মৌখিক অনুমতিতে তড়িঘড়ি করে চলছে কলেজ মোড়ের ২১ দোকানের নির্মাণকাজ - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

মৌখিক অনুমতিতে তড়িঘড়ি করে চলছে কলেজ মোড়ের ২১ দোকানের নির্মাণকাজ

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: নভেম্বর ১০, ২০২৫

৩ কোটি টাকা ঘুষ লেনদেনের গুঞ্জন

 

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া শহরের কলেজ মোড় এলাকায় উচ্ছেদ হওয়া সরকারি জায়গায় পুনরায় ২১টি দোকান নির্মাণের ঘটনাকে ঘিরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কুষ্টিয়া পৌরসভার তথাকথিত “মৌখিক অনুমতি” নিয়ে দখলদাররা সেখানে আবারও দোকান নির্মাণ শুরু করেছেন। এ অনুমতির পেছনে প্রায় ৩ কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন হয়েছে বলে গুঞ্জন উঠেছে। গত ২২ অক্টোবর জেলা প্রশাসনের নির্দেশে কুষ্টিয়া পৌরসভা কলেজ মোড় এলাকায় সড়ক দখল করে গড়ে ওঠা ২১টি অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করে।

অভিযানে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নেতৃত্ব দেন। উচ্ছেদ শেষে প্রায় ১০-১৫ ফুট জায়গা দখলমুক্ত হয় বলে পৌরসভার লাইসেন্স শাখা থেকে জানা যায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, মাত্র সাত দিন পরই উচ্ছেদকৃত স্থানে ফের দোকান নির্মাণ শুরু হয়। সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের চাপের মুখে কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ হলেও, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আবার শুরু হয় নির্মাণকাজ। কুষ্টিয়া পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী ওয়াহিদুর রহমান বলেন, আমার জানা মতে নতুন করে কোনো মার্কেট নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়নি। এটি লাইসেন্স শাখা বলতে পারবে। আমি বর্তমানে প্রশিক্ষণের জন্য ঢাকায় অবস্থান করছি।

বিষয়টি সম্পূর্ণ প্রশাসক স্যার দেখছেন। তার কাছেই বিস্তারিত জানা যাবে। পৌরসভার লাইসেন্স শাখার এক কর্মকর্তা জানান, আমরা দোকানদারদের জানিয়ে দিয়েছি, যদি তারা পুনরায় অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করে, তা গুড়িয়ে দেওয়া হবে। তবে পরবর্তীতে কী ঘটেছে, তা আমার জানা নেই। তিনি আরও বলেন, শুনেছি দোকান মালিকরা জেলা প্রশাসক ও পৌর প্রশাসকের সাথে কথা বলেছেন। স্যারদের সঙ্গে কথা বললেই বিস্তারিত জানা যাবে।

দুর্নীতিবিরোধী ছাত্র-জনতার অন্যতম সমন্বয়কারী আলী মুজাহিদ বলেন, আমরা একাধিকবার জেলা প্রশাসকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। উচ্ছেদ করা দোকানগুলো কীভাবে আবার নির্মাণ হচ্ছে, সেটিই এখন প্রশ্ন। ডিসি স্যার নিজে পৌর প্রশাসককে কাজ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন, কিন্তু নির্মাণ বন্ধ হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, দোকান মালিকদের কাছ থেকে প্রতি দোকানে ১০-১২ লাখ টাকা করে ঘুষ নেওয়া হচ্ছে। সরকারি জায়গায় বরাদ্দের নামে ব্যক্তিগতভাবে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। এটি মূলত সরকারি সম্পত্তি বেচাকেনার মতোই।

এই অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে গত ২ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে মানববন্ধন করেছে দুটি সামাজিক সংগঠন— কুষ্টিয়া পৌর নাগরিক অধিকার পরিষদ ও নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) কুষ্টিয়া জেলা শাখা। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, মাত্র ৯ দিনের ব্যবধানে ফের দোকান নির্মাণ শুরু হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। সরকারি জায়গা অবৈধভাবে বরাদ্দের নামে ৩ কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বক্তারা আরও বলেন, জুলাই বিপ্লবের পর জনপ্রতিনিধি অপসারণের ফলে তিনজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পর্যায়ক্রমে পৌর প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন।

এ সময়ে পৌরসভায় দুর্নীতি ও অনিয়ম বেড়েছে। সিভিল সার্জন কার্যালয়ে প্রশ্নফাঁস কাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই এখন আবার অবৈধ দোকান বরাদ্দ কেলেঙ্কারি চলছে। সেসময় কুষ্টিয়া পৌর নাগরিক অধিকার পরিষদের আহ্বায়ক ও জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শামিম উল হাসান আপু বলেন, কুষ্টিয়াবাসী দীর্ঘদিন ধরে যানজটে অতিষ্ঠ। রাস্তাঘাট প্রশস্ত করার জন্য উচ্ছেদ অভিযানকে আমরা স্বাগত জানিয়েছিলাম। কিন্তু যদি আবার দোকান নির্মাণই করা হয়, তবে উচ্ছেদের মানেটা কী? এটা জনস্বার্থ নয়, অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার কৌশল।

