বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধন করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও আলোচিত ইসলামী বক্তা আমির হামজা। গতকাল বৃহস্পতিবার (৭ মে) সকাল সাড়ে দশটার দিকে কলেজ ক্যাম্পাসে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও কলেজ সূত্রে জানা গেছে, সকালে প্রধান অতিথি হিসেবে সরকারি কলেজ মাঠে আন্তঃ বিভাগ মিনি ফুটবল টুর্নামেন্ট উদ্বোধন করতে কলেজ ক্যাম্পাসে আসেন আমির হামজা।
এ সময় সাধারণ শিক্ষার্থীরা ব্যানার নিয়ে কলেজ ক্যাম্পাসে নির্বিচারে বৃক্ষ নিধনের প্রতিবাদে মানববন্ধন করছিলেন। এমপি আমির হামজা টুর্নামেন্টের উদ্বোধনের জন্য মঞ্চে প্রবেশ করলে শিক্ষার্থীরা সেখানে গিয়ে উপস্থিত হন এবং ব্যানার হাতে নিয়ে মঞ্চের পাশে মানববন্ধনে দাঁড়িয়ে আমির হামজাকে উদ্দেশ্য করে ভুয়া ভুয়া স্লোগান দিতে থাকেন।
কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোল্লা মো. রুহুল আমীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান শুরু হয়। অনুষ্ঠান শেষ হওয়া পর্যন্ত এমনকি আমির হামজা যখন প্রধান অতিথির বক্তব্য প্রদান করেন সে সময়ও শিক্ষার্থীরা জোরে জোরে ভুয়া ভুয়া স্লোগান দিতে থাকেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যের একপর্যায়ে আমির হামজা বলেন, ‘আমি আনন্দও পেয়েছি আবার একটু দুঃখও পেয়েছি। কারণ এখানে গাছ কাটার যে বিষয়টা শুনলাম আমাদের শিক্ষক পরিষদের শ্রদ্ধাভাজন স্যার যিনি বলছিলেন। আসলে গাছ কে বা কারা কেটেছে এটা তদন্তের মাধ্যমে বের করেন। কিন্তু বাকি যেগুলো হচ্ছে এগুলোকেও তদন্ত করা দরকার। বাকি যারা যা করছেন মনে করছেন আমি লেবাস পড়ে আছি মনে করছেন আমি হুজুর, আমি হুজুর। আমি হুজুর না।
আমি এগুলোর তালিকা নিয়ে যাব আজকে। যেয়ে আপনাদের যা করা লাগে আমি তাই করব। আর আমি ভুয়া কী আমি আপনাদের দেখাবো আজকে। আপনাদের যে কয়জনের তালিকা আমার কাছে আছে অলরেডি। এরা এই শিক্ষা ভবনটা নষ্ট করার জন্য। এর পেছনে কারা আছে আমি তাও জানি। আমি তাদের নামও দেব নালিশ একেবারে ওপরে। দেখি আপনারা কতদুর পারেন।’
ওই বক্তব্যের পর সেখানে আরও উত্তেজনা বেড়ে যায়। খেলার উদ্বোধনের পর অধ্যক্ষ প্রধান অতিথি আমির হামজাকে নিয়ে তাঁর কার্যালেয় নিয়ে যান। পেছনে আন্দোলনকারীও স্লোগান দিতে দিতে যান সেখানে।
সরেজমিন দেখা যায়, ফুটবল খেলা চলার সময় পাশেই প্রশাসনিক ভবনে অধ্যক্ষের কার্যালয়ের সামনে জটলা। ভেতরে ঢোকার কলাপসিবল গেট দুটি বন্ধ ছিল। সামনে ছাত্রদলের কয়েকজন ও শিক্ষার্থীদের একটি দল অবস্থান করছিল। তাঁরা স্লোগান দিচ্ছিলেন।
কুষ্টিয়া মডেল থানার ওসি কবির হোসেন মাতুব্বরকে তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। পরে ওসিকে অধ্যক্ষের কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ঢুকে দেখা যায় আমির হামজাসহ কয়েকজন জামায়াত নেতা ভেতরে বসে আছেন। ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাও সেখানে ছিলেন। শিক্ষার্থীরা অধ্যক্ষের কার্যালয়ের সামনে গিয়েও একইভাবে স্লোগান দিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। এ সময় কলাপসিবল গেট আটকিয়ে বাইরে পুলিশ অবস্থান নেয়। কিছু সময় পরে এমপি আমির হামজা পুলিশের সহযোগিতায় অধ্যক্ষের কার্যালয় থেকে বের হন এবং কলেজ ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন।
এদিকে, এ ঘটনার পর আমির হামজার ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে একটি স্ট্যাটাসে লেখা হয়, ‘কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ পরিদর্শনকালীন সময়ে সংসদ সদস্য আমির হামজাকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে ছাত্রদলের নেতা কর্মীরা।’ তবে এই স্ট্যাটাসের নিচে লেখা রয়েছে এডমিন।
আমির হামজার সঙ্গে থাকা তাঁর শ্যালক আবু বকর সিদ্দিক বলেন,‘অনুষ্ঠান উদ্বোধন করে এমপি মহোদয় অধ্যক্ষের কক্ষে নাশতা করতে যান। সেখানে ছাত্রদলের নেতা কর্মীরা ভুয়া ভুয়া স্লোগান দেন। অফিসে তালা আটকে দেন। এরপর বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করে আমাদের নেতা-কর্মীরা এমপিকে বের নিয়ে আসেন।’ আবু বকর সিদ্দিক আরও বলেন, ‘ছাত্রদল এটা করবে স্বাভাবিক। তারা চাচ্ছে কুষ্টিয়াতে একটা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার। কুষ্টিয়াকে অশান্ত করার চেষ্টা করছে। এটা কোনো দলীয় অনুষ্ঠান নয়। এমপি সেখানে গিয়েছেন। ৫৪ হাজার ভোটের ব্যবধানে তিনি এমপি হয়েছেন। তাঁকে ভুয়া ভুয়া বলার এখতিয়ার পেল কোথায়। দ্রুত এর বিরুদ্ধে স্টেপ নেব।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আমির হামজা বলেন, এমন কিছু না। সেখানে খেলা দেখতে গিয়েছিলাম। সামান্য হট্টগোল হয়েছিল। আমি নিরাপদে বের হয়ে গেছি। তিনি বলেন, ‘কলেজের গাছ কাটা নিয়ে কিছু শিক্ষার্থী মানববন্ধন শেষে কলেজের প্রিন্সিপাল, ভাইস-প্রিন্সিপালদের সঙ্গে ঝামেলা করছিল। আমি বলছি খেলা চলাকালীন এসব ঝামেলার দরকার নাই।’
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোসাদ্দেক হোসেন রাব্বী। তিনি বলেন, ‘গাছ কেটে মঞ্চ তৈরি করার প্রতিবাদে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেছেন। এখানে ছাত্রদলের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’ উল্টো উনি (আমির হামজা) তাঁদের নামের লিস্ট করার কথা বলেন। এতে তাঁরা বিক্ষোভ করেন।’
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুষ্টিয়ার সরকারি কলেজে আন্তবিভাগ ক্রীড়া প্রতিযোগিতার মাঠ পরিষ্কার করতে ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যবর্ধনে লাগানো বিভিন্ন প্রজাতির বনজ, ফলজ ও ঔষধি গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। এ ঘটনার প্রতিকার এবং জড়িতদের শাস্তি দাবিতে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এর প্রতিবাদ জানিয়ে মঙ্গলবার মানববন্ধন করেছেন শিক্ষার্থীরা।
কলেজ ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক শিমুল হোসেন বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবিতে তারা মানববন্ধনে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু এমপি তালিকা করার কথা বলায় উত্তেজনা তৈরি হয়।
অন্যদিকে কলেজ শিবির সভাপতি ওয়াসকরুনী ফারাবি দাবি করেন, আগে থেকেই এমপির আগমন ঠেকাতে একটি পক্ষ পরিকল্পনা করেছিল।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোল্লা মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘এমপি মহোদয় আন্তবিভাগ ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। সেখানকার অনুষ্ঠান শেষ করে তিনি আমার কক্ষে ছিলেন। তাঁকে অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনা ঠিক না।’ গাছ কাটার ব্যাপারে তিনি জানান, কীভাবে এবং কারা করেছে তা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কুষ্টিয়া মডেল থানার ওসি কবির হোসেন মাতুব্বর বলেন, খবর পেয়ে তিনি ফোর্স নিয়ে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষের কার্যালয়ে যান। এ সময় তিনি আমির হামজাকে অধ্যক্ষের সঙ্গে আলাপ করতে দেখেন।’ তবে আমির হামজা কে অবরুদ্ধ করে রাখার বিষয়টি অস্বীকার করেন ওসি। তিনি বলেন, ‘আমির হামজা অধ্যক্ষের কার্যালয় থেকে তার সঙ্গেই বেরিয়ে আসেন এবং কলেজ ক্যাম্পাস ত্যাগ করে চলে যান।’
প্রসঙ্গত কলেজের বিশাল এই খেলার মাঠ বাদ রেখেই আন্তঃবিভাগীয় (কলেজের নিজস্ব বিভাগের মধ্যে) ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজনের নামে প্যান্ডেল তৈরির জন্য গত ৪ মে রাতের আঁধারে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের প্রায় ২০টির মত গাছ কেটে ফেলা হয়। বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকরা মিলে তাদের নিজ হাতে লাগিয়েছিলেন ওই গাছ গুলো। এমনকি শিক্ষকরা নিজেরাই পালা করে নিয়মিত গাছগুলোর পরিচর্যা করে আসছিলেন।
রাতের আঁধারে এই গাছ কেটে ফেলার ঘটনায় চরম ক্ষুব্ধ কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার সকালে কলেজে এসে গাছ কেটে ফেলার বিষয়টি জানতে পেরে শিক্ষকরা তাৎক্ষণিকভাবে এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। তদন্ত কমিটি গঠন করে এ ঘটনার সাথে জড়িতদের চিহ্নিতকরণ ও শাস্তি মূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে কলেজের অধ্যক্ষ বরাবর লিখিত আবেদন করেন। এ ঘটনায় কলেজ কর্তৃপক্ষ এক সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
