দুই বছরেই নষ্ট হয়েছে ৩৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়ক - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

দুই বছরেই নষ্ট হয়েছে ৩৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়ক

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: আগস্ট ২৮, ২০২৪

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ এক দফা সময় বাড়িয়ে ২০২২ সালে শেষ করা হয় কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়ক উন্নয়নকাজ। ১৬৮ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নে ব্যয় হয়েছে ৩৪৮ কোটি টাকা। তবে কাজ শেষের দুই বছরেই সড়কের যশোর ও ঝিনাইদহ অংশে ৫৪ কিলোমিটার নষ্ট হয়ে গেছে। যশোরের পালবাড়ী মোড় থেকে ঝিনাইদহের পাগলা কানাই পর্যন্ত সড়কে তৈরি হয়েছে গর্ত। এছাড়া শহরের মণিহার মোড় থেকে নওয়াপাড়ার রাজঘাট পর্যন্ত পুরোটাতেই রয়েছে ছোট-বড় গর্ত। এর মধ্যে যশোরে পাঁচ ও ঝিনাইদহ অংশে ১২ কিলোমিটার সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, মহাসড়কটি ভৌগোলিকভাবে এ অঞ্চলের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনকারী একমাত্র মহাসড়ক এটি। প্রতিদিন এ সড়ক দিয়ে খুলনা, ঢাকা, কুষ্টিয়াসহ আঞ্চলিক রুটের কয়েক হাজার যানবাহন চলাচল করে। খুলনা, কুষ্টিয়া ও যশোর অঞ্চলে শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। মোংলায় রয়েছে দেশের দ্বিতীয় সমুদ্রবন্দর। বেনাপোল স্থলবন্দর, দেশের প্রথম রেলপথ ও এশিয়ার সর্ববৃহৎ চিনিকলও রয়েছে এ অঞ্চলে।

এসব কারণে সড়কটি খুলনাঞ্চলের শিল্পোদ্যোক্তাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। মহাসড়কটির নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ। দপ্তরটির যশোর ও ঝিনাইদহ অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪-১৭ সালের মধ্যে ১৬৮ কিলোমিটার মহাসড়ক সংস্কার, পুনঃসংস্কার ও পুনর্নির্মাণের আওতায় বরাদ্দ হয় প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। সওজের বিভিন্ন জেলা অফিস নিজ নিজ অঞ্চলে এ কাজ বাস্তবায়ন করে। মহাসড়ক পুনর্র্নিমাণকাজ কোনো কোনো জেলায় এখনো চলমান। যশোর সওজ বিভাগ সূত্র বলছে, মহাসড়কের যশোর শহরের পালবাড়ী মোড় থেকে অভয়নগরের রাজঘাট পর্যন্ত ৩৮ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নকাজের অনুমোদন মেলে ২০১৭ সালে।

দরপত্রসহ সব প্রক্রিয়া শেষ করে কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের মে মাসে। এর মধ্যে পদ্মবিলা, রাজঘাট হয়ে চেঙ্গুটিয়া পর্যন্ত ১৯ কিলোমিটারের কাজ পায় তমা কনস্ট্রাকশন। বাকি ১৯ কিলোমিটারের কাজ পায় মাহবুব ব্রাদার্স। দুটি প্যাকেজে ৩২১ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালের জুনে। কার্যতালিকা অনুযায়ী প্রকল্পটির মেয়াদ ছিল তিন বছর। কিন্তু কভিডের কারণে মেয়াদ করা হয় ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। বর্ধিত সে সময়েও কাজ শেষ হয়নি।

পরে আবার প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। এতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪৮ কোটি টাকায়। তবে সড়কটি বুঝিয়ে দেয়ার এক মাসের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে ফুলে উঠতে শুরু করে। প্রকৌশলের ভাষায় এ সমস্যাকে রাটিং বলে। এক বছরের মধ্যে সড়কের প্রায় ১৬ কিলোমিটার এলাকায় রাটিংয়ের কারণে গর্ত সৃষ্টি হয়। সওজের তথ্যমতে, মহাসড়কের রাটিং সংস্কারের জন্য পিচের ওপর কংক্রিট রাস্তা নির্মাণে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে জুনে প্রস্তাব পাঠায় সওজ। এতে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ১৬০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে চার কিলোমিটার প্রথম পর্যায়ে কংক্রিট বা ঢালাই রাস্তা করার নির্দেশনা পায় সওজ।

এখন সে কাজ চলছে। কাজটি করছে মাহবুব ব্রাদার্স ও তমা কনস্ট্রাকশন। সড়কটির নির্মাণকাজের শুরুতেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। এলাকাবাসীর অভিযোগ ছিল সড়ক উন্নয়নকাজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কোনো নিয়মনীতি মানেনি। সড়কের পুরনো ইট ও খোয়া তুলে সেটাই আবার ভেঙে গর্তে ব্যবহার করেছে। এছাড়া সড়কে পাঁচ ফুট গর্ত করে ভিত তৈরির নির্দেশনা থাকলেও সে নিয়মও মানা হয়নি। নতুন ইট, বালি ও খোয়া ব্যবহারের কথা থাকলেও সড়কে খুঁড়ে পাওয়া ইট-বালি দিয়েই ফের ভরাট করা হয়েছে।

তবে তমা কনস্ট্রাকশনের সাব-ঠিকাদার সৈয়দ তরিকুল ইসলাম এসব অভিযোগ আমলে নেননি। তিনি বলেন, ‘কাজের মান নিয়ে সড়ক বিভাগ ও বুয়েট কোনো প্রশ্ন তুলতে পারেনি। মহাসড়কে ওভারলোডিংয়ের কারণে এ অবস্থা। সড়কের যে স্থানে রাটিং সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে নতুন করে বরাদ্দ হওয়া ঢালাইয়ের কাজও আমরাই করছি। সড়কের এ দুর্দশার দায় সবার বলে মনে করেন যশোর সওজ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, যারা সড়ক ব্যবহার করেন তাদের কতজন নিয়ম মানেন? ওভারলোডের কারণে সড়কটির এ অবস্থা। সড়ক বিভাগের এ কর্মকর্তা বলেন, ‘নতুন বরাদ্দে সড়কটির রাটিং হওয়া স্থানে বুয়েট ও সওজ বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী ১৬ কিলোমিটার ঢালাই করা হবে। এরই মধ্যে প্রথম ধাপে ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে চার কিলোমিটারের কাজ শুরু হয়েছে। ঢালাই শেষ হলে সড়কে যাতায়াতে সমস্যা হবে না বলে আশা করছি।