বিশেষ প্রতিনিধি ॥ বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কুষ্টিয়া কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী পদে প্রায় তিন বছর ধরে বহাল রয়েছেন ফ্যাসিস্টের দোসর রাশিদুর রহমান। তার বিরুদ্ধে কমিশন বাণিজ্য, প্রশাসনিক অনিয়ম, চরমপন্থীদের সঙ্গে সখ্যতা এবং নানামুখী দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বদলির গুঞ্জন একাধিকবার ছড়ালেও এখনো বহাল তবিয়তেই দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। সূত্র জানায়, ২০২৩ সালে কুষ্টিয়ায় নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদায়ন পান রাশিদুর রহমান। এর আগে ২০২১-২২ সালে তিনি সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডে এসডি হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ শাসনামলে ২০১৩ সালে তার নিয়োগ হয় এবং তার পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাবেই গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন। তার বাড়ি সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলায়। তার বাবা স্থানীয় আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং বড় ভাই ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি বলে জানা গেছে। সরকার পরিবর্তনের পর তাকে প্রত্যাহারের আলোচনা শুরু হলেও কার্যত কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। বোর্ডের একাধিক সূত্র দাবি করেছে, চলমান হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই কর্মস্থল ছাড়তে নারাজ তিনি।
অভিযোগ আছে, উর্ধ্বতন মহলকে ‘ম্যানেজ’ করতে বিভিন্ন সময় উপঢৌকন প্রদান করে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করছেন। অভিযোগ উঠেছে, মাটির কাজ থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরনের প্রকল্পেই ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের ভাষ্য “কমিশন ছাড়া কোনো ফাইল নড়ে না।” এতে প্রকল্প ব্যয় বাড়ছে এবং সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে বলে অভিযোগ। অধীনস্ত কর্মকর্তাদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এপিআর) দীর্ঘদিন আটকে রেখে মানসিক চাপ সৃষ্টি করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। কর্মচারীদের সার্ভিস বুক হালনাগাদ, প্রাপ্য বিল, এমনকি জুতা ও পোশাকের বিল নিয়মিত পরিশোধ না করার অভিযোগ করেছেন একাধিক কর্মচারী।
আউটসোর্সিং কর্মীদের বেতনও প্রায়শই বিলম্বিত হয় বলে জানা গেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, নির্বাহী প্রকৌশলীর পরোক্ষ মদদে জিকের আবাসিক কম্পাউন্ডে মাদক ব্যবসা ও অসামাজিক কার্যকলাপ চলছে। ‘বেরা’ নামের এক ব্যক্তিকে দিয়ে এসব কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। অফিস সহায়ক আব্দুল্লাহকে ঘিরে রয়েছে নানা আলোচনা। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, আব্দুল্লাহর নির্দেশ অমান্য করলে নানা হয়রানির শিকার হতে হয়। তাকে অনেকেই “অলিখিত নির্বাহী প্রকৌশলী” বলে আখ্যা দেন। আব্দুল্লাহই নাকি প্রকৌশলীর নানা আর্থিক লেনদেন ও অনিয়মের অন্যতম মধ্যস্থতাকারী।
রাশিদুর রহমানের বিরুদ্ধে চরমপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের অভিযোগও উঠেছে। নদীপথের নিয়ন্ত্রণ অলিখিতভাবে তাদের হাতে তুলে দেওয়া, বড় কাজ পাইয়ে দেওয়ার মাধ্যমে কমিশন গ্রহণ এবং গড়াই নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ আছে, সপ্তাহের অর্ধেক সময় তিনি ঢাকায় অবস্থান করেন। পরিবার ঢাকায় থাকায় কুষ্টিয়ায় নিয়মিত অফিস করেন না। ঘুষ ও কমিশনের অর্থও ঢাকায় বসেই গ্রহণ করেন বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
তার বাসভবনের কেয়ারটেকার প্রশান্ত ও ঘনিষ্ঠজনদের মাধ্যমে বাসায় নিয়মিত অচেনা নারীদের আনাগোনার অভিযোগও রয়েছে, যা নিয়ে অফিসপাড়ায় চলছে নানা আলোচনা। এদিকে বিশ্বস্ত একটি সূত্র জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে। একাধিক লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতেই এই তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে বোর্ডের কোনো কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হননি। অভিযোগের বিষয়ে জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী রাশিদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
