প্রশাসন বদলায়-কিন্তু বদলায় না ইবির বকুলের ভাগ্য - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

প্রশাসন বদলায়-কিন্তু বদলায় না ইবির বকুলের ভাগ্য

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২৫

ইবি প্রতিনিধি ॥ আনুমানিক ১০ বছরের মতো সময় ধরে এখানে কাজ করছি। প্রথমে স্যাররা পকেট থেকে ৭০০ টাকা বেতন দিতো, এরপর ২০০০ হলো। আসকারী স্যারের সময়ে কিছুদিন ডে-লেবার হিসেবে বরাদ্দের টাকা পেলেও সালাম স্যার এসে ৬ মাস পরে বন্ধ করে দেয়। প্রতিবার আশায় থাকি ইনি আসলেই হবে, উনি আসলেই হবে, কিন্তু হয়না। যদি আমার ফাইলটা পাস হতো তাহলে অন্তত সংসারটা একটু চালাতে পারতাম। এভাবে নিজের কষ্টের কথা বলছিলেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য প্রকাশনা ও জনসংযোগ দপ্তরের পিয়ন পদে বিনাবেতনে কাজ করে যাওয়া বকুল হোসেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য, প্রকাশনা ও জনসংযোগ অফিসে গত ০১-০৬-২০১৩ তারিখ থেকে বিনা পারিশ্রমিক-বেতনে পিওনের কাজ করে আসছিলেন বকুল।

পরবর্তীতে তৎকালীন উপাচার্যের অনুমোদন সাপেক্ষে ১৭-১১-২০১৮ তারিখ থেকে ৩০-০৪-২০২১ তারিখ পর্যন্ত দৈনিক মজুরিতে ‘ডে-লেবার’ হিসাবে কাজ করেন। পরবর্তীতে ২০২১ সালের মে মাস থেকে তার দৈনিক মজুরি বরাদ্দ বন্ধ হয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডায়েরি, ক্যালেন্ডার, জাতীয় দিবসসমূহ উদযাপন ও ৮টি অনুষদের জার্নাল সংক্রান্ত চিঠিপত্র-প্রজ্ঞাপন এবং প্রকাশিত ডায়েরি, ক্যালেন্ডার ও বার্তা বিভিন্ন অফিসে প্রেরণ, কর্তৃপক্ষের নিকট প্রেস ক্লিপিং প্রেরণ, ফটোকপি মেশিন অপারেটিং কাজসহ অফিসের সংশ্লিষ্ট সকল কাজ একটানা দীর্ঘ ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে দক্ষতার সাথে সামলে আসছেন বকুল। সারাদিনে এতকাজ করলেও আদতে যেন কিছুই করেননা তিনি। মাস শেষে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন বেতন তো পান ই না বরং জনসংযোগ দপ্তরের কর্মকর্তাদের পকেট থেকে দেওয়া ২০০০ থেকে ২৫০০ টাকার যৎসামান্য অর্থ তার অভাব যেন আরো বাড়িয়ে দেয়। এদিকে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্থায়ী নিয়োগ না হওয়ায় জনসংযোগ দপ্তরের নিয়মিত কাজ সম্পাদনে কর্মচারী-পিওনের সংকট দেখা দিয়েছে।

দাপ্তরিক কাজ চালু রাখতে বাধ্য হয়ে বকুল হোসেনকে খাটাতে হচ্ছে কর্মকর্তাদের। অপরদিকে, এতদিন ধরে কাজ করে যাওয়ায় বকুল হোসেনও স্থায়ী চাকরির আশায় বুক বেঁধেছেন। আসকারী প্রশাসনের আমলে আড়াই বছর ‘ডে-লেবার’ হিসেবে দৈনিক ৩০০ টাকা মজুরি পেলেও সালাম প্রশাসন এসে ৬ মাস পরেই তার বেতন বন্ধ করে দেয়। ২০২১ সালের মে মাস থেকে এখন পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি টাকাও মজুরি পাননি বকুল। বকুলের বাসা কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে। স্ত্রী ও দুই মেয়ের সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর অবস্থা তার। প্রতিদিন ভোরে উঠে খাওয়াদাওয়া করে ১ ঘন্টা সাইকেল চালিয়ে শহরের বড়বাজার আসেন তিনি। এরপর সেখান থেকে শহরে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে অফিসে আসেন। সংসার কীভাবে চলে জানতে চাইলে বকুল বলেন, খুবই কষ্ট করে জীবন কাটে আমার।

