নিজ সংবাদ ॥ কুষ্টিয়া বিএনপির আহবায়ক কমিটিতে দলের নিবেদিত ত্যাগী নেতারা বাদ পড়লেও রাজকীয় উত্থান ঘটেছে হাইব্রিড নেতা শেখ সাদীর। দলের কোন আন্দোলন সংগ্রামে না থাকলেও ৩১ সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটিতে স্থান পেয়েছেন আলোচিত আওয়ামী এই ব্যবসায়ী। দলের বাঘা বাঘা নেতাকে পিছনে ফেলে হয়েছেন যুগ্ম আহ্বায়ক। অথচ এই কমিটিতে স্থান হয়নি দলের ত্যাগী এবং পরীক্ষিত নেতাদের। খোদ দলের নেতা-কর্মিরা অভিযোগ তুলেছেন ত্যাগী-নির্যাতিত ও পরীক্ষিত নেতাদের বাদ দিয়ে অথের্র বিনিময়ে মনগড়া পকেট কমিটি গঠন করা হয়েছে। পকেট কমিটি বাতিলের দাবিতে গতকাল বুধবার (৬ নভেম্বর) শহরে কয়েক হাজার নেতা-কর্মি বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন । খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক পদ পাওয়ার আগে আলোচিত এই ব্যবসায়ী বিএনপি বা অঙ্গ সংগঠনের কোন পদে ছিলেন না।
বিএনপির অনেক নেতা কর্মির সাথে কথা বলে জানা যায়, তিনি বিএনপির কোন ইউনিয়ন বা ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটিতেও ছিলেন না। এছাড়াও নবগঠিত আহ্বায়ক কমিটিতে স্থান পেয়েছেন একাধিক আলোচিত ও সমালোচিত নেতা। কমিটির বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা বিএনপি’র সদস্য সচিব প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার বলেন, জেলার যে সকল নেতাদের কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদ-পদবী রয়েছে তাদেরকে কেন্দ্র থেকে জেলা কমিটিতে রাখেনি। এছাড়াও ৩১ সদস্য বিশিষ্ট জেলার আহ্বায়ক কমিটি কেন্দ্রীয় নেতারা নির্বাচিত করেছেন। সেখানে জেলা পর্যায়ের নেতাদের কোন কিছু করার ছিলো না। বিএনপির নেতা-কর্মিদের অভিযোগ, গত ৫ আগস্ট বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে বিশাল গাড়ী বহর নিয়ে ঢাকা থেকে কুমারখালীতে আসেন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সম্পদে ফঁলে ফেপে ওঠা আলোচিত শিল্পপতি শেখ সাদী।
তাকে রিসিভ করতে বিভিন্ন স্থানের কয়েক হাজার নেতা-কর্মিও যোগ দেন সেদিন। বিএনপির রাজনীতিতে নিজের অবস্থান জানান দিতে ঘটা করে নিজ উপজেলাতে আগমন করে আলোচিত ব্যবসায়ী সাদী। হানিফের আস্থাভাজন এ শিল্পপতি আগামী সংসদ নির্বাচনে বিএনপির টিকিটে দলীয় প্রার্থী হতে চান। কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসনে তার প্রার্থী হওয়া নিয়ে এখন সবখানে আলোচনা চলছে। হানিফের সাথে তোলা কয়েকটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। স্থাণীয় বিএনপির একটি পক্ষ তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে। সেখানে হানিফের সাথে তার ব্যবসায়ীক পার্টনারের বিষয়টি উল্লেখ করা ছাড়াও নানা অভিযোগ আনা হয়েছে। ১৯৯৫-৯৬ সালের দিকে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে ছাত্রদলের রাজনীতি করতেন এই সাদী। দলের হাই কমান্ডের সাথে নিবিড় সম্পর্ক আছে। সর্বশেষ বন্যার্তদের সহযোগিতার জন্য কেন্দ্রীয় ফান্ডে ১০ লাখ টাকা অনুদানও দিয়ে আলোচনায় আসেন। এছাড়া আরাফাত রহমন কোকোর নামে ছাড়া ফুটবল লীগের সদস্য সচিব করা হয়েছে সাদীকে।
কুমারখালী উপজেলা বিএনপি সুত্র জানিয়েছে, এশিউর গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়াম্যান শেখ সাদী। বাড়ির উপজেলার সদরপুরে। ঢাকায় থাকেন বেশির ভাগ সময়। মাঝে মধ্যে এলাকায় আসেন। এক সময় শেখ সাদী জীবিকার তাগিদে ঢাকা যান। সেখানে ফ্লাটের ব্যবসা শুরু করেন। পরে এশিউর গ্রুপ নামের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। আওয়ামী লীগের এই আমলে মাহবুবউল আলম হানিফের সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলেন। এমনকি হানিফ তার অলিখিত পার্টনার ছিল বলেও একাধিক সুত্র জানিয়েছেন। হানিফকে ব্যবহার করে ঢাকায় জমি দখলসহ নানা অভিযোগও আছে সাদীর বিরুদ্ধে। শেখ সাদীর কোম্পানীতে মাহবুবুল আলম হানিফের বিপুল পরিমান অর্থ বিনিয়োগ ছিল বলেও জানান বিএনপির কয়েকজন নেতা। হানিফের সাথে সম্পর্ক থাকায় রাজউকে একছত্র আধিপত্য ছিল সাদী। বিএনপি নেতারা বলেন, উপজেলা বিএনপির এখন তিনটি ধারা আছে। এ আসনের দুই বারের সাবেক এমপি জেলা বিএনপি সভাপতি সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমীর একটি বলয় রয়েছে।
এছাড়া সাবেক পৌর মেয়র ও বিএনপির সিনিয়র নেতা নুরুল ইসলাম আনসার প্রমানিক এখন বড় একটি অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছে। আর শিল্পপতি শেখ সাদীর নেতৃত্বে নতুন একটি বলয় গড়ে উঠেছে। সেখানে বিএনপি ছাড়াও আওয়ামী লীগের অনেক সাধারন কর্মিরা ভিড়েছে। বিএনপি নেতা-কর্মিদের অভিযোগ, সাদী ৫ আগষ্টের আগে সেই ভাবে রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না। শিল্পপতি হিসেবে এলাকায় আসতেন। কিছু উন্নয়ন করেছেন। গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফের সাথেও তার গভীর সম্পর্ক ছিল। ব্যবসায়ীক পার্টনার ছিল বলেও দলে আলোচনা আছে। এদিকে শেখ সাদীর ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এশিউর গ্রুপের নামেও রয়েছে নানান অভিযোগ। যা নিয়ে ইতিমধ্যে বিভিন্ন জাতীয় গনমাধ্যমে এশিউর গ্রুপের দূর্ণীতির সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। গত ২১ শে সেপ্টেম্বর ”গৃহায়ণের জমি দখল করে এশিউর গ্রুপের ফ্ল্যাট” শিরোনামে আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এশিউর গ্রুপের দূর্ণীতির সংবাদ। সেই সংবাদে এশিউর গ্রুপের দূর্ণীতি সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরা হয়। প্রকাশিত সেই সংবাদে তথ্য মতে, রাজধানীর মিরপুর ৯ নম্বরের বাউনিয়া মৌজায় প্রায় ১৬৮ একর জমির মালিক জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ (জাগৃক)।
১৯৬৮ সালে অধিগ্রহণ করা এ জমিতে ১৯৯৫ সালে একনেক থেকে একটি প্রকল্প পাস হয়। সেখানে সাইট অ্যান্ড সার্ভিসেস নামের একটি প্লট উন্নয়ন প্রকল্পের আংশিক কাজও সম্পন্ন হয়। সরকারের গেজেটভুক্ত বিশাল এই এলাকার প্রায় দুই একর (৬ বিঘা) জমি দখলে নিয়েছে এশিউর গ্রুপ নামের বেসরকারি আবাসনপ্রতিষ্ঠান। সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে ফ্ল্যাট বিক্রির আয়োজনও করেছে তারা। ৬ বিঘা জমিতে রাজউকের বিধি মেনে একগুচ্ছ ১০ তলা ভবন করলে অন্তত ৪ লাখ ৩২ হাজার বর্গফুট বিক্রয়যোগ্য আয়তন পাবে এশিউর গ্রুপ। সে হিসাবে নিজেদের ঘোষিত মূল্য প্রতি বর্গফুট সাড়ে ১২ হাজার টাকায় বিক্রি করে প্রতিষ্ঠানটির পকেটে আসতে যাচ্ছে কমপক্ষে ৫৪০ কোটি টাকা। এ দখল ঠেকাতে সরকারের জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত এক শর বেশি সাধারণ ডায়েরি এবং একাধিক ফৌজদারি মামলা করেছে। তবে দখলের কাজটি নির্বিঘ্ন করতে এশিউর কর্তৃপক্ষ কৌশলে সামনে রেখেছে সাবেক কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা-আমলা ও বিহারি ক্যাম্পের লোকজনকে। অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৬৮ সালে প্রথম দফায় মিরপুরের বাউনিয়া মৌজায় ১৬৮ একর জমি অধিগ্রহণ করে ঢাকার জেলা প্রশাসন। এ জমিতে সরকারি অর্থে জাগৃক ‘সাইট অ্যান্ড সার্ভিসেস’ নামের একটি প্রকল্পের কাজও করে। কিন্তু বিশাল এ জমি সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে বেহাত হতে থাকে। একপর্যায়ে সাগুফতা হাউজিং নামের একটি স্থানীয় ভূমি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জুয়েল মোল্লা কমবেশি ১২ একর জমি দখলে নেন। জুয়েল মোল্লা সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লাহর ভাতিজা।
একপর্যায়ে তিনি নিজের দখলদারি পাকাপোক্ত করতে সাবেক সামরিক ও বেসামরিক কয়েকজন আমলাকে নামমাত্র মূল্যে জমি লিখে দেন। ওই কর্মকর্তারাই একসময় এশিউর গ্রুপের কাছে তাঁদের জমির মালিকানা হস্তান্তর করেন। ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানটি তাঁদের সামনে রেখেই নিজেদের ‘এশিউর ঢাকা স্কয়ার’ নামের প্রকল্পে ফ্ল্যাট তৈরির কাজ এগিয়ে নেয়। জাগৃকের নথি ঘেঁটে দেখা যায়, বাউনিয়া মৌজায় সিএস ৩১২৪ দাগে ১৪ দশমিক ৫৮ একর জমির একটি গেজেট প্রকাশিত হয়। সেখানে অধিগ্রহণ করা এলএ কেস নম্বর-১৩/৫৯-৬০ নিয়ে ১৯৮০ সালের ১৮ ডিসেম্বর একটি, এলএ কেস ৯০/৬৫-৬৬ নিয়ে ১৯৭০ সালের ২৯ জানুয়ারিতে একটি এবং এলএ কেস ৫/৭২-৭৩ নিয়ে ১৯৭৪ সালের ১০ অক্টোবর মোট তিনটি গেজেট প্রকাশিত হয়। এসব গেজেটের পর ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ১৯৯০, ২০১৫ এবং সর্বশেষ ২০২০ সালের ৫ মার্চ জাগৃকের অনুকূলে জমি বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এশিউর গ্রুপের দখলে নেওয়া এরই একটি অংশে পড়েছে। যে জমিতে এশিউর ভবন নির্মাণ করছে, সেখানে জাগৃকের মিরপুর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলীর প্রস্তাব অনুযায়ী সরকারের মডেল মসজিদ হওয়ার কথা ছিল।
