পনের বছরে হানিফ-আতার ভাগ্যের চাকা ঘুরেছে রকেটের গতিতে - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

পনের বছরে হানিফ-আতার ভাগ্যের চাকা ঘুরেছে রকেটের গতিতে

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: ডিসেম্বর ১৮, ২০২৪

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ মাহবুবউল আলম হানিফ আর আতাউর রহমান আতা। কুষ্টিয়ার রাজনীতিতে সবচেয়ে আতঙ্কের নাম দুই ভাই। নানা কারণে আলোচিত-সমালোচিত এই দুই ব্যক্তি। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে প্রভাবশালী কয়েকজন নেতার মধ্যে অন্যতম হানিফ। আর কুষ্টিয়ায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে চরম আতঙ্কের আরেক নাম তার দূর সম্পর্কের চাচাতো ভাই আতাউর রহমান আতা। স্থানীয় রাজনীতি থেকে শুরু করে প্রশাসনের সর্বস্তরেই হানিফ আর আতার কথাই ছিল শেষ কথা। এই দু’জনের ইশারা ছাড়া কুষ্টিয়ায় যেন একটি গাছের পাতাও নড়তো না। তাদের বিরুদ্ধে এতদিন কারো টু শব্দ করার সাহস ছিল না। এক কথায় বলতে গেলে হানিফ-আতার সাম্রাজ্য কুষ্টিয়ায় এতদিন সবাই ছিল বোবা। এক যুগ আগেও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ ও তার চাচাতো ভাই আতাউর রহমান আতার দৃশ্যমান তেমন কোনো ব্যবসা-বাণিজ্য ও সম্পদ ছিল না। অথচ আওয়ামী লীগের ক্ষমতার প্রায় সাড়ে ১৫ বছরে হানিফ-আতার ভাগ্যের চাকা ঘুরেছে রকেট গতিতে। আওয়ামী লীগের টানা তিন মেয়াদে দুজন হয়ে ওঠেন মহাক্ষমতাধর, পাশাপাশি গড়ে তোলেন সম্পদের পাহাড়। নিজ জেলা কুষ্টিয়া ছাড়াও রাজধানী ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অন্তত চারটি জেলায় তাদের সম্পদ ও ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে বলে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে।

দলীয় পদকে পুঁজি করেই সারাদেশে হানিফ জাল ফেলে তৈরি করেন বড় নেটওয়ার্ক। দুই ভাই মিলে বাগিয়ে নিয়েছেন মাদক বিক্রির টাকা থেকে শুরু করে নানা ব্যবসা-বাণিজ্য। দেশে নানা সম্পদ গড়ার পাশাপাশি কানাডাসহ কয়েকটি দেশে হানিফ-আতার সম্পদ ও ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে বলেও জানা গেছে। হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর গা ঢাকা দিয়ে আছেন হানিফ-আতা। তাদের সম্রাজ্যে ভেঙে পড়েছে। সেই সঙ্গে তাদের দোসররাও পালিয়েছে। নামে-বেনামে হানিফের সম্পদের পাহাড়-হানিফের কপাল খুলে যায় শেখ পরিবারের আত্মীয় হওয়ার সুবাদে। দলের শীর্ষ পদ পাওয়ার পরই তার কাছে লোকজনের আনাগোনা বাড়তে থাকে। দলের পদ-পদবি পাওয়ার জন্য অনেকেই ছুটে আসতেন তার কাছে। এছাড়া ঢাকা কেন্দ্রিক নানা কাজের তদবিরও করতেন হানিফ। দলের পদ-পদবি দেওয়ার নামে যেমন অর্থ বাণিজ্য করেছেন তেমনি নানা তদবির, টেন্ডার বাণিজ্যে, বড় বড় কাজ বাগিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছেন শত কোটি টাকা। ঢাকায় হানিফের পক্ষে তদবির বাণিজ্য দেখাশোনা করতেন কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগের দুই সাবেক সভাপতি শেখ হাসান মেহেদী ও মাজহারুল আলম সুমন। এছাড়াও হানিফের দুই পিএস-এপিএস রাজু ও টুটুল হানিফের হয়ে দেশব্যাপী নানা দেনদরবার ও তদবির বাণিজ্যের দেখভাল করতেন। হানিফের পাশাপাশি এই চারজনও গাড়ি-বাড়ি, ফ্ল্যাটসহ কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। হানিফের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম কোয়েষ্ট ইন্টারন্যাশনাল। কারওয়ান বাজারে বিএমটিসি ভবনে তার ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক অফিস।

