বিশেষ প্রতিনিধি ॥ আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদীয় আসন-৭৭, কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের ১৩টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার ১৪২টি ভোট কেন্দ্রের ৮৮৭ টি ভোট কক্ষে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে প্রাথমিক ভাবে নিশ্চিত করেছে কুষ্টিয়া জেলা নির্বাচন অফিস। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ ও আনসার সদস্যদের প্রশিক্ষণ চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন সিনিয়র জেলা নির্বাচন অফিসার মো. মাহবুবুর রহমান।
ইতিমধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র পক্ষ থেকে প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকারকে ধানের শীষ প্রতীকে, বাংলাদেশ জামায়েত ইসলামীর পক্ষ থেকে মুফতী আমীর হামজাকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’র পক্ষ থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব আহমদ আলীকে হাতপাখা প্রতীকে প্রাথমিক ভাবে আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন দিয়েছে এবং গণ অধিকার পরিষদের পক্ষ থেকে আব্দুল খালেককে ট্রাক প্রতীকে নির্বাচনের করবেন বলে জানা যাচ্ছে। যদিও গণ অধিকার পরিষদের কেন্দ্র থেকে এখন পর্যন্ত মনোনয়নের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোন কিছু নিশ্চিত করা হয়নি।
কুষ্টিয়া জেলার প্রাণকেন্দ্র হিসাবে এই আসনের নির্বাচনকে ঘিরে ব্যাপক উত্তেজনা বিরাজ করছে। সাধারণ ভোটাররা মনে করেন এই আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে ধানের শীষের প্রার্থী প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার এবং দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী মুফতী আমীর হামজার মধ্যেই ভোট যুদ্ধ চলবে। একদিকে মুফতী আমীর হামজার জনপ্রিয়তা অন্য দিকে রাজনৈতিক দল হিসাবে বিএনপির বিশাল কর্মি বাহিনী এবং সাংগঠনিক কর্মকান্ড রয়েছে।
এছাড়াও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’র প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব আহমদ আলীও আসন্ন নির্বাচনে ভালো ফলাফল করবেন বলে মত দিয়েছেন অনেকেই। যদিও মুফতী আমীর হামজা এবং দলীয় নেতা কর্মিরা আরও প্রায় মাস দুয়েক আগে থেকেই নির্বাচনী প্রচার প্রচারণা শুরু করেছেন। বিএনপি সবেমাত্র গত ৩ নভেম্বর প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকারকে অনুষ্ঠানিক মনোনয়ন দিয়েছে।
তবে ৮টি ইসলামী দলের নির্বাচনী সমঝোতা হওয়ার কারণে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে বাংলাদেশ জামায়েত ইসলামীর প্রার্থী মুফতী আমীর হামজা অথবা ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’র প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব আহমদ আলীর মধ্যে যে কেউ নির্বাচন থেকে সরে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দলীয় মনোনয়ন না পওয়ায় জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও কষ্টিয়া সদর আসনের সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করবেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। সেক্ষেত্রে ভোটের রাজনীতিতে বিপাকে পড়তে পারেন বিএনপির মেনানীত প্রার্থী প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার এবং নির্বাচনের পুরো চিত্র পাল্টে যেতে পারে বলে সাধারণ ভোটরদের ধারণা।
জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য মতে, কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনে সর্বমোট ৪ লাখ ৩৫ হাজার ৮৩ জন ভোটার রয়েছে। যার মধ্যে ২ লাখ ১৩ হাজার ৯ শত ৪৬ জন পুরুষ, ২ লাখ ১১ হাজার ১ শত ৩৩ জন এবং ৪ জন হিজরা ভোট রয়েছে।
তথ্য মতে, পৌরসভার ৪৯টি ভোট কেন্দ্রের ৩১৫টি ভোট কক্ষে মোট ভোটারের সংখ্যা ১ লাখ ৬২ হাজার ১ শত ৭৫ জন। যার মধ্যে ৭৭ হাজার ৭ শত ১২ জন পুরুষ, ৮৪ হাজার ৪ শত ৬২ জন মহিলা ভোটার এবং হিজরা ভোটার ১ জন।
হাটশ হরিপুর ইউনিয়নের ৯ টি ভোট কেন্দ্রের ৫৩টি কক্ষে মোট ভোটারের সংখ্যা ২৫ হাজার ৭ শত ৯৭ জন। যার মধ্যে ১২ হাজার ৯শত ৫ জন পুরুষ ও ১২ হাজার ৮ শত ৯২ জন মহিলা ভোটার।
বটতৈল ইউনিয়নের ১০টি ভোট কেন্দ্রে ৫৮টি কক্ষে মোট ভোটারের সংখ্যা ৩০ হাজার ৩ শত ২৭ জন। যার মধ্যে ১৪ হাজার ৮ শত ৫৯ জন পুরুষ, ১৫ হাজার ৪ শত ৬৬ জন মহিলা এবং ২ জন হিজরা ভোটার।
আলামপুর ইউনিয়নের ৮টি ভোট কেন্দ্রের ৫১টি কক্ষে মোট ভোটারের সংখ্যা ২৫ হাজার ৬১ জন। যার মধ্যে ১২ হাজার ৩ শত ১৬ জন পুরুষ এবং ১২ হাজার ৭ শত ৪৫ জন মহিলা ভোটার।
আব্দালপুর ইউনিয়নের ৮টি ভোট কেন্দ্রের ৫১টি ভোট কক্ষে মোট ভোটারের সংখ্যা ২৪ হাজার ৪ শত ১৯ জন। যার মধ্যে ১২ হাজার ২ শত ৬ জন পুরুষ এবং ১২ হাজার ২ শত ১৩ জন মহিলা ভোটার।
হরিনারায়নপুর ইউনিয়নের ৯টি ভোট কেন্দ্রের ৪৭টি ভোট কক্ষে মোট ভোটারের সংখ্যা ২৩ হাজার ১ শত ৮৯ জন। যার মধ্যে ১১ হাজার ৬ শত ৫০ জন পুরুষ এবং ১১ হাজার ৫ শত ৩৯ জন মহিলা ভোটার।
জিয়ারখী ইউনিয়নের ৫ টি ভোট কেন্দ্রের ৩৫টি ভোট কক্ষে মোট ভোটারের সংখ্যা ১৭ হাজার ২ শত ১০ জন। যার মধ্যে ৮ হাজার ৫ শত ৭০ জন পুরুষ এবং ৮ হাজার ৬ শত ৪০ জন মহিলা ভোটার।
ঝাউদিয়া ইউনিয়নের ৭টি ভোট কেন্দ্রের ৪০টি ভোট কক্ষে মোট ভোটারের সংখ্যা ২০ হাজার ৩ শত ৩২ জন। যার মধ্যে ১০ হাজার ২ শত ৯০ জন পুরুষ এবং ১০ হাজার ৪২ জন মহিলা ভোটার।
উজানগ্রাম ইউনিয়নের ৭টি ভোট কেন্দ্রের ৪১টি ভোট কক্ষে মোট ভোটারের সংখ্যা ২০ হাজার ৭ শত ৭৫ জন। যার মধ্যে ১০ হাজার ৩ শত ৬৫ জন পুরুষ এবং ১০ হাজার ৩ শত ৯৯ জন মহিলা ভোটার।
আইলচারা ইউনিয়নের ৬টি ভোট কেন্দ্রের ৩৬টি ভোট কক্ষে মোট ভোটারের সংখ্যা ১৮ হাজার ৩ শত ১৫ জন। যার মধ্যে ৯ হাজার ১ শত ৪৬ জন পুরুষ এবং ৯ হাজার ১ শত ৬৯ জন মহিলা ভোটার।
পাটিকাবাড়ী ইউনিয়নের ৬টি ভোট কেন্দ্রের ৩৬টি ভোট কক্ষে মোট ভোটারের সংখ্যা ১৭ হাজার ৬ শত ৭৮ জন। যার মধ্যে ৮ হাজার ৯ শত ১৮ জন পুরুষ এবং ৮ হাজার ৭ শত ৬০ জন মহিলা ভোটার।
মনোহরদিয়া ইউনিয়নের ৬টি ভোট কেন্দ্রের ৩৮টি ভোট কক্ষে মোট ভোটারের সংখ্যা ১৭ হাজার ৬ শত ২৯ জন। যার মধ্যে ৮ হাজার ৯ শত ৪৫ জন পুরুষ এবং ৮ হাজার ৬ শত ৮৪ জন মহিলা ভোটার।
গোস্বামী-দূর্গাপুর ইউনিয়নের ৭টি ভোট কেন্দ্রের ৩৬টি ভোট কক্ষে মোট ভোটারের সংখ্যা ১৭ হাজার ৬ শত ৭২ জন। যার মধ্যে ৮ হাজার ৯ শত ৩৪ জন পুরুষ এবং ৮ হাজার ৭ শত ৩৮ জন মহিলা ভোটার।
কাঞ্চনপুর ইউনিয়নের ৫টি ভোট কেন্দ্রের ৩০টি ভোট কক্ষে মোট ভোটারের সংখ্যা ১৪ হাজার ৫ শত ২৪ জন। যার মধ্যে ৭ হাজার ১ শত ৩৯ জন পুরুষ, ৭ হাজার ৩ শত ৮৪ জন মহিলা ভোটার এবং হিজরা ভোটার ১ জন।
নির্বাচনের বিষয়ে জানতে চাই গণ অধিকার পরিষদ কুষ্টিয়া জেলা শাখার সাধারণ সাম্পাদক মো. আব্দুল খালেক জানান, দেশে সার্বিক যে পরিস্থিতি চলছে তাতে নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা আছে। আদৌও নির্বাচন হবে কি না বলা মুশাকিল। প্রশাসনিক অবস্থা এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের যে অবস্থা তাতে তো আমরা ভোট হবার মত পরিস্থিতি দেখছি না। যার ফলে ভোট কেন্দ্র দখলের আশঙ্কা রয়েছে। তারপরও আমরা আশাবাদী নির্বাচন হবে।
এই বিষয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কুষ্টিয়া জেলা শাখার সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব আহমদ আলী বলেন, গত (৩ নভেম্বর) ইসলামী সমমনা ৮টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে নির্বাচনী সমঝোতা হয়েছে। সেই মোতাবেক ৮টি ইসলামী সমমনা দলের পক্ষ থেকে প্রতিটি আসনে একজন প্রার্থী থাকবে। আমরা আশা করছি কুষ্টিয়ার ৪টি আসনের মধ্যে আমাদের দলকে ২টি আসনে প্রার্থীতা দেওয়া হবে। সেক্ষেত্রে কুষ্টিয়া সদর আসনে আমার নির্বাচন করার সম্ভবনা রয়েছে। যদিও নিশ্চিত ভাবে এখনও কোন কিছু বলা যাচ্ছে না।
তবে এই বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ জামায়েত ইসলামীর প্রার্থী মুফতী আমীর হামজার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
আসন্ন নির্বাচনের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী প্রকৌশলী জাকির হোসনে সরকার বলেন, বিএনপি অনেক বড় রাজনৈতিক দল, দলের বাইরে গিয়ে সারা বাংলাদেশে কেউ ভালো করতে পারে নাই। কুষ্টিয়াতেও কেউ দলের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করবে বলেও আমার বিশ্বাস হয় না। ইতিপূর্বে কেন্দ্রীয় অনেক বড় বড় নেতারাও দলের বাইরে গিয়ে ভালো করতে পারেনি।
ইসলামী সমমনা দল গুলোর সমঝোতা সম্পর্কে বিএনপি নেতা প্রকৌশলী জাকির হোসনে সরকার বলেন, জামায়েত ইসলাম ছাড়া কুষ্টিয়া অন্য কোন ইসলামী দল আছে বলে মনে হয়। তাই ৮ বা ১০ দলের দিয়ে ভোটের সংখ্যা দিয়ে ভোটের সংখ্যা নিরুপন করা সম্ভব না। জামায়েত আগেও জোটবদ্ধ ভাবে আমাদের সাথে ছিলো। জামায়েতের সাথে আমাদের ভোটের যুদ্ধ হয়েছিলো ২০১৪ সালের উপজেলা নির্বাচনে। ২০০৯ সালের তারা উপজেলা নির্বাচনে যেই ভোট পেয়েছিলো ২০১৪ সালের নির্বাচনে তার অর্ধেক ভোট পেয়েছিলো। এবারে তারা যদি আমাদের সাথে সরাসরি ভোটের প্রতিযোগিতা করে তাহলে তাদের ভোটের সংখ্যা আরও কমে যাবে।
