পোড়াদহে পল্লী চিকিৎসকের রহস্যময় মৃত্যু - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

পোড়াদহে পল্লী চিকিৎসকের রহস্যময় মৃত্যু

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: আগস্ট ৯, ২০২৩
পোড়াদহে পল্লী চিকিৎসকের রহস্যময় মৃত্যু

কেউ বলছে হত্যা, কেউ বলছে আত্মহত্যা, আবার কেউ বলছে হত্যা করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এ যেন এক গোলক ধাঁধা। আর এমন ঘটনাই ঘটেছে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার আইলচারা ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডে, বড় আইলচারা গ্রামে। আবার অনেকেই বলছে, সুদখোরদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য না করতে পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন পল্লী চিকিৎসক শরীফুল ইসলাম শরীফ (৪৫)।

পোড়াদহে পল্লী চিকিৎসকের রহস্যময় মৃত্যু

পোড়াদহে পল্লী চিকিৎসকের রহস্যময় মৃত্যু

পোড়াদহে পল্লী চিকিৎসকের রহস্যময় মৃত্যু

মঙ্গলবার সকালে আইলচারা হাটপাড়া এলাকার ভাড়া বাসার চিলেকোঠায় লোহার রডের সাথে দড়িতে ঝুলন্ত অবস্থায় পল্লী চিকিৎসক শরীফের লাশ উদ্ধার করে স্বজনেরা। নিহত শরীফ বড় আইলচারা এলাকার মোতালেবের ছেলে। নিহতের বোন শরীফা জানান- লিটন মেম্বার, ইছাহক মেম্বার, জাহিদুল ইসলাম জাহেদ জোয়ার্দ্দার, খান মেহেদী হাসান কিরণ ও বরকত জোয়াার্দ্দারের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন পল্লী চিকিৎসক শরীফ।

আরো জানা যায়, লিটন মেম্বার, ইছাহক মেম্বার, জাহিদুল ইসলাম জাহেদ জোয়ার্দ্দার, খান মেহেদী হাসান কিরণ ও বরকত জোয়াার্দ্দার এলাকার চিহ্নিত সুদের কারবারি। শরীফকে যে পরিমাণ টাকা ধার দিয়েছিল তার ১০গুণ টাকা ফেরত পেয়েছেন সুদের কারবারিরা। তারপরও লিটন মেম্বার ৩ লাখ টাকা, ইছাহক মেম্বার ও বরকত জোয়ার্দ্দার লক্ষ লক্ষ টাকা দাবি করে চলেছেন। প্রায় দেড় থেকে দুই বছর আগে সুদের টাকার জন্য জাহিদুল ইসলাম জাহেদ জোয়ার্দ্দার ও তার জামাই কিরণ খান আইলচারার হারু মোড়ে একটি দোকানের মধ্যে আটকে রেখে শরীফকে অমানুষিক অত্যাচার করে। পরবর্তিতে আশে পাশের লোকজন এসে শরীফকে উদ্ধার করে। তার বেশ কিছুদিন পরে তারা শরীফ’র বিরুদ্ধে কোর্টে চেকে’র মামলা করেন এবং পরবর্তিতে জোর পূর্বক শরীফের জমি লিখে নেওয়ার চেষ্টা করে ।

google news

গুগোল নিউজে আমাদের ফলো করুন

গত ১২/১৪ দিন আগে সুদের টাকার দাবিতে জাহিদুল ইসলাম জাহেদ জোয়ার্দ্দার ও খান মেহেদী হাসান কিরণ’র যোগ সাজশে লিটন মেম্বার, ইছাহক মেম্বার ও বরকত জোয়াার্দ্দার মিলে শরীফকে মারধোর করে ঔষধের দোকান তালা মেরে চাবি নিয়ে যান। বার বার তাদের কাছে ধর্ণা ধরেও কাজ হয়নি।

ইতিপূর্বেও জাহিদুল ইসলাম জাহেদ জোয়ার্দ্দার ও খান মেহেদী হাসান কিরণ’র নেতৃত্বে তাদের এই তিন সহযোগী আইলচারা বিলের মাঠের মধ্যে শরীফকে নিয়ে গিয়ে রক্তাক্ত জখম করে। সে ঘটনায় মামলা হলেও ক্ষমতার দাপটের কাছে হেরে যেতে হয়েছে শরীফকে। তাছাড়া লিটন মেম্বার ও জাহিদুল ইসলাম জাহিদ জোয়ার্দ্দার শরীফের বাড়ির দলিলও নিজ হেফাজতে রেখেছেন। এমনকি শরীফের বাবা মোতালেবকে নিয়ে গিয়ে সিদ্দিক চেয়ারম্যানের নামে ৯শতক জমি বায়না রেজিষ্ট্রি করে নিয়েছেন লিটন মেম্বার। সেসময় থেকে শরীফের বাবা এলাকা ছেড়ে পলাতক রয়েছেন। লিটন মেম্বার, ইছাহক মেম্বার, জাহিদুল ইসলাম জাহেদ জোয়ার্দ্দার, খান মেহেদী হাসান কিরণ ও বরকত জোয়াার্দ্দারের কারণেই শরীফ আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন অথবা তারাই তাকে হত্যা করে ঝুঁলিয়ে রাখতে পারে বলে এলাকাবাসী মনে করেন।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয় এলাকাবাসীরা জানান, লিটন মেম্বার, ইছাহক মেম্বার, জাহিদুল ইসলাম জাহেদ জোয়ার্দ্দার, খান মেহেদী হাসান কিরণ ও বরকত জোয়াার্দ্দার এলাকার মানুষ রূপি চশমখোর। পল্লী চিকিৎসক শরীফ খুব ভালো মনের মানুষ ছিলেন। তার হাত যশও বেশ ভালো ছিল। মিষ্টভাষী শরীফকে তারা ব্যবহার করে উল্টো তাদের জালে ফাঁসিয়েছে। পাওনার টাকা ২০/৩০ গুন বাড়িয়ে আদায় করার পরও এখনো কিভাবে লক্ষ লক্ষ পাওনা থাকে তা আমাদের বোধগম্য নয়। গত সপ্তাহ দুয়েক ধরে উপরের অভিযুক্তরা মারধোর করে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে তালা দিয়ে রেখেছেন। শুনেছি গোপনে শরীফ তার প্রতিষ্ঠান খুলতে গিয়েও পারেননি। এদিকে শরীফের পরিবার গত কয়েকদিন ধরে খেয়ে না খেয়ে জীবন যাপন করছেন। তাছাড়া গতকাল থেকে বাড়িতে একেবারেই খাবার নেই।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত লিটন মেম্বারের সাক্ষাতকার গ্রহণকালে তিনি তার উপর আনীত সকল অভিযোগ অস্বীকার করলেও উপস্থিত শরীফের পরিবারের সদস্যরা তার উপর চড়াও হন এবং লিটন মেম্বারকে বলেন- “আমার ভাইয়ের মৃত্যুর জন্য আপনারাই দায়ী, আপনারা সকলেই সুদখোর”।

আরেক অভিযুক্ত ইছাহক মেম্বরের মুঠোফোনে ফোন দিলে তিনিও তার উপর আনীত সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন- আমি থানায় এসেছি, পরে কথা বলছি। এই বলে ফোন কেটে দেন তিনি।

তবে বরকত জোয়ার্দ্দার, জাহিদুল ইসলাম জাহেদ জোয়ার্দ্দার ও খান মেহেদী হাসান কিরণ সাথে কোনভাবেই যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি এবং স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিষয়ে আরো খোঁজ খবর নিতে গেলে কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বের হতে শুরু করে। বৃহস্পতিবার ২৬ মে ২০১৬ ইং তারিখে রাত সাড়ে ১১টার দিকে সদর উপজেলার আইলচারা এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন পরবর্তী দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে কুষ্টিয়ার আইলচারা ইউনিয়নের আইলচারা গ্রামের মৃত জাহের আলীর ছেলে শাহিনুর রহমান (২৭) নামে এক যুবলীগ নেতাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। সেই মামলা এজাহার নামীয় আসামী এই অভিযুক্তদের অনেকেই। গত ছয় বছরের বেশী সময় ধরে চলা এই মামলার এখন পর্যন্ত কোন স্বাক্ষীর স্বাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়নি। তবে এলাকার অনেকেই মনে করেন, লিটন মেম্বার ও জাহিদুল ইসলাম জাহেদ জোয়ার্দ্দারের মত প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ঐ মামলার আসামী হাওয়ার কারণে আইনের ফাঁক ফোকর দিয়ে দীর্ঘ এই সময় অতিবাহিত হয়েছে । জাহিদুল ইসলাম জাহেদ জোয়ার্দ্দার সম্পর্কে আরো খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিনি বিএনপি শাসনামলে কুষ্টিয়া জেলার ত্রাস হিসাবে পরিচিত বল্লভপুরের বাবু’র ভাইরা ভাই । লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে এক সময়ে তিনিই সন্ত্রাসী বাবু’র সমস্ত কর্মকান্ড গোপনে পরিচালনা করতেন। বাবু ক্রসফায়ারে নিহত হলেও বাবু’র অস্ত্রভান্ডারের সন্ধান আজও পায়নি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকার অনেকেই মনে করেন, লিটন মেম্বার সম্পর্কে জাহিদুল ইসলাম জাহেদ জোয়ার্দ্দারের বোন জামাই হওয়ার সুবাদে এবং বাবু’র গোপন অস্ত্রভান্ডারের শক্তিতেই এলাকায় সুদের রমরমা ব্যবসা করেন। যাকে যখন, যেখানে খুশি যা হয় বলেন এবং করেন ।

এবিষয়ে কুষ্টিয়া মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সৈয়দ আশিকুর রহমান মুঠোফোনে জানান, বিষয়টি আমি শুনেছি। ঘটনার সাথে যে বা যারা জড়িত থাক না কেন তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আরও পড়ুন: