দৌলতপুর প্রতিনিধি ॥ দীর্ঘ প্রায় চার দশকের নিরলস সাধনা, অগণিত শিক্ষার্থীর স্বপ্নদ্রষ্টা এবং নিষ্ঠার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি মোঃ আশরাফুল ইসলাম আজ রোববার (১ মার্চ) সরকারি চাকরির আনুষ্ঠানিক ইতি টানছেন। কুষ্টিয়া দৌলতপুর উপজেলার আদাবাড়িয়া ইউনিয়নের ৮০ নং গরুড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে তাঁর গৌরবোজ্জ্বল কর্মজীবনের শেষ দিন। কোনো আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠান নয়, বরং পবিত্র রমজানের সংযম আর আগামী প্রজন্মের জন্য ‘স্মারক বৃক্ষ’ রোপণের মধ্য দিয়েই তিনি বিদায় নিচ্ছেন তাঁর চিরচেনা প্রাঙ্গণ থেকে।
১৯৬৭ সালে ২ মার্চ কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়নের গোয়ালগ্রামে এক বংশীয় ও সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মোঃ আশরাফুল ইসলাম। তিনি মৃত মওলা বক্স বিশ্বাসের পুত্র। কিন্তু শৈশব থেকেই তাঁকে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। মাত্র ছয় মাস বয়সে তিনি মাতৃহারা হন। কৈশোরে, এইচএসসি পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে পিতাকেও হারান। এত অল্প বয়সে পিতা-মাতার স্নেহছায়া হারিয়েও তিনি ভেঙে পড়েননি; বরং প্রতিকূলতাকেই শক্তিতে রূপান্তর করে শিক্ষার পথেই অবিচল থেকেছেন
। আত্মবিশ্বাস, অধ্যবসায় ও নৈতিক দৃঢ়তাকে সঙ্গী করে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে। ভাইবোনদের মধ্যে তিনিই একমাত্র সরকারি চাকরিজীবী। ২০২২ সালে পবিত্র রমজান মাসে তাঁর বড় বোন ইন্তেকাল করেন। তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা নাটোর জেলার লালপুর উপজেলার বোয়ালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরবর্তীতে কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর উপজেলার ডি.জি.টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। পরবর্তীতে নাটোরের সালামপুর হাইস্কুল থেকে ১৯৮৩ সালে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি এবং আব্দুলপুর কলেজ থেকে ১৯৮৫ সালে এইচএসসি (বিজ্ঞান) সম্পন্ন করেন।
মেহেরপুর সরকারি কলেজে বিএসসি অধ্যয়নের পর ১৯৯০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রাজেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন। ২০০১-২০০২ শিক্ষাবর্ষে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে এমএ (প্রাইভেট) অধ্যয়ন করেন এবং পরবর্তীতে দারুল এহসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক স্টাডিজে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮৮ সালে ডি.জি.টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা। ১৯৯০ সাল থেকে ১২ জানুয়ারি ২০০৩ পর্যন্ত ডি.জি.টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়-সংলগ্ন রেজিস্টার্ড বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তীতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলে তিনি লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হন এবং ১৩ জানুয়ারি ২০০৩ তারিখে ৪৪ নং সামারভীলগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। একই বছরের ৩০ ডিসেম্বর বদলি হয়ে ৭৯ নং ধর্মদহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এবং ২০০৪ সালের ২৮ জানুয়ারি ৮০ নং গরুড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। এই প্রতিষ্ঠান থেকেই তিনি আজ অবসর গ্রহণ করছেন। ২০০৪ সালে গরুড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদানের পর সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ডেপুটেশনে কুষ্টিয়া পিটিআই-এ প্রশিক্ষণের জন্য মনোনীত হন।
২০০৪-২০০৫ শিক্ষাবর্ষে তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে সিইনএড (ঈ-রহ-ঊফ) কোর্স সম্পন্ন করেন, যা তাঁর পেশাগত দক্ষতা ও নেতৃত্বগুণকে আরও সুদৃঢ় করে। সরকারি চাকরিতে যোগদানের পূর্বে মাধ্যমিক ও বেসরকারি পর্যায়ে কর্মরত থাকাকালে গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ে তাঁর বিশেষ দক্ষতার জন্য তিনি শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতেন। তাঁর সান্নিধ্যে শিক্ষাগ্রহণ করে বহু শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করেছে এবং বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সুনামের সঙ্গে কর্মরত রয়েছে। কর্মজীবনের শেষ দিনে অফিসিয়াল নথিতে শেষ স্বাক্ষরটি করার সময় হয়ত আজ তার চোখের কোণে কিছুটা জল চিকচিক করবে, কিন্তুু মনে থাকবে এক প্রশান্তি।
আজ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তিনি কয়েকটি চারাগাছ রোপণ করবেন। এই বৃক্ষটি কেবল একটি গাছ নয়, বরং তাঁর চার দশকের শিক্ষকতা জীবনের এক জীবন্ত স্মারক এবং আগামী প্রজন্মের প্রতি তাঁর নীরব অঙ্গীকার। ব্যক্তিজীবনে তিনি দুই সন্তানের জনক। বড় সন্তান কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ থেকে ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগে এমএসসি প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছে এবং ছোট কন্যা বর্তমানে দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। সন্তানদের মাঝেও তিনি বপন করেছেন সেই নৈতিকতার বীজ, যা তিনি সারাজীবন শিক্ষার্থীদের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি শৃঙ্খলা, সততা, দায়িত্ববোধ ও পেশাগত নৈতিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
একজন শিক্ষক কখনোই প্রকৃত অর্থে অবসর নেন না। মোঃ আশরাফুল ইসলাম সরকারি নথিতে আজ থেকে ‘অবসরপ্রাপ্ত’, কিন্তু এলাকার হাজারো মানুষের হৃদয়ে তিনি চিরকাল ‘হেড স্যার’ হিসেবেই বেঁচে থাকবেন। তাঁর সততা, শৃঙ্খলা ও নৈতিক দৃঢ়তা আগামী দিনের শিক্ষকদের জন্য হয়ে থাকবে এক আলোকবর্তিকা। বিদায় বেলায় এলাকাবাসী ও সহকর্মীদের একটাই সুর—”মানুষ হিসেবে তিনি যেমন ছিলেন বটবৃক্ষের মতো ছায়াদানকারী, শিক্ষক হিসেবেও থেকে যাবেন আমাদের হৃদয়ের ধ্রুবতারা।”