মাসিক ইনকাম আনুমানিক ৮ হাজারেরও কম। পিতৃসূত্রে পাওয়া ১ বিঘা জমিতে ধান, পেঁয়াজ চাষ করি। সপ্তাহে দুইদিন বন্ধ আর মাঝেমাঝে স্যারদের কাছে ছুটি নিয়ে চাষাবাদের কাজ করি। সংসার চলে অনেকটাই আমার বউয়ের জন্য। বাড়িতে হাঁস, মুরগী, গরু আছে, সে সব দেখাশোনা করে। এসব থেকেই কোনোভাবে। আমাদের খাওয়া পড়া, মেয়েদেরও পড়ালেখার খরচ চালানো হয়। মেয়েদের বই কেনার সময় কারও কাছে টাকা চাইলে দেয়। কান্না জড়িত কন্ঠে বকুল বলেন, সবচেয়ে কষ্ট লাগে তখন, যখন আমি বাসায় গেলে আমার ছোট মেয়েটা ব্যাগটা খুলে দেখে কোনো খাবার নিয়ে গেছি নাকি। কিন্তু আমি নিয়ে যাইতে পারিনা। বড় মেয়েটা ডিগ্রী সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। অটোতে ১০ টাকা ভাড়া হওয়ায় যে পর্যন্ত ৫ টাকা ভাড়া সে পর্যন্ত যায়, বাকি পথ হেঁটে যায়। এই কষ্টের কথা কাওকে বলে বোঝানো যায় না, স্যারদের বলার পরও ওনারা বোঝেননা।

এতোদিন ধরে বিনাবেতনে খাটতেছেন কেন এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রতিবার আশায় থাকি ইনি আসলে হবে, উনি আসলেই হবে। কিন্তু হয়না। যদি আমার ফাইল টা শুধু পাস হতো তাহলে অন্ত বাসাটা আমি একটু চালাতে পারতাম ঠিকভাবে। আমরা ডে লেবার ঢুকেছিলাম একসাথে ৭ জন। ডরমেটরির ৩ জনের কাজ হয়েছে। ওদের এখন ১৬০০০ টাকা বেতন কিন্তু আমাদের হয়নি। এবিষয়ে তথ্য, জনসংযোগ ও প্রকাশনা দপ্তরের উপ রেজিস্ট্রার সাহেদ হাসান বলেন, অফিস সহকারী বা পিয়ন পদে আমাদের জনবল ছিল না। যিনি ছিল সে হঠাৎ করেই মারা যায়। বকুল কিছুদিন ডে-লেবার হিসেবে কাজ করলেও হঠাৎ করেই তা বন্ধ হয়ে যায়। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির বাজারে আমাদের পকেট থেকে দেওয়া ২০০০-২৫০০ টাকা কোন টাকাই না। আমরা একাধিকবার প্রশাসনের সাথে কথা বলেছি, প্রশাসন জিজ্ঞেস করেছিল যে এর আগে কিভাবে চলত। আমরা জানিয়েছিলাম যে আমরা পকেট থেকে টাকা দিয়ে চালাতাম, তখন প্রশাসন আমাদের বলে যে আগে যেভাবে চালাতেন সেভাবে চালান।

কিন্তু এটা তো কোন উপযুক্ত কথা হতে পারে না। আমরা চাই ডে-লেবার হিসেবে ও যে টাকাটা পেত সেটা যেন প্রশাসন আবারও চালু করে বকুলের জীবনধারণকে আরেকটু সহজ করে দেয়। জনসংযোগ দপ্তরের পরিচালক ড. আমানুর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম এই তথ্য প্রকাশনা ও জনসংযোগ অফিসে বিগত কোন প্রশাসনই তেমন নজর দেয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচার এবং বার্তা প্রকাশ সহ প্রয়োজনীয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ এই অফিস করলেও পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি। বিভিন্ন অফিসে চিঠি পাঠাতে পিয়ন দরকার কিন্তু দীর্ঘ ৫ বছরে এখানে কোন পিয়ন নেই। আমাদের পকেট থেকে পয়সা দিয়ে বকুলকে কাজ করাতে হয়। তার থোকের বিষয়ে আসকারী প্রশাসনকে বলছিলাম অন্তর্ভুক্ত করতে। ৮০ জনের থোক বরাদ্দ হলেও ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে তাকে থোকভুক্ত করা হয়নি। পরের প্রশাসনও একই কাজ করছে। লোকবলের অভাবে আমাদের ডেইলি ইভেন্ট কাভার দিতে হিমশিম খেতে হয়। আমরা বর্তমান প্রশাসনকেও অবগত করেছি, উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ সবাইকে জানানো হয়েছে। তারা বিষয়টি দ্রুত দেখবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন।