দৌলতপুর প্রতিরিধি ॥ কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সাবরেজিস্টার অফিস দখল করে চাঁদাবাজি, চাঁদার টাকা ভাগাভাগি ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। তাদেরকে উদ্ধার করে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গতকাল বুধবার (৪ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টার দৌলতপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
আহতরা হলেন- উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক জাফর ইকবাল কর্নেল, উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রতন, দৌলতপুর কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক তৌফিক আহমেদ, ছাত্রদলের নেতা পারভেজ। তারা দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এছাড়াও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই। ঘুষ, অনিয়ম-দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে সরকারি এই কার্যালয়টি। উপজেলার সবখানে ঘুষ-দুর্নীতির আখড়াখানা নামে পরিচিতি ছড়িয়েছে।
দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন সেবা প্রত্যাশীরা। দলিল লেখক সমিতির লোকজন, স্ট্যাম্প ভেণ্ডারের মালিকরা ও স্থানীয় কিছু আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত একটি চক্রটি রমরমা ঘুষ বাণিজ্য করে আসছিল দীর্ঘদিন ধরে। ঘুষের টাকার ভাগ সাব-রেজিস্ট্রার, আওয়ামী লীগের নেতাদের পকেটে চলে যেত। এদিকে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের পরই এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে রয়েছেন সাবরেজিস্টার অফিস নিয়ন্ত্রণ করা আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতারা। বর্তমানে তাদের সম্পর্কে কেউ কোনো তথ্যও দিতে পারছেন না।
তারা এখন কোথায়, কিভাবে, কোন অবস্থানে রয়েছে তা জানে না কেউ। তারা এলাকা ছেলে পালানোর পর পরই বিএনপির একটা গ্রুপ সাব রেজিস্টার অফিস দখলে নেন এবং চাঁদাবাজি শুরু করেন। এই পরিস্থিতিতে সাবরেজিস্টার অফিস দখল করে চাঁদাবাজি, চাঁদার টাকা ভাগাভাগি ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিএনপির অপর একটা গ্রুপ তৈরি হয়। বিএনপির এই দুই গ্রুপের মধ্যে বুধবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে দুই গ্রুপের অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সরকারি নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে দলিল রেজিষ্ট্রি করে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে চক্রটি হাতিয়ে নিচ্ছিলেন লাখ লাখ টাকা। সাব-রেজিস্ট্রার ও দালাল চক্রের মাধ্যমে বাধ্যতামূলকভাবে প্রতি দলিল রেজিস্ট্রি করার জন্য অতিরিক্ত ২৫০০ টাকা আদায় করা হয়। নামের ভুল থাকলে ঘুষ দিতে হয়। পরিচয়পত্র অনলাইন থেকে প্রিন্ট করাতে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা দিতে হয়। দলিলের দাম বেশি নেয়া হয় ও প্রতিটি সেবার জন্য পদে পদে ঘুষ দিতে হয়। বছরের পর বছর ধরে এভাবেই আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত চক্রটি চাঁদাবাজি করে আসছিল।
তারা এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যাওয়ার পর থেকে বিএনপি দখলে নিয়ে চাঁদাবাজি শুরু করে। কয়েকদিন ধরে বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে সাবরেজিস্টার অফিস দখলসহ চাঁদাবাজির ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। এ নিয়ে আতঙ্কে ছিলেন স্থানীয়রা। এমন পরিস্থিতিতে বুধবার দুই গ্রুপের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পরে পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিত নিয়ন্ত্রণে আনে। আহত কর্নেল, রতন, তৌফিক ও পারভেজ বলেন, দৌলতপুর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের দুর্নীতি অনিয়মের ব্যাপারে আমরা প্রতিবাদ করেছিলাম। গত ১৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে গঠিত দালাল চক্র এই সাব রেজিস্টার অফিসে দুর্নীতি অনিয়ম ও চাঁদাবাজি করতো।
৫ আগস্ট নতুন করে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগের সেসব নেতাকর্মীরা আত্মগোপনে চলে যায়। এখন বিএনপির একটা পক্ষ চাঁদাবাজির করে আসছিল। আমরা প্রতিবাদ করায় প্রতিপক্ষের লোকজন ক্ষিপ্ত হয়ে আমাদের উপর হামলা করে গুরুতর আহত করেছে। এবিষয়ে দৌলতপুর সাব-রেজিস্ট্রার আনোয়ার হোসেন ও বিএনপির নেতাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তারা ফোন রিসিভ করেন নি।
এবিষয়ে দৌলতপুর বিএনপির সভাপতি রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা ওদের চাচা ভাতিজার পারিবারিক ঝামেলা এখানে দলীয় কোন বিষয় না তবে তারা সবাই বিএনপি করে। সংঘর্ষের কারন জানতে চাইলে তিনি বলেন মুঠোফোনে বলা সম্ভব না।বিষয়টি নিশ্চিত করে দৌলতপুর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহাবুবুর রহমান বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। এখনো কেউ অভিযোগ করেনি। অভিযোগ দিলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
