ভেড়ামারায় আইন-শৃঙ্খলার অবনতি - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

ভেড়ামারায় আইন-শৃঙ্খলার অবনতি

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: মার্চ ১৫, ২০২৬

 ১২ দিনে তিন দফা গুলিবর্ষণ

 

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলাজুড়ে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক গুলিবর্ষণ, বোমা নিক্ষেপ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। মাত্র ১২ দিনের ব্যবধানে তিন দফা সশস্ত্র সহিংসতার ঘটনায় কয়েকজন আহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় উপজেলার সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও সচেতন মহল।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ বুধবার (১১ মার্চ) সন্ধ্যায় ভেড়ামারা উপজেলার দক্ষিণ রেলগেট এলাকায় ঈদ শুভেচ্ছার ব্যানার টানানোকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এ সময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে তিনজন আহত হন। আহতরা হলেন, ভেড়ামারা পৌর ছাত্রদলের সদস্য চঞ্চল হোসেন, পৌর যুবদল সদস্য জীবন হোসেন এবং ছাত্রদল সদস্য কাইছার আহমেদ। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে ভেড়ামারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। পরে চঞ্চল হোসেনের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে রেফার করা হয়।

এর আগে গত ৮ মার্চ রাতে ভেড়ামারা পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম ডাবলুর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অফিস লক্ষ্য করে দুর্বৃত্তরা হাতবোমা নিক্ষেপ ও এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করে। এতে পাশের একটি চায়ের দোকানের মালিক শুকুর আলী (৫৫) গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাত আনুমানিক ৯টার দিকে হেলমেট ও মুখ ঢাকা অবস্থায় চারজন অজ্ঞাত ব্যক্তি মোটরসাইকেলে করে উত্তর দিক থেকে এসে প্রথমে একটি হাতবোমা নিক্ষেপ করে। পরে পিস্তল ও শর্টগান দিয়ে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ রাউন্ড গুলি ছুড়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে তারা।

তার আগে গত ১ মার্চ দিবাগত রাত ২টা ২০ মিনিটের দিকে বাহিরচর ইউনিয়ন, ভেড়ামারা উপজেলার পুরাতন ফেরিঘাট হার্ডিং ব্রিজসংলগ্ন পদ্মা নদীতে অবৈধভাবে ফিলিং বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় প্রায় ২০ থেকে ২৫ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়। পাশাপাশি দুটি অফিসে অগ্নিসংযোগ করা হয় এবং একটি ড্রাম ট্রাক ভাঙচুর করা হয়। পরপর কয়েকটি সহিংস ঘটনার কারণে ভেড়ামারায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী মোঃ সাজ্জাদ আহমেদ বলেন, ভেড়ামারায় গত কয়েকদিন ধরে যে ঘটনা ঘটছে, তা আমাদের মতো সাধারণ ব্যবসায়ীদের জন্য খুবই উদ্বেগজনক। রাত হলেই আমরা আতঙ্কে থাকি। কখন কোথায় গুলি বা বোমার শব্দ শুনতে হবে। ব্যবসা করতে এসে যদি জীবন নিয়ে ভয় পেতে হয়, তাহলে পরিস্থিতি যে ভালো নয়, তা বলাই বাহুল্য। স্থানীয় যুবক মোহাম্মদ শাফিন রহমান বলেন, ভেড়ামারা সবসময় শান্তিপূর্ণ একটি উপজেলা হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের এসব সহিংস ঘটনা সেই পরিবেশকে নষ্ট করছে।

রাজনৈতিক মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু তার জন্য গুলি বা বোমার ব্যবহার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। স্থানীয় প্রবীণ নাগরিক জামান মন্ডল বলেন, আগে ভেড়ামারায় এ ধরনের ঘটনা খুব কম ঘটতো। এখন একের পর এক গুলিবর্ষণ, বোমা হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা আমাদের খুব চিন্তিত করছে। রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব যাই থাকুক, তা আইনের মাধ্যমেই সমাধান হওয়া উচিত।

এ বিষয়ে ভেড়ামারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জাহিদুর রহমান বলেন, গত ৮ মার্চ রেললাইনের সংলগ্ন এলাকায় যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে, সে বিষয়ে থানায় একটি মামলা নেওয়া হয়েছে। তবে গত ১ মার্চ বাহিরচর ইউনিয়নের পুরাতন ফেরিঘাট এলাকায় গোলাগুলির ঘটনার বিষয়ে এখন পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। এদিকে ভেড়ামারা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম জানান, প্রথম দিনের ঘটনার দিনই দুইজনকে আটক করা হয়েছে।

পরবর্তীতে যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিদিনই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সম্ভাব্য যাদের নাম বিভিন্নভাবে সামনে এসেছে, তাদের নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে। পাশাপাশি যৌথ বাহিনীকে বিষয়টি জানানো হয়েছে এবং অস্ত্র উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন, পিপিএম (বার) বলেন, গত বারো দিনে গুলিবর্ষণের মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি।

মোটরসাইকেল সাইড দেওয়া বা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে লাঠিসোটা দিয়ে মারামারির মতো কিছু ঘটনা ঘটেছে—এমন তথ্য পুলিশের কাছে রয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, ধারাবাহিক এসব সহিংস ঘটনার দ্রুত ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা না হলে ভেড়ামারার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। এজন্য এলাকাবাসী দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন।