বিশেষ প্রতিনিধি ॥ নিম্নমানের ও ভেজাল কেনাফ বীজ সরবরাহের অভিযোগে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)-এর কুষ্টিয়া পাট বীজ কার্যালয়কে ঘিরে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের যৌথ অভিযোগের পর বিষয়টি তদন্তে নেমেছে বিএডিসির কেন্দ্রীয় দপ্তর। ইতোমধ্যে গত ১৬ মে একটি তদন্ত দল ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছে বলে জানা গেছে। অভিযোগ উঠেছে, বিএডিসির কেনাফ-৯৫ জাতের নামে সরবরাহ করা বীজ বপনের পর কাঙ্ক্ষিত অঙ্কুরোদগম হয়নি। বরং যে সামান্য চারা গজিয়েছে, তার বড় অংশই কেনাফ নয়; স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘ইন্ডিয়ান বট’ সদৃশ ভিন্ন প্রজাতির গাছ হিসেবে শনাক্ত হয়েছে।
এতে কৃষকদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দেওয়া লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা সম্মিলিতভাবে প্রায় ৪০০ কেজি কেনাফ-৯৫ বীজ সংগ্রহ করে নিজ নিজ জমিতে বপন করেন। কিন্তু বীজ বপনের পর গড়ে মাত্র ১০ শতাংশ অঙ্কুরোদগম হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। পরে মাঠে গজানো চারাগাছ পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, তা প্রত্যাশিত কেনাফ ফসল নয়।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা রেখেই তারা বিএডিসির বীজ সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু ভেজাল ও নিম্নমানের বীজ সরবরাহের কারণে তাদের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। কৃষকদের যৌথ অভিযোগে বলা হয়েছে, বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সরবরাহকৃত বিতর্কিত বীজগুলো মূলত বিএডিসি কুষ্টিয়া পাট বীজ কার্যালয় থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। একইসঙ্গে এর আগেও কুষ্টিয়া কার্যালয় থেকে ফরিদপুরে বিপুল পরিমাণ দুই ধরনের পাট বীজ সরবরাহ করা হয়, যা পরবর্তীতে একই ধরনের অভিযোগে ফেরত পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সূত্র আরও জানিয়েছে, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কৃষকদের কাছ থেকে বীজ সংগ্রহের কথা থাকলেও সংশ্লিষ্ট কিছু অসাধু কর্মকর্তা স্থানীয় বাজার থেকে বিভিন্ন প্রজাতির তথাকথিত ইন্ডিয়ান বীজ কম দামে কিনে সরকারি বীজ হিসেবে সরবরাহ করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, এসব বীজ প্রতি কেজি প্রায় ৪০ টাকায় সংগ্রহ করে ১৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক সময় দেশের ‘সোনালী আঁশ’ হিসেবে পরিচিত পাট ও কেনাফ চাষ সম্প্রসারণে সরকার ব্যাপক প্রণোদনা ও সহযোগিতা দিয়ে আসছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সরকারের এ উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ কৃষকদের।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএডিসি কুষ্টিয়া জোনের উপ-পরিচালক মনিরা খাতুন বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সংশ্লিষ্ট বীজ সরবরাহের বিষয়ে তিনি অবগত নন। তবে ফরিদপুর থেকে ফেরত পাঠানো বীজের বিষয়ে তিনি বলেন, “বীজগুলো সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই না করেই ফেরত পাঠানো হয়েছে।” তিনি দাবি করেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে। তবে এ সংক্রান্ত কোনো লিখিত প্রতিউত্তর বা নথিপত্র দেখাতে পারেননি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সরবরাহ করা বীজের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “আমরা হয়তো সরাসরি দিইনি। অন্য কোনো কার্যালয়ে পাঠানোর পর সেখান থেকে তাদের দেওয়া হতে পারে।”
এদিকে, ফরিদপুর থেকে ফেরত পাঠানো বীজগুলো যে কৃষকেরা সরবরাহ করেছেন তাদের বিস্তারিত তথ্য চেয়ে আবেদন করা হলেও এখনো তথ্য সরবরাহ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। আবেদনকারীদের দাবি, “দিচ্ছি-দেবো” বলে দীর্ঘদিন ধরে ঘুরানো হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগের সত্যতা মিললে এটি কেবল নিম্নমানের বীজ সরবরাহের ঘটনা নয়, বরং সরকারি কৃষি সহায়তা ব্যবস্থার ভেতরে একটি বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র উন্মোচিত হতে পারে। এখন তদন্ত প্রতিবেদনের দিকেই তাকিয়ে আছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা।
