বিশেষ প্রতিনিধি ॥ প্ল্যাটফর্মের পুরোনো লাল ইটের দেয়াল আর জং ধরা সিগন্যাল বাতিগুলো এখনও যেন ১৮৬২ সালের সেই দিনটির কথা বলে। যখন এ দেশের মাটিতে প্রথম চাকা ঘুরিয়েছিল রেলগাড়ি। কুষ্টিয়া শহর থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই জগতি স্টেশন আজ এক বিস্মৃত ইতিহাসের ধারক; যেখানে একসময় ইঞ্জিনের বাঁশিতে মুখরিত হতো আকাশ-বাতাস, সেখানে আজ ভর করেছে শ্মশান নীরবতা।
বাংলাদেশের রেল ইতিহাসের প্রথম স্টেশন কুষ্টিয়ার জগতির ঐতিহ্যবাহী রেলস্টেশনটি এখন অচল হয়ে আছে। প্রতিদিন স্টেশনটির বুক চিরে দ্রুতগতিতে ট্রেন ছুটে গেলেও এই স্টেশনে নেই কোনো ট্রেনের গন্তব্য। রেল কর্তৃপক্ষের কাছে গুরুত্ব না পেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রেল হেরিটেজ স্টেশনটি আজ পরিত্যক্ত হয়ে রয়েছে। ব্রিটিশ শাসনামলে কলকাতার সঙ্গে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের যোগাযোগ সহজ করতে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর কলকাতা থেকে কুষ্টিয়ার জগতি পর্যন্ত ৫৩.১১ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথের সূচনা করে।
মূলত গড়াই নদীর তীরে অবস্থিত বাণিজ্যিক কেন্দ্র কুষ্টিয়ার গুরুত্ব বিবেচনা করেই জগতিকে দেশের প্রথম রেলস্টেশন হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল। কলকাতা থেকে যাত্রীরা আসতেন। এরপর নদীপথে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়তেন। জগতি স্টেশনের দোতলা মূল ভবনটি চুন-সুরকি আর লাল ইটের গাঁথুনিতে তৈরি ব্রিটিশ ধ্রুপদি স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন।
স্টেশনের সেই বিশাল পানির ট্যাঙ্কটি আজও ধ্বংসস্তূপের মতো দাঁড়িয়ে আছে; যা একসময় কয়লাচালিত ইঞ্জিনে পানি সরবরাহের প্রধান উৎস ছিল। আজ সেই জৌলুস বিলীন। ভবনের পলেস্তারা খসে পড়ছে, জানালার কপাট উধাও আর বিশাল এলাকা এখন আগাছা ও ঝোপঝাড়ে পূর্ণ। কোনো অংশ দখলে গেছে স্থানীয়দের আর বাকি সবখানেই অবহেলার ছাপ দৃশ্যমান।
প্রবীণ বাসিন্দা রহমান হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, ছোটবেলায় এখানে কত রমরমা অবস্থা দেখেছি। বড় বাবুরা নামতেন এই স্টেশনে। এখন সন্ধ্যার পর এখান দিয়ে হাঁটতে ভয় লাগে। স্থানীয় ব্যবসায়ী রায়হান আলী বলেন, ‘এই স্টেশনটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে কুষ্টিয়ার ব্যবসা-বাণিজ্য আরও চাঙ্গা হতো। বর্তমানে দু-একটি লোকাল ট্রেন ছাড়া কোনো বড় ট্রেন এখানে থামে না। আমরা বছরের পর বছর আন্দোলন করছি, কিন্তু শুধু আশ্বাসই পাই, কাজ হয় না।’
পাকশি রেলওয়ে বিভাগের ব্যবস্থাপক আবু হেনা মোস্তফা আলম বলেন, নতুন পরিকল্পনার তথ্য নেই। তবে স্টেশনটি দখল রোধে রেলওয়েম্যান দ্বারা নিয়মিত টহল দেওয়া হয়। বাংলাদেশের রেলের সূচনার সঠিক গল্পটা পৌঁছে দিতে জগতি স্টেশনের প্রাণ ফিরে পাওয়া এখন একান্ত প্রয়োজন। আমরা কি পারব গৌরবময় ইতিহাসকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে? উত্তরটা সময়ের কাছেই তোলা রইল।