সেই অফিস ও কুষ্টিয়ার বাসায় বসেই সব কিছু একহাতে নিয়ন্ত্রণ করতেন হানিফ। সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনে হানিফ তার হলফনামায় আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবসা উল্লেখ করেন। সর্বশেষ স্ত্রীর নামে কুষ্টিয়ায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে লাইসেন্স নেন। লালন কলা বিশ্ববিদ্যালয় নামে কার্যক্রম শুরু করেছেন জেলা পরিষদের নবনির্মিত ভবনে। জেলা পরিষদ সূত্র জানায়, গত বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে ৭ম ও ৮ম তলা ভাড়া নেওয়া হয়। মাসিক ভাড়া চার লক্ষ টাকা। আর জামানত বাবদ এককালীন প্রদান করা হয় ৫০ লক্ষ টাকা। শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা শেষ হলেও পট পরিবর্তনের কারণে এখনও শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়নি। ৫ আগস্টের পর খোলস পাল্টে বিশ্ববিদ্যালয়টি চালু করার জন্য হানিফ তার স্ত্রী ফৌজিয়া আলমকে ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে চেয়ারম্যান পদে বসিয়েছেন হেলথকেয়ার ফার্মার সিইও হানিফের ব্যবসায়িক পার্টনার হালিমুজ্জামানকে। এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়টি সাজাতে এবং অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম চালু করার জন্য কয়েক কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে হানিফের আরও কয়েকজন যে অংশীদার (পার্টনার) রয়েছেন তাদের মধ্যে কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ অজয় কুমার সুরেকা, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অনুপ কুমার নন্দী অন্যতম। দলের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রাজনীতিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে গত সাড়ে ১৫ বছরে শতশত কোটি টাকা কামিয়ে নিয়েছেন হানিফ। এসব টাকার বড় অংশ পাচার করেছেন কানাডাসহ কয়েকটি দেশে। শহরের হাউজিংয়ে ৫ কাঠার প্লটের ওপর ৭তলা বাড়ি নির্মাণ করা হয় কয়েক বছর আগে।

প্রতি তলায় ৪টি করে ফ্ল্যাট আছে। হাউজিং এলাকার বাসিন্দা আনিসুর রহমান বলেন, হাউজিং এর জমির সঙ্গে স্থানীয় একজনের জমি দখল করে এ বাড়ি নির্মাণ করা হয় কয়েক বছর আগে। আতার নামে হলেও পেছনে ছিলেন হানিফ। লোকজনের চোখ এড়াতেই হানিফ এ বাড়ি আতার নামে করেছেন বলে মনে করেন স্থানীয়রা। এসব ফ্ল্যাট সজ্জিত করতে দেশের বাইরে থেকে টাইলসসহ ফিটিংসের মালামাল আনা হয়। পিটিআই রোডে ৪ কাঠা জমির ওপর তিনতলা বাড়ি নির্মাণ করেন হানিফ। কাগজে-কলমে আতা ও তার স্ত্রীর নামে হলেও হানিফের অর্থে এ বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান। প্রথম দিকে লালন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইনবোর্ড এ বাড়িতে লাগানো হয়। আতার সম্পদ নিয়ে দুদক অনুসন্ধান করার পর সাইনবোর্ড সরিয়ে ফেলা হয়। এছাড়া ঢাকা ও কুষ্টিয়ায় তাদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে, শেয়ার, ব্যাংক ডিপোজিট আছে। দল ও অন্য কয়েকটি সূত্র জানায়, হেলথ কেয়ারের সিইও হালিমুজ্জামান হানিফের ব্যবসায়িক পার্টনার। দেশের বাইরে একটি বড় রাষ্ট্রে হেলথ কেয়ারের বিনিয়োগ আছে। সেখানে হানিফের অর্থ লগ্নি করা আছে। একই সাথে কুষ্টিয়ার শীর্ষ ব্যবসায়ী অজয় সুরেকার সঙ্গে বিভিন্ন ব্যবসায়ী কোটি কোটি লগ্নি করা আছে হানিফের।

এসব কারণে অজয় সুরেকাকে জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ করেন হানিফ। এসব বিষয়ে কথা বলতে হালিমুজ্জামানের মোবাইলে কল দিলেও তা বন্ধ পাওয়া গেছে। আর অজয় সুরেকা হানিফের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেও আওয়ামী লীগে জোর করে পদ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন। এর বাইরে হানিফের সঙ্গে অন্য কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানান তিনি। হানিফের পরিবারের সদস্যরা কানাডায় থাকেন। সেখানে হানিফের মেজ ভাই ও বোনের স্বামী থাকেন। সূত্র জানিয়েছে, হানিফ স্ত্রী ফৌজিয়া আলমের নামে কোনো কিছু না কিনলেও ভাই ও বোনের নামে সম্পদ করেছেন। এর মধ্যে হানিফের টাকায় সে দেশে একটি গ্যাস স্টেশন করেছেন তার ভাই। এছাড়া বাড়ি আছে বোন ও ভাইয়ের নামে। বোনের স্বামী ও হানিফের টাকায় নানা ব্যবসা-বাণিজ্য করেন বলে জানা গেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, হানিফ দলের প্রভাব কাজে লাগিয়ে নদী খননের বড় বড় কাজ বাগিয়ে নিয়েছেন সারা দেশে। তার নিজের একাধিক ড্রেজার আছে। সর্বশেষ কুষ্টিয়ার মিরপুর ও ভেড়ামারায় পদ্মা নদী শাসনের জন্য ১ হাজার ৪৭০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প পাস হয়। কাজ ভাগাভাগি হয় হানিফের ঢাকার অফিসে বসে। সেখানে হানিফ একাই ৫০০ কোটি টাকার কাজ নিজের কব্জায় নিয়ে নেন।

এসব কাজ পরবর্তীতে বসিরের কাছে কমিশনে বিক্রি করে দেন। এ কাজ থেকে শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেন হানিফ। হানিফের সময় কুষ্টিয়ায় বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্পের কাজ হয়েছে। এর মধ্যে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রকল্প, কুষ্টিয়া শহর ফোর লেন সড়ক প্রশস্তকরণ, কুষ্টিয়া বাইপাস সড়ক নির্মাণ, শেখ রাসেল কুষ্টিয়া-হরিপুর সেতু নির্মাণ, মুজিবনগর সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্প। এছাড়া সম্প্রতি পদ্মা নদী শাসনে বড় একটি প্রকল্পের টেন্ডার হয়েছে। এসব প্রকল্পের প্রতিটি থেকেই হানিফ আগাম বাগিয়ে নেন কোটি কোটি টাকার কমিশন। প্রতিটি প্রকল্প থেকে শতকরা ১০ থেকে ১৫ ভাগ কমিশন আদায় করতেন হানিফ ও আতা। তার বাসায় বসে এসব ভাগাভাগি হতো। সেখানে সরকারি কর্মকর্তারা রাতে গিয়ে অর্থ দিয়ে আসতেন। এছাড়া নিয়োগ বাণিজ্য, বালু ঘাটের কমিশনসহ অন্যান্য কাজ থেকে যে আয় হতো তা হানিফ চাচাতো ভাই আতাউর রহমান আতার মাধ্যমে সংগ্রহ করতেন। সেই টাকা আতা নিজে হানিফের কাছে পৌঁছে দিতেন বলে জানান দলের নেতারা। এছাড়া হানিফের এপিএস জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আমজাদ হোসেন রাজুর ঢাকা-কুষ্টিয়ায় ব্যবসা ও ফ্ল্যাট আছে। তার সাথেও হানিফের ব্যবসা আছে।

সর্বশেষ কুষ্টিয়া মেডিকেলে যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে হানিফের পছন্দের প্রতিষ্ঠান। এখান থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন তিনি। কুষ্টিয়ার সব ঠিকাদারি কাজ, হাট-ঘাটের ইজারা, সরকারি-বেসরকারি অফিস আদালতে নিয়োগ, পদ্মা ও গড়াই নদীর বালু মহাল থেকে শুরু করে রেজিস্ট্রি অফিস, পাসপোর্ট ও বিআরটিএ অফিস ছাড়াও সব ক্ষেত্র থেকে হানিফের হয়ে কমিশন আদায় করতেন আতা। এমন কি আওয়ামী লীগ, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পদ বিক্রির অভিযোগও রয়েছে হানিফের বিরুদ্ধে। হানিফ কুষ্টিয়ার রাজনীতি ছাড়াও সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন। এমনকি স্কুল কমিটির সভাপতি কে হবে সেটাও নির্ধারণ করে দিতেন হানিফ ও আতা। স্থানীয় রাজনীতিতে হানিফ-আতার আধিপত্য-হানিফ এমপি হলেও মন্ত্রীর থেকে বেশি প্রটোকল পেতেন। কুষ্টিয়ায় আসলে সামনে ও পেছনে থাকতো পুলিশের ভ্যান। এছাড়াও স্পেশাল সিকিউরিটি পেতেন তিনি। হানিফ কুষ্টিয়ায় আসলে ঘিরে থাকতেন ব্যবসায়ীদের একটি দল। তাদের কারণে দলীয় নেতা-কর্মীরা কথা বলার মতো সুযোগও পেতেন না। দলের নেতাদের বাদ দিয়ে তিনি বিএনপি-জামায়াতপন্থি ব্যবসায়ী ও নেতাদের সঙ্গে আঁতাত করে তাদের কাছে ভেড়ান। তাদের মাধ্যমে সিন্ডিকেট করে সব প্রতিষ্ঠান থেকে লুটে নেন কোটি টাকা। বিশেষ করে খাজানগর এলাকার তিনজন চালকল মালিকের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এর মধ্যে ফ্রেস এগ্রো ফুড, দেশ এগ্রোফুড, মেসার্স সুবর্না অটো মিলের মালিকের সাথে তার দহরম ছিল বেশি। একই সাথে কুষ্টিয়ায় খাদ্য সংগ্রহ থেকে কোটি কোটি টাকা লুটে নেওয়া হয়েছে বিগত ১৬ বছরে।

