প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বাল্যবিয়ে বন্ধ - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বাল্যবিয়ে বন্ধ

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: মার্চ ১২, ২০২৬

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া জেলা জজ আদালত চত্বরে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়ের বিয়ের প্রস্তুতির অভিযোগে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে একটি বাল্যবিবাহ বন্ধ করা হয়েছে। গতকাল বুধবার (১১ মার্চ)  বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে বিয়ের আয়োজন বন্ধ করে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করে দেয়। জানা যায়, কুষ্টিয়া জজ আদালত চত্বরের যমুনা ভবনের বর্ধিত অংশে একটি আইনজীবীর ব্যক্তিগত চেম্বারে গোপনে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়ের বিয়ের আয়োজন করা হচ্ছে, এমন সংবাদের ভিত্তিতে সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রাথমিকভাবে ঘটনার সত্যতা পান।

পরে বিষয়টি কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (ভারপ্রাপ্ত) আহেমদ মাহবুব-উল-ইসলামকে অবহিত করা হলে তিনি দ্রুত পদক্ষেপ নেন। জেলা প্রশাসকের নির্দেশে সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিদ মোস্তফা হাসানের নেতৃত্বে একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ম্যাজিস্ট্রেট অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়ের সঙ্গে কথা বলে তাদের বয়স সম্পর্কে নিশ্চিত হন। এ সময় মেয়েটির সঙ্গে তার দুলাভাই রাশেদুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। ম্যাজিস্ট্রেট আসার খবর পেয়ে মেয়ের বাবা ও অন্যান্য স্বজনরা দ্রুত সেখান থেকে সরে যান বলে জানা যায়।

অন্যদিকে ছেলেটির বড় ভাই ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও তার বাবা-মা সেখানে ছিলেন না। ভ্রাম্যমাণ আদালতে মেয়েটির দুলাভাই রাশেদুল ইসলাম লিখিতভাবে অঙ্গীকার করেন যে, তিনি অজ্ঞতাবশত অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিয়ের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, তার শ্যালিকা আইন অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত বিয়ে দেওয়া হবে না। অন্যথায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে তিনি তা মেনে নেবেন বলেও লিখিতভাবে জানান। এর আগে সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে গেলে দেখতে পান, অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়ে, মেয়ের বাবা ও কয়েকজন আত্মীয় চেম্বারের ভেতরে অবস্থান করছেন।

ছেলেটির সঙ্গে তখন কোনো অভিভাবক উপস্থিত ছিলেন না। উপস্থিতদের সঙ্গে কথা বললে তারা সেখানে বিয়ের উদ্দেশ্যেই এসেছেন বলে স্বীকার করেন। ছেলে ও মেয়েকে জিজ্ঞাসা করলে তারা জানান, চেম্বারের ভেতরে থাকা খালিদ নামের এক ব্যক্তি ও তার সহযোগীর কাছে তাদের আনা হয়েছে। তবে তারা কোনো আইনজীবীর নাম স্পষ্টভাবে বলতে পারেননি। যে কক্ষে তারা অবস্থান করছিলেন সেটি অ্যাডভোকেট জাকির হোসাইনের ব্যক্তিগত চেম্বার বলে জানা যায়। সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে ভেতরে থাকা খালিদ নামের ওই ব্যক্তি বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন এবং বিয়ের বিষয়ে কিছু জানেন না বলে দাবি করেন।

এমনকি উপস্থিত ছেলে-মেয়ে ও তাদের স্বজনদের তাকে অচেনা ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন বলেও অভিযোগ ওঠে। যদিও ছেলে-মেয়ের বক্তব্য অনুযায়ী তারা ওই ব্যক্তির কাছেই এসেছিল বলে জানায়। স্থানীয় একটি সূত্র দাবি করেছে, আদালত চত্বরের ওই চেম্বারে প্রায়ই বিয়ের আয়োজন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিয়ে দেওয়ার ঘটনাও নতুন নয়। খালিদ নামের ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধেও অতীতে এ ধরনের অভিযোগ উঠেছিল বলে সূত্রটি জানায়। বিষয়টি নিয়ে সংগৃহীত অনুসন্ধানী তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী প্রতিবেদনে বিস্তারিত প্রকাশ করা হবে বলে জানা গেছে।

এদিকে বিশ্বস্ত একটি সূত্র জানিয়েছে, অপ্রাপ্তবয়স্ক ওই ছেলে-মেয়ের বাড়ি কুষ্টিয়ার সোনাডাঙ্গা গ্রামে। অভিযোগ রয়েছে, ছেলেটিকে জোর করে বিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে সকালে তার মাকে মারধর করা হয় এবং পরে তাকে বাড়ি থেকে নিয়ে আসা হয়। স্থানীয়ভাবে গুঞ্জন রয়েছে, ছেলেটির দুই চাচা মেয়ের পরিবারের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে তাকে বিয়ের জন্য নিয়ে আসে। এমনকি ছেলেটির মাকে মারধরের ঘটনায় ওই দুই চাচার সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে। আদালত চত্বরে বাল্যবিবাহের মতো বেআইনি কার্যক্রম বন্ধে জেলা প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপে কুষ্টিয়ার সচেতন মহল, আইনজীবী সমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (ভারপ্রাপ্ত) আহেমদ মাহবুব-উল-ইসলামের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপকে তারা প্রশংসনীয় উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।