তিনি আরও বলেন, যদি দোকান নির্মাণ করতেই হয়, তবে নাগরিকদের মতামত নিয়ে পরিকল্পিতভাবে করুন। রাস্তা প্রশস্ত করার পরই উন্নয়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, পূর্বের দোকানদাররা নিজেরাই নির্মাণ তদারকি করছেন।

এক দখলদার দোকানদার শহীদুর রহমান জানান, পৌরসভা যখন আমাদের বরাদ্দ বাতিল করে তখন আমরা ডিসি মহোদয়ের সাথে দেখা করি। তার কাছে বারবার গিয়েছি। তিনি বলেছিলেন, আপনারা আপাতত সরে যান, তারপর দেখি অন্য কোন জায়গায় আপনাদের দেওয়া যায় কিনা। ওনার আশ্বাসের প্রেক্ষিতে আমরা নিজ দায়িত্বে মালামাল সরিয়ে নিয়ে যাই। এরপর পৌরসভার এসে ভেঙে দিয়ে যায়। তারপর আমরা আবার ডিসি স্যারের সঙ্গে দেখা করলে তিনি বলেন, আমি পৌর প্রশাসককে বলেছি আপনাদের একটা একোমোডেশনের ব্যবস্থা করবে। তিনি পৌর প্রশাসকের সাথে কথা বলে পেছন দিয়ে আমাদের বসার জন্য মৌখিক অনুমতি দিয়েছে। তাই আমরা বসেছি। তবে বসা আর পুনরায় স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ প্রসঙ্গে উপস্থিত কেউই সঠিক উত্তর দিতে পারেননি।

স্থানীয়রা বলেন, আমরা প্রথমে উচ্ছেদ দেখে খুশি হয়েছিলাম। রাস্তা প্রশস্ত হবে ভেবে প্রশংসা করেছিলাম। কিন্তু এক সপ্তাহ না যেতেই আবার দোকান গড়ে ওঠায় আমরা হতাশ। এখন বুঝতে পারছি, উচ্ছেদটা ছিল লোক দেখানো, টাকা তোলার জন্য। কুষ্টিয়া কলেজ মোড়ে সরকারি জায়গায় পুনরায় দোকান নির্মাণ এবং এ নিয়ে ৩ কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্যের গুঞ্জন স্থানীয় প্রশাসনের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের নীরবতা ও পরস্পর দোষারোপের ফলে দুর্নীতির অভিযোগ আরও জোরালো হচ্ছে। সচেতন নাগরিকরা বলছেন— এই ঘটনার স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে কুষ্টিয়া শহর অচিরেই দুর্নীতি ও বিশৃঙ্খলার নগরীতে পরিণত হবে।

প্রসঙ্গে পৌর প্রশাসক মিজানুর রহমান বলেন, জেলা প্রশাসন ও পৌরসভা ওখানে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে ১০ ফিট রাস্তা উদ্ধার করেছে। এরপর যা ঘটেছে সেটা কোনটাই অফিসিয়াল না। ১৯৮৪/৮৫ সালের দিকে সম্ভবত ওদেরকে পৌরসভা থেকে একটা বন্দোবস্ত দেয়া হয়েছিল। তারা এটাকে তাদের অধিকার হিসেবে তুলনা করে। “একটা জায়গায় আমরা ৪০ বছর ধরে বাস করছি, এটার উপর আমাদের পরিবার নির্ভরশীল, আমরা পথে বসে যাবো, আমরা কোথায় যাবো?”-এরকম বিষয় নিয়ে তারা সম্ভবত জেলা প্রশাসক স্যারের কাছে একটা স্মারকলিপি দিয়েছিল। তার প্রেক্ষিতে স্যার তখন তাদেরকে বলেছিল, আপনারা রাস্তার অংশটুকু ছেড়ে পিছনে চলে আসবেন। এইটুকু হচ্ছে কথা।

তিনি আরো বলেন-এরপর মৌখিক অনুমতি, অফিসিয়াল ব্যাপার, বন্দোবস্ত দেওয়া, বরাদ্দ দেওয়া এইগুলো আসলে বানিয়ে বলা অতিরিক্ত কথাবার্তা। যারা করছে তারা নিজেদের উদ্যোগে করছে। তারা মনে করছে, বহুদিন ধরে তারা বন্দোবস্ত নিয়ে ছিল এবং সেই বন্দোবস্তুরই কন্টিনিউয়েশন হিসেবে তারা ওটাকে কল্পনা করছে। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল রাস্তা উদ্ধার করা, সেটাই করা হয়েছে। পৌরসভা থেকে কোন বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। একই বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সদ্য বদলির আদেশপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক আবু হাসনাত মোহাম্মদ আরেফীন ফোন রিসিভ করেননি।