এ টাকার বড় একটি অংশ দিয়ে কুষ্টিয়া শহরের এনএস রোডে আওয়ামী লীগের দলীয় অফিস নির্মাণ করেন হানিফ। এছাড়া কুষ্টিয়া শহরের ফোর লেন সড়ক নির্মাণ কাজের একটি প্যাকেজ হানিফের পার্টনার স্প্রেকটা লিমিটেড নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এ লাইসেন্সে হানিফ নিজেই কাজ করেন। এছাড়া মুজিব নগর সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্প থেকে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শত শত কোটি কোটি টাকার ভাগ বাটোয়ারা হয়েছে। সব কাজ ভাগাভাগি করেছেন হানিফ ও তার ভাই আতাসহ আওয়ামী লীগের নেতারা। মুজিব নগর সমন্বিত প্রকল্পের প্রকৌশলীরা জানান, টেন্ডারে বেশির ভাগ কাজ নিতেন আতা। হানিফের নির্দেশে তাকে বড় বড় কাজ দিতে হয়েছে। হানিফের অত্যাচার নির্যাতন থেকে আওয়ামী লীগের নেতারা যেমন বাদ যায়নি তেমনি বিএনপি-জামায়াত নেতা-কর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন চালিয়ে তার বাহিনী দিয়ে। জেলা যুবদল নেতা আল আমিন কানাই বলেন, গত নির্বাচনের আগে কাউন্সিলর কৌশিক আহম্মেদ বিচ্চু আমার বাসায় গিয়ে জানায়, হানিফের ভাই আতা সাহেব আপনার সঙ্গে চা খাবেন। আমি বলি এত বড় নেতার সাথে চা খাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এরপর থেকে তারা আমার বাড়িতে মাস্তান পাঠিয়ে হেনস্তা করে, আমার নামে একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করেছে। পরে আমি ব্রেইন স্ট্রোক করি। মানসিক ও শারীরিকভাবে তারা আমাকেসহ দলের বহু নেতাকে গত ১৬ বছরে শেষ করে দিয়েছে।

হানিফ-আতার বশ্যতা স্বীকার না করার কারণে গত বছর হানিফ-আতার ক্যাডার বাহিনীর হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হন কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হাফিজ শেখ চ্যালেঞ্জ। নির্যাতনের পর থেকে এক প্রকার পঙ্গুত্ব বরণের পথে এই ছাত্রলীগ নেতা। সম্প্রতি কুষ্টিয়ায় বাড়ি প্রবাসী ছাত্রলীগের সাবেক নেতা খন্দকার মাহতাবুল হক জয় তার নিজের ফেসবুকে লিখেছেন, ‘সুইপার থেকে সুপারস্টার সবকিছুর টাকা তার পেটে, আমরা ত্যাগী ও প্রবীণ, সকল দলের সাথে আমাদের সৌহার্দ্য। আওয়ামী লীগ করি, আওয়ামী লীগ করব কিন্তু হানিফ ও আতা কুষ্টিয়া শহর সদরের রাজনীতিতে যদি কোনোদিন ফিরে তাহলে ঐদিন আদর্শকে কোরবানি দিব’। সাংবাদিক নির্যাতন-হানিফের নামে নিউজ করে মামলা ও হামলার শিকার হয়েছেন বেশ কয়েকজন সাংবাদিক। মামলা দিয়ে জেলে পাঠান দৈনিক যুগান্তর প্রতিনিধি এএম জুবায়েদ রিপন, বাংলাভিশনের জেলা প্রতিনিধি হাসান আলী, মওদুদ রানাকে (বর্তমানে সময় টিভি রাজশাহীতে কাজ করেন)। সেসময় তিনি যমুনা টিভিতে কর্মরত ছিলেন। এর বাইরে মুন্সী শাহিন আহম্মেদ জুয়েল ও অঞ্জন শুভ নামের দুই সাংবাদিক হানিফের রোষানলে পড়ে মিথ্যা মামলায় কারাগারে যান। এছাড়াও কলকাঠি নেড়ে অনেকেরই ঢাকার মিডিয়ার চাকরি খেয়েছেন। গত ৫ আগস্টের পর হানিফ ও আতাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের নামে হত্যাসহ একাধিক মামলা হয়েছে।

গা ঢাকা দিয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ অধিকাংশ নেতা। জেলা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সাথে কথা হয় বর্তমান পরিস্থিতি ও হানিফ এবং আতার বিষয়ে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা আওয়ামী লীগের কয়েক জন নেতা বলেন, ‘হানিফ-আতা রাজনীতি করার জন্য কুষ্টিয়ায় আসেনি। এসেছিলেন বাণিজ্য করার জন্য। তার সময় দল যেমন ধ্বংস হয়েছে তেমনি বিএনপি ও অন্য দলের গুটিকয়েক নেতা ও ব্যবসায়ী কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। এদের মাধ্যমে হানিফ-আতা সিন্ডিকেট করে সব কাজ থেকে টাকা নিয়ে গেছেন। দুই ভাই মিলে দেশের বাইরে টাকা পাচার করেছেন, গাড়ি ও বাড়ি করেছেন সেখানে। নেতা-কর্মীরাও তার হাত থেকে রেহাই পায়নি। কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ডা. আমিনুল হক রতন বলেন, হানিফ-আতা এই দুই ভাইয়ের কারণে কুষ্টিয়ার রাজনীতি ধ্বংস হয়ে গেছে। একক আধিপত্য বিস্তার করে আওয়ামী লীগের আদর্শ থেকে তারা বিচ্যুত হয়েছিল। এদিকে কুষ্টিয়ায় বাড়ি প্রবাসী নেতা খন্দকার মাহতাবুল হক জয় তার নিজের ফেসবুকে লিখেছেন, ‘সুইপার থেকে সুপারস্টার সবকিছুর টাকা তার পেটে, আমরা ত্যাগী ও প্রবীণ, সকল দলের সাথে আমাদের সৌহার্দ্য। আওয়ামী লীগ করি আওয়ামী লীগ করব কিন্তু হানিফ ও আতা কুষ্টিয়া শহর সদরের রাজনীতিতে যদি কোনোদিন ফিরে তাহলে ওই দিন আদর্শকে কোরবানি দিব’।

 

হানিফ-আতার উত্থানের গল্প

 

নিজ সংবাদ ॥ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে প্রভাবশালী কয়েকজন নেতার মধ্যে অন্যতম মাহবুবউল আলম হানিফ। কুষ্টিয়ার স্থানীয় রাজনীতিতে চরম আতঙ্কের আরেক নাম তার দূর সম্পর্কের চাচাতো ভাই আতাউর রহমান আতা। স্থানীয় রাজনীতি থেকে শুরু করে প্রশাসনের সর্বস্তরেই হানিফ আর আতার কথাই ছিল শেষ কথা। এই দুজনের ইশারা ছাড়া কুষ্টিয়ায় যেন একটি গাছের পাতাও নড়তো না। তাদের বিরুদ্ধে এতদিন কারও টুঁ শব্দ করার সাহস ছিল না। পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আত্মীয়তার সুবাদেই হানিফের উত্থান। নিজের সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে হানিফই তৈরি করেছেন আতার মতো অনুসারী। কুষ্টিয়ার রাজনীতিতে দুজনরই উত্থান বিস্ময়কর। রূপকথাকেও যেন হার মানায় তাদের সেই গল্প। হানিফের বড় ভাই সাবেক সচিব রশিদুল আলম আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার পরিবারের জামাই। হাসিনার ফুফাতো বোনের সঙ্গে রশিদুল আলমের বিয়ে হয়। সম্পর্কের সূত্র ধরে শেখ হাসিনার বেয়াই হন হানিফ। আত্মীয়তার এ সম্পর্কই হানিফের উত্থানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। এক সময় কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ছিলেন হানিফ। ১৯৯৬ সালে কুষ্টিয়া-২ আসন থেকে মনোনয়ন পান হানিফ। তবে পরাজিত হন।

এরপর আরও কয়েকবার দলীয় মনোনয়ন পেলেও জয় লাভ করতে পারেননি। ২০০৮ সালে মহাজোট গঠনের পর মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হন হানিফ। ওই আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয় ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে। মনোনয়নবঞ্চিত হওয়ার কারণে দল ক্ষমতায় এলে তাকে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী করা হয়। ২০১৩ সালের নির্বাচনে কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসন থেকে মনোনয়ন পেয়ে এমপি নির্বাচিত হন হানিফ। শেখ হাসিনার সঙ্গে আত্মীয়তার সুবাদে পরে কাউন্সিলে পেয়ে যান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের মতো শীর্ষ পদ। এরপর হানিফকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। দলের পদ ভাঙিয়ে গড়ে তোলেন বিশাল সাম্রাজ্য। বাড়তে থাকে তার প্রভাব-প্রতিপত্তি। দলে তার অবস্থান আরও পাকাপোক্ত হয় একাধিকবার একই পদ পেয়ে যাওয়ার কারণে। তবে মন্ত্রী হওয়ার খায়েশ থাকলেও সে আশা পূরণ হয়নি নানান অপকর্মের কারণে। রাজনীতির আড়ালে অর্থ আয় ছিল তার নেশা। তিনি দলের নেতাকর্মীদের পাত্তা না দিলেও বড় বড় ব্যবসায়ীর সঙ্গে আঁতাত করে চলতেন। কুষ্টিয়ায়ও দলীয় নেতাকর্মীদের প্রাধান্য না দিয়ে সব সময় চলতেন বড় বড় ব্যবসায়ী আর টাকাওয়ালাদের সঙ্গে। এভাবে গত সাড়ে ১৫ বছরে অগাধ সম্পদের মালিক বনে গেছেন হানিফ। হানিফের পুরো পরিবার থাকে কানাডায়। হানিফের বড় ভাই সাবেক সচিব রশিদুল আলম আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার পরিবারের জামাই। শেখ হাসিনার ফুফাতো বোনের সঙ্গে রশিদুল আলমের বিয়ে হয়। সম্পর্কের সূত্র ধরে শেখ হাসিনার বেয়াই হন হানিফ। আত্মীয়তার এই সম্পর্কই হানিফের উত্থানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। শেখ হাসিনার সঙ্গে আত্মীয়তার সুবাদে পরে পেয়ে যান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের মতো শীর্ষ পদ।

এরপর হানিফকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হানিফ ও তার স্ত্রী ফৌজিয়া আলমের নামে কানাডার নাগরিকত্ব রয়েছে। দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা সত্ত্বেও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পান হানিফ। এমনকি এ বিষয়ে অভিযোগ করা হলেও আমলে নেয়নি নির্বাচন কমিশন। কানাডায় হানিফের টাকায় তার কয়েকজন ভাই ও বোনের নামে বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে। সেখানে হানিফের গাড়ি-বাড়িসহ সম্পদ আছে বলে জানা গেছে। আতাউর রহমান আতা কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার ষোলদাগ গ্রামের প্রয়াত আব্দুস সাত্তারের ছেলে। আব্দুস সাত্তার আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফের বাবা আফসার আলীর চাচাতো ভাই। সেই সূত্রে হানিফ আর আতা চাচাতো ভাই। ২০১৩ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনে থেকে অংশগ্রহণের জন্য শহরের পিটিআই রোডে জায়গা কিনে তিনতলা আলিশান বাড়ি তৈরি করেন হানিফ। জেলা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আতা ২০১২ সালের আগ পর্যন্ত ভেড়ামারায়ই ছিলেন। সেখানে উল্লেখ করার মতো তেমন কিছুই করতেন না তিনি। তখন তার নামও কুষ্টিয়ার কেউই জানতো না। ২০১২ সালে ভেড়ামারা থেকে আতাকে কুষ্টিয়ায় নিয়ে আসেন হানিফ। পিটিআই রোডের ওই বাড়িতে জায়গা হয় আতার। এরপর থেকে আতাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। আওয়ামী লীগের ১৫ বছরে যেন আলাদীনের চেরাগ পেয়েছিলেন আতা। অল্প সময়ের মধ্যেই আঙুল ফুলে কলা গাছ বনে যান আতা। ভাই হানিফ ও দলের প্রভাব খাটিয়ে বিগত প্রায় সাড়ে ১৫ বছরে শুধু সম্পদই অর্জন করেছেন আতা। কোনো দিক না তাকিয়ে বাছ-বিচার ছাড়াই দুই হাতে অর্থ কামিয়ে গেছেন।

এমনকি দলীয় নেতাদের অনেকেই মনে করেন হানিফের সম্পদ থেকেও আতার সম্পদের পরিমাণ অনেক বেশি। নেতাকর্মীদের মতে, হানিফের পর আতা ছিলেন কুষ্টিয়ায় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে দ্বিতীয় ব্যক্তি। শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এবং সদর আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হানিফের চাচাতো ভাই ও এমপি হানিফের স্থানীয় প্রতিনিধি- এসব পরিচয় আতার জন্য স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করাকে সহজ করে দেয়। দিন দিন বাড়তে থাকে তার প্রভাব, দলীয় নেতাকর্মীরাও আসতে থাকেন তার কাছে। অল্প দিনেই শহর ও সদরের রাজনীতিতে তৈরি করেন নিজস্ব বলয়। ২০১২ সালে ভেড়ামারা থেকে আতাকে কুষ্টিয়ায় নিয়ে আসেন হানিফ। পিটিআই রোডের ওই বাড়িতে ওঠানো হয় আতাকে। এরপর থেকে আতাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। আওয়ামী লীগের ১৫ বছরে যেন আলাদীনের চেরাগ পেয়েছিলেন আতা। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই আঙুল ফুলে কলা গাছ বনে যান তিনি। ভাই হানিফ ও দলের প্রভাব খাটিয়ে বিগত প্রায় সাড়ে ১৫ বছরে শুধু সম্পদই অর্জন করেছেন আতা। কোনো দিক না তাকিয়ে বাছ-বিচার ছাড়াই দুই হাতে অর্থ কামিয়েছেন।

