ভ্যান ছেড়ে স্কুলে ফিরল ছোট্ট জুনায়েদ - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

ভ্যান ছেড়ে স্কুলে ফিরল ছোট্ট জুনায়েদ

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: মে ১৪, ২০২৬

দৌলতপুর প্রতিনিধি ॥ রোদ-বৃষ্টিতে ভ্যান চালানো ছেড়ে আবারও বিদ্যালয়ের আঙিনায় ফিরেছে ১০ বছর বয়সী জুনায়েদ। শুধু সে-ই নয়, তার অন্য দুই ভাইবোনের পড়াশোনার দায়িত্ব নিতেও এগিয়ে এসেছেন অনেকে। যে বয়সে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, জীবনের নির্মম বাস্তবতা আর অভাবের তাড়নায় সেই কচি হাতে উঠেছিল ভ্যানের হাতল। এ নিয়ে গত ৬ মে একটি সংবাদ প্রচারিত হয়।

এরপর জুনায়েদের পাশে দাঁড়াতে এগিয়ে আসেন অনেকেই। কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার আদাবাড়িয়া ইউনিয়নের গরুড়া গ্রামের বাসিন্দা জুনায়েদের বাবা হাবিবুর রহমান হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বিনা চিকিৎসায় গত ঈদুল ফিতরের দিন মারা যান। এর আগে মা রোজিনা খাতুন স্বামীর চিকিৎসার জমানো টাকা নিয়ে অন্যত্র চলে যান। পরিবারে ছিল জুনায়েদ আর তার দুই ভাইবোন এবং বৃদ্ধ দাদা-দাদি। নিঃস্ব পরিবারটি রক্ষায় তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র জুনায়েদ বাবার ভ্যান নিয়ে রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়।

তার এই জীবনযুদ্ধ নাড়া দিয়েছিল অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে। সংবাদটি প্রচারের পরপরই প্রবাসীসহ অনেকে জুনায়েদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করে সরাসরি আর্থিক সহায়তা পাঠিয়েছেন। গত সোমবার জুনায়েদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তাকে আর ভ্যান নিয়ে রাস্তায় বের হতে হচ্ছে না। ঘরে অবহেলায় পড়ে থাকা নতুন শ্রেণির বইগুলো এখন তার পড়ার টেবিলে। তার ১২ বছর বয়সী বড় ভাই এবং ছোট বোনের পড়াশোনার দায়িত্বও নিতে চেয়েছেন কয়েকজন দানশীল ব্যক্তি।

প্রাপ্ত আর্থিক অনুদানে এখন তাদের অন্ন ও দাদা-দাদির ওষুধের চাহিদা পূরণ হচ্ছে। নতুন পোশাক পেয়েছে জুনায়েদ ও তার ভাই-বোন। তিন ভাইবোনই এখন নিয়মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করছে।  জুনায়েদের দাদি সপা জান নেছা আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘ছেলেটা মারা যাওয়ার পর আমরা চোখে অন্ধকার দেখছিলাম। ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে কোথায় যাব, কী খাব তার কোনো দিশা ছিল না। জুনায়েদ যখন ভ্যান নিয়ে বের হতো, বুকটা ফেটে যেত। এখন অনেক মানুষ আমাদের সাহায্য করছেন।

তাদের সাহায্যে এখন আমার নাতি-নাতনিরা আবার স্কুলে যেতে পারছে। আমরা এখন দুই মুঠো খেতে পারছি।’ চোখেমুখে আগামীর স্বপ্ন নিয়ে জুনায়েদ জানায়, সে ভাবেনি আবার স্কুলে যেতে পারবে। ভ্যান চালাতে খুব কষ্ট হতো, কিন্তু এ ছাড়া তার উপায়ও ছিল না। এখন অনেক মানুষ সাহায্য করায় সে বড় হয়ে মানুষের মতো মানুষ হতে চায়। প্রতিবেশী তোজাম্মেল হক বলেন, জুনায়েদদের পরিবারের ওপর দিয়ে যে ঝড় বয়ে গেছে, তা সহ্য করা কঠিন। ছোট বাচ্চাটা যখন রোদ-বৃষ্টির মধ্যে বড়দের মতো ভ্যান টেনে নিয়ে যেত, আমাদের দেখে খুব মায়া লাগত। 

জুনায়েদের ক্লাসে ফেরা নিয়ে প্রাগপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহাবুদ্দিন বলেন, জুনায়েদ অত্যন্ত মেধাবী ও শান্ত স্বভাবের ছেলে। পারিবারিক বিপর্যয়ের পর সে হঠাৎ করেই স্কুলে আসা বন্ধ করে দেয়। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, পেটের তাগিদে তাকে ভ্যান চালাতে হচ্ছে। একজন ছাত্রের এই অসহায়ত্ব আমাদের খুব ব্যথিত করেছিল। বিভিন্ন মহলের সহায়তায় সে আবার ক্লাসে ফিরেছে, শিক্ষক হিসেবে এটি আমার জন্য স্বস্তির ও আনন্দের। ইউএনও অনিন্দ্য গুহ বলেন, জুনায়েদ ও তার ভাইবোনের পড়াশোনা যাতে আর বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে আমরা নিয়মিত তদারক করছি। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে।