‘তিন অপশন’ খ্যাত কুষ্টিয়ার সাবেক এসপি তানভীর আরাফাত কারাগারে - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

‘তিন অপশন’ খ্যাত কুষ্টিয়ার সাবেক এসপি তানভীর আরাফাত কারাগারে

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: ডিসেম্বর ২৭, ২০২৪

নিজ সংবাদ ॥ বিএনপি কর্মী সুজন মালিথাকে গুলি করে হত্যা মামলার প্রধান আসামি কুষ্টিয়ার সাবেক পুলিশ সুপার এস এম তানভীর আরাফাতকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারের পর গতকাল বৃহস্পতিবার (২৬ ডিসেম্বর) ১২টার দিকে তাকে আদালতে নেওয়া হয়েছে। উপ-পুলিশ কমিশনার তানভীর আরাফাত সিলেট রেঞ্জ ডিআইজি অফিসে সংযুক্ত। তার গ্রামের বাড়ি খুলনার খালিশপুর উপজেলায়। বিষয়টি নিশ্চিত করে কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শিহাবুর রহমান শিহাব বলেন, সাবেক এসপি তানভীর আরাফাত পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। তাকে আদালতে হাজির করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে কুষ্টিয়া মডেল থানায় মামলা রয়েছে। কোথা থেকে কখন তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দেয়নি পুলিশ।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর নিহত সুজনের রাজনৈতিক বড় ভাই সুজন হোসেন (৪২) বাদী হয়ে কুষ্টিয়া মডেল থানায় মামলাটি করেন। মামলায় মোট ১৫ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে আরও ১০-১২ জনকে। নিহত সুজন মালিথা কুষ্টিয়া সদর উপজেলার টাকিমারা গ্রামের ইসমাইল মালিথার ছেলে। মামলার বাদী সুজন হোসেন কুষ্টিয়া শহরের মিললাইন এলাকার লালন শাহ সড়কের আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে। মামলার বাদী সুজন হোসেন এজাহারে উল্লেখ করেছেন, আমার দলীয় ছোট ভাই বিএনপির সহযোদ্ধা সুজন মালিথা নিয়মিত বিএনপির বিভিন্ন প্রোগ্রামে উপস্থিত থেকে নেতাকর্মীদের উৎসাহ প্রদান করতো। যার কারণে আসামিদের কাছে সুজন মালিথা শত্রু হিসেবে পরিণত হয়। আসামিরা আমার দলীয় ছোট ভাইকে হত্যার ষড়যন্ত্র করতে থাকে।

তারই জের ধরে আমার দলীয় ছোট ভাই সুজন মালিথা বিএনপির প্রোগ্রাম শেষ করে রাতে নিজ বাড়িতে প্রবেশ করলে ২০১৯ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ১২টা ২০ মিনিটে  আসামিরা সকলে মিলে আমার দলীয় ছোট ভাইয়ের বাসায় প্রবেশ করে এবং তাকে জোরপূর্বক তার বাসা থেকে তুলে নিয়ে অজ্ঞাতস্থানে চলে যায়। পরবর্তী সময়ে আমিসহ সুজন মালিথার পরিবারের লোকজন তাকে দীর্ঘক্ষণ খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে এলকাবাসীর মাধ্যমে জানতে পারি, পূর্ব শত্রুতার জের ধরে উল্লেখিত আসামিরা পরস্পরের যোগসাজসে আমার দলীয় ছোট ভাই সুজন মালিথাকে বাসা থেকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে ১৩ সেপ্টেম্বর রাত ১টা ৩০ মিনিটে কুষ্টিয়া মডেল থানাধীন মোল্লাতেঘরিয়া পূর্ব ক্যানালের পাড়ে গুলি করে হত্যা করেছে। অতপর আমিসহ সুজন মালিথার পরিবারের লোকজন আসামিদের কাছে উপস্থিত হয়ে সুজন মালিথাকে হত্যার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তারা কোনো সদুত্তর না দিয়ে আমাদের তাড়িয়ে দেয়। একাধিকবার উক্ত ঘটনার বিষয়ে মামলা করার চেষ্টা করলে আসামিরা আমাকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখায়। ঘটনার বিষয়ে এলাকার অনেকেই অবগত আছেন।

