বিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে আরও আগ্রাসী পদ্মা-ভাঙনে দিশেহারা নদীপাড়ের মানুষ - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

বিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে আরও আগ্রাসী পদ্মা-ভাঙনে দিশেহারা নদীপাড়ের মানুষ 

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: অক্টোবর ২৭, ২০২৪

নিজ সংবাদ ॥ রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের গ্রোয়েনে বাধা পেয়ে আরও আগ্রাসী রূপ ধারন করেছে প্রমত্ত পদ্মা। বিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে নদী স্বাভাবিক গতিপথ হারাতে বসেছে। যার প্রভাব পড়ছে নদীপাড়ের মানুষদের উপর। ইতোমধ্যে সরকারী-বেসরকারী জনগুরুত্বপূর্ন স্থাপনা ও অবকাঠামো বিলীন হয়েছে পদ্মার গর্ভে।সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, পদ্মার ডানপাশের কুষ্টিয়া মিরপুর উপজেলার বহলবাড়িয়া ও তালবাড়িয়া এ দুই ইউনিয়নের ৭ কিলোমিটার এলাকায় প্রবল ভাঙনে কৃষিজমি, বাড়িঘর, স্কুল মাদ্রাসা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের কয়েকটি টাওয়ার ভেঙ্গে পড়েছে। এছাড়া উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টিজেলার সঙ্গে সংযুক্ত একমাত্র মহাসড়কটিও পাড়ে দাঁড়িয়ে চরম ঝুঁকিতে।

এবছর নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প গঙ্গা কপোতাক্ষ ও ভেড়ামারা ৪১০ মেগা কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রসহ নানা অবকাঠামো।ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে এই ভাঙ্গন ঠেকাতে স্থায়ী তীররক্ষা বাঁধ নির্মান প্রকল্প বাস্তবায়নসহ এই বিপর্যয়ের জন্য দায়ী কথিত বিশেষজ্ঞদের জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে পুনবার্সন করতে হবে । সংশ্লিষ্ট পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছেন, এ মুহুর্তে জরুরী কাজ বালিভর্তি জিও ব্যাগ ফেলানো হচ্ছে। তবে নদীর পানি কমার সঙ্গে সঙ্গেই প্রকল্প বাস্তবায়নে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করবেন।

এদিকে আক্রান্ত এলাকার সর্বস্ব খুইয়ে ক্ষুব্ধ আশ্রয়হীনরা কুষ্টিয়া-ঈশ্বরদী মহাসড়ক অবরোধ করেন। এসময় স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক আব্দুল মোনিন বলেন, ‘পদ্মার বাম তীরে মূল কইজের মধ্যে রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পোর্ট নির্মানে প্রায় ১ কিলোমিটার গ্রোয়েন নির্মান করা হয়েছে। এত বড় একটা ঘটনা ঘটালো প্রকল্প কর্তৃপক্ষ অথচ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা মন্ত্রনালয় থেকে কোন অনাপত্তিটাও নেয়নি তারা। আবার পানি উন্নয়ন বোর্ডও এর বিরূপ ভয়াবহতা সম্পর্কে আগে থেকে আমাদের কিছুই জানায়নি। যাদের অদক্ষতা ও দায়িত্বহীনতায় শান্ত পদ্মা অশান্ত হয়েছে তাদের বিচার চাই আমরা। মিরপুর উপজেলার সাহেব নগর গ্রামের সোমেলা খাতুন (৮১) বিলাপ করে বলেন,

‘আহ হা হা, সুনার সার ভুঁই, এক দাগে ১০ বিঘি ভুঁই আমার। উর বাপ দুনিয়াই তিন বিদায় হয়ে গেছে, তিনডি ছাওয়াল এই ভুই আমাক দিয়ে গিছিলি। একন সব শ্যাস কইরি দেচে গাংয়ে। একটু মাতা গুইজি দাড়ানির জাগাও নি, কোন যায়ে দাঁড়াবো আর খাবো কি ? ঘরে কিচ্চু বুলতি কিচ্চু নি, এক যা আচে তুমরা এইডাই ঠেকা দেও, বুলাক দিয়ে গাং বাদি দেও।ঘরহারা গৃহবধু রেখা খাতুন(৩৫) বিলাপ করে বলেন, ‘জমি জায়গা যা ছিলো সবই গেছে। এখন মাথা গোঁজার জাগাডাও নি। সর্বশান্ত হয়ে আমার অবস্থাও এখন আশ্রয়হীণ ভাসমানদের দলে। পাকা বাঁধ না হলি এই ভাঙ্গন কোন ভাবেই ঠেকানি যাবি না’ এখন যে বালুর বস্তা দিয়ে ঠেকাতি চাচ্ছে, ইতে কোন কাজই হচ্ছেনা, সবই  গভীর পানিত তলা যাচ্ছে’।একেবারে পাড়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকা মীর আব্দুল করীম ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ আহসানুল হক খান চৌধুরী বলেন, ‘ভাঙ্গনটি এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যে, যে কোন মুহুর্তে আমার কলেজটি জাস্ট পাড়ের উপর থেকে কাত হয়ে গভীর পানিতে তলিয়ে যাবে।

চোখের সামনে শুধু চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার থাকবে না। কলেজটি নদী গর্ভে যাওয়া মাত্রই কুষ্টিয়া-ঈশ্বরদী মহাসড়ক যেটি দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল এবং উত্তর বঙ্গের ২১টি জেলার সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র সড়ক সেটিও চলে যাবে। ইতোমধ্যে জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের কয়েকটি টাওয়ার ধ্বসে গেছে নদীতে, এখন হয়ত অপেক্ষায় আছে মহাসড়কটিও।বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কুষ্টিয়ার নির্বাহী  প্রকৌশলী রাশিদুর রহমান জানান, ‘এখন পানি কমার সময় পদ্মার তীব্র ভাঙ্গন রোধে তাৎক্ষনিক জরুরী আপতকালীন কাজ হিসেবে বালিভর্তি জিওব্যাগ ফেলানো হচ্ছে। যাতে করে জানামালের ক্ষতির পরিমান যতটা সম্ভব কমানো যায়। তবে এর স্থায়ী সমাধান হবে আমাদের অনুমোদিত প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কুষ্টিয়ার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক আব্দুল হামিদ জানান, ‘পদ্মার ডান তীরে ভাঙ্গন কবলিত ৯ কিলোমিটার এলাকায় স্থায়ী বাঁধ নির্মানে ১ হাজার ৪শ ৭২ কোটি টাকা প্রাক্কলন ব্যয় ধরে অনুমোদন প্রাপ্ত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রাথমিক কাজ এই অর্থ বছরেই শুরু হবে।