জানিয়েছেন, ওসির উপস্থিতিতে

সকলে একমত পোষণ করেন যে, যেখানে চায়না বেগমের ঘর ছিল সেই স্থান লোকশুন্য, মাদকের আস্তানা এবং কিশোরগ্যাং-এর আনাগোনা। তাই সেখানে বৃদ্ধার একলা থাকা অনিরাপদ এবং ঝুঁকিপূর্ণ। অভিযুক্তদের বক্তব্য-অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে সাবেক ইউপি সদস্য এনামুল হক বলেন, ওই বৃদ্ধা বাড়ি করেছেন একটি মাঠের মধ্যে ফাঁকা জায়গায়। সেখানে যাওয়ার পথ নেই, তাকে দেখারও কেউ নেই। এছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের আস্তানা হওয়ার আশঙ্কায় তার ঘরটি এলাকাবাসী ভেঙে দিয়েছে ।