এমনকি দলীয় নেতাদের অনেকেই মনে করেন হানিফের সম্পদ থেকেও আতার সম্পদের পরিমাণ অনেক বেশি। অভিযোগ আছে, পুরো জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিই নিয়ন্ত্রণ করতেন দুই ভাই মিলে। সব সরকারি দপ্তরের ঠিকাদারি কাজও ছিল তাদের নিয়ন্ত্রণে। এভাবে আতা জিরো থেকে বনে গেছেন শত শত কোটি টাকার মালিক। একসময় একটি মোটরসাইকেলে চড়লেও এখন তার কোটি টাকার একাধিক গাড়ি। স্ত্রী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হলেও স্বামীর টাকায় তিনিও কোটিপতি। ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও বাড়ি আছে আতার। হানিফ দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হওয়ায় আতা ছিল সবার কাছে আতঙ্কের। দলমত নির্বিশেষে সবাই আতাকে সামলে চলতেন। বিচার-সালিশ থেকে সব খানে আতার কথাই ছিল শেষ কথা। বিএনপির কয়েকজন নেতা ছিল আতার ঘনিষ্ঠ। তাদের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতেন। এমনকি সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনের আগে হানিফের ভোটের কথা বলেও কোটি কোটি টাকা নেওয়া হয়। দলের নেতারা বলেন, কোরবানির আগে গরু ও ছাগলও আসত উপহার হিসেবে। দেশ ছাড়াও দেশের বাইরে আতার সম্পদ ও অর্থ আছে বলে শোনা যায়। আতা বাড়িতে থাকলেও সব সময় পাহারা থাকতো। বাইরে বের হলে গাড়ি আগে-পিছে বহর নিয়ে বেড়াতেন। দলের পদ-পদবি ও টেন্ডারে কাজ পেতে আতার কাছে ধরনা দিতে হতো সবাইকে। তার অত্যাচার-নির্যাতনে দল ছেড়েছেন অনেকে।

এমনকি ঠিকাদারি কাজও ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন বেশ কয়েকজন। অবৈধ বালুঘাট, হাট-বাজার, বিল ও বাঁওড় নিয়ন্ত্রণ করতেন আতা। হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর আতা সপরিবারে গাঢাকা দেন। তার বাড়ি লুটপাট হয়ে গেছে। একই অবস্থা হানিফের বাড়িরও। আতার স্ত্রীর নামে অবৈধ সম্পদের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন মামলা করেছে। তার অবৈধ সম্পদ অর্জন নিয়ে অনুসন্ধান শেষ পর্যায়ে। যে কোনো সময় মামলা হতে পারে বলে জানা গেছে। এরপর অর্থ-বিত্তে-সম্পদে ফুলে ফেঁপে ওঠেন আতাউর রহমান আতা। ২০২২ সালে আতার বিপুল অবৈধ সম্পদের ফিরিস্তি তুলে ধরে দুদকে একটি অভিযোগ জমা পড়ে। এতে বলা হয়, ১০ বছরের ব্যবধানে ভাই হানিফের প্রভাব আর আওয়ামী লীগের পদ-পদবি ব্যবহার করে বাড়ি-গাড়িসহ এক হাজার ১০০ কোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে গেছেন আতা। এই অভিযোগ ওঠার পর ২০২২ সালে দুদক আতার অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান শুরু করে। চার্জশিট দাখিল করলেও হানিফের প্রভাবের কারণে স্ত্রীসহ বহাল তবিয়তে ছিলেন আতা।

হানিফ ও তার স্ত্রী ফৌজিয়া আলমের নামে কানাডার নাগরিকত্ব রয়েছে। দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা সত্ত্বেও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পান হানিফ। এমনকি এ বিষয়ে অভিযোগ করা হলেও আমলে নেয়নি নির্বাচন কমিশন। কানাডায় হানিফের টাকায় তার কয়েকজন ভাই ও বোনের নামে বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে। সেখানে হানিফের গাড়ি-বাড়িসহ সম্পদ আছে বলে জানা গেছে। পুরো জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিই হানিফ নিয়ন্ত্রণ করতেন আতার মাধ্যমে। দুই ভাই মিলে জেলার রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন। সব সরকারি দপ্তরের ঠিকাদারি কাজও ছিল তাদের নিয়ন্ত্রণে। এভাবে আতা জিরো থেকে বনে গেছেন শত শত কোটি টাকার মালিক। একসময় একটি মোটরসাইকেলে চড়লেও এখন তার কোটি টাকার দামি গাড়ি আছে। স্ত্রী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হলেও স্বামীর টাকায় তিনিও কোটিপতি। ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও বাড়ি আছে আতার। আতা জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ কুষ্টিয়া অফিস থেকে সাড়ে ৫ কাঠার প্লট বাগিয়ে নিয়েছেন। শহরের হাউজিং এলাকায় ওই জমিতে সাততলা আলিশান ভবন নির্মাণ করেন। স্কুলশিক্ষিকা স্ত্রীর নামে তিনি ওই সম্পদ করেছেন। এখানে বিনিয়োগের ব্যাপারে আয়কর নথিতে দেখানো হয়েছে মাত্র ৭৫ লাখ টাকা। অথচ ভবন করতেই খরচ হয়েছে ৫ থেকে ৬ কোটি টাকা বলে আতা ঘনিষ্ঠ এক আওয়ামী লীগ নেতা দাবি করেন। এছাড়া কুষ্টিয়া হাইস্কুল মার্কেটে ১২টি, পরিমল টাওয়ারে দুটি ছাড়াও জেলা পরিষদ মার্কেট, সমবায় মার্কেটসহ বিভিন্ন মার্কেটে তার একাধিক দোকান আছে। শহরের বটতৈল এলাকায় জেলা পরিষদ মার্কেটের আটটি দোকান নিজ ও স্ত্রীর নামে বরাদ্দ নিয়েছেন। একই মার্কেটে আরও চারটি দোকান আত্মীয়-স্বজনের নামে বরাদ্দ নিয়েছেন। ভেড়ামারায় ২৫ বিঘা জমি কিনে বাগান করেছেন।

এছাড়া ২৪ শতাংশ জমি রয়েছে আতার। তমিজ উদ্দিন মার্কেটের একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, কুষ্টিয়া হাইস্কুল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পানির দরে ১২টি দোকান নিজের নামে নিয়ে নেন আতা। এসব দোকান ভাড়া দেওয়া আছে। একইভাবে বটতৈল জেলা পরিষদ মার্কেটে সব থেকে বেশি দোকান বাগিয়ে নেন আতা। সেখানেও তার নামে আটটি দোকান আছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। একইভাবে শহরের যেখানেই মার্কেট হয়েছে সেখানেই দোকান দিতে হয়েছে আতাকে। জেলা পরিষদ, পরিমল টাওয়ার, সমবায় মার্কেটেও একাধিক দোকান আছে তার। এসব দোকান প্রভাব খাটিয়ে নিজের ও আত্মীয়-স্বজনদের নামে নিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা বলেন, ‘হানিফ-আতা রাজনীতি করার জন্য কুষ্টিয়ায় আসেনি। এসেছিলেন বাণিজ্য করার জন্য। তার সময় দল যেমন ধ্বংস হয়েছে তেমনি বিএনপি ও অন্য দলের গুটিকয়েক নেতা ও ব্যবসায়ী কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। এদের মাধ্যমে হানিফ-আতা সিন্ডিকেট করে সব কাজ থেকে টাকা নিয়ে গেছেন।

দুই ভাই মিলে দেশের বাইরে টাকা পাচার করেছেন, গাড়ি ও বাড়ি করেছেন সেখানে। নেতাকর্মীরাও তার হাত থেকে রেহাই পাননি। হাউজিং এলাকার আনিসুর রহমান বলেন, হাউজিংয়ের জমির সঙ্গে স্থানীয় একজনের জমি দখল করে এ বাড়ি নির্মাণ করা হয় কয়েক বছর আগে। আতার নামে হলেও পেছনে ছিলেন হানিফ। লোকজনের চোখ এড়াতেই হানিফ এ বাড়ি আতার নামে করেছেন। এসব ফ্ল্যাট সজ্জিত করতে দেশের বাইরে থেকে টাইলসসহ ফিটিংসের মালামাল আনা হয়। পিটিআই রোডে চার কাঠা জমির ওপর তিনতলা বাড়ি নির্মাণ করেন হানিফ। কাগজে-কলমে আতা ও তার স্ত্রীর নামে হলেও হানিফের অর্থে এ বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান। প্রথম দিকে লালন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইনবোর্ড এ বাড়িতে লাগানো হয়। আতার সম্পদ নিয়ে দুদক অনুসন্ধান করার পর সাইনবোর্ড সরিয়ে ফেলা হয়।