এমতাবস্থায় ঘটনার বিষয়ে সুজন মালিথার পরিবারসহ দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে থানায় এজাহার দায়ের করতে বিলম্ব হয়। আসামিরা হলেন- কুষ্টিয়ার সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) এসএম তানভীর আরাফাত, কুষ্টিয়া মডেল থানার সাবেক ওসি নাসির উদ্দিন, একই থানার সাবেক ওসি এ কে এম মিজানুর রহমান, ওই থানার সাবেক এসআই সাহেব আলী,  এসআই মোস্তাফিজুর রহমান, কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, কুষ্টিয়া-৪ (খোকসা-কুমারখালী) আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুর রউফ, সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ও শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা, দৌলতপুর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান টোকন চৌধুরী, কুষ্টিয়া নাগরিক পরিষদের সভাপতি এবং কুষ্টিয়া সদর উপজেলা পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডিবি) চেয়ারম্যান সাইফুদ্দৌলা তরুন (৪৮), কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক রাশেদুল ইসলাম বিপ্লব (৪৫), কুষ্টিয়া পৌরসভার ১৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা মহিদুল ইসলাম, ইসলামিয়া কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি শেখ আরিফুর হোসেন সজীব, কুষ্টিয়া পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর কৌশিক আহমেদ ওরফে বিচ্ছু, জেলা শ্রমিক লীগের সহ-সভাপতি সোহাগ আলী। কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, আমি খুলনায় আছি। একটা মিটিংয়ে আছি। আর কিছু না বলে মোবাইলটি কেটে দেন।

এবিষয়ে কথা বলার জন্য কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পলাশ কান্তি নাথ ও আদালত পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) কল দিলেও তারা রিসিভ করেননি। উল্লেখ্য, এসএম তানভীর আরাফাত কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের পুলিশ সুপার হিসাবে কর্মরত ছিলেন। ২০২১ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি (সোমবার) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে এসএম তানভীর আরাফাতকে বরিশাল মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার হিসেবে বদলি করা হয়। প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালে এসএম তানভীর আরাফাত কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার হিসেবে যোগদান করেন। ২০২০ সাল পর্যন্ত কুষ্টিয়ায় দায়িত্ব পালনের সময়ে সরকারি চাকরি করেও বিভিন্ন প্রোগ্রামে আওয়ামী লীগের নেতার মতো প্রকাশ্যে বক্তৃতা দিতেন। এছাড়াও বিএনপি-জামায়াতসহ সরকারবিরোধী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতার নির্যাতনসহ নানা হয়রানি করতেন। এসপি থাকাকালে কুমারখালীর কয়া ইউনিয়নের এক জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেছিলেন-এ দেশে থাকতে গেলে বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে কোনো কথা বলা যাবে না। চুপ করে থাকতে হবে।

এ দেশ যদি ভালো না লাগে তাহলে সোজা পেয়ারে পাকিস্তানে চলে যেতে হবে। সেই সময় তার ওই বক্তব্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ভাইরাল হয়। এদিকে কুষ্টিয়ায় চাকরি করার সময়ে বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত এসপি তানভির আরাফাতকে কারাগারে পাঠানো সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে স্বয়ং আদালত পাড়াতেই অনেককে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক বেঞ্চ সহকারী জানান, এসপি তানভির প্রকাশ্যে জনসমাবেশে ‘বালিস ছাড়া শোওয়াইয়া দিব’ এমন ঘোষণা দিয়েই একাধিক বিচারবহির্ভূত ঘটনার জন্ম দিয়েছেন জেলাতে। নানা কাণ্ডে সমালোচিত ছিলেন তানভীর আরাফাত-কুষ্টিয়া জেলায় এসপি হয়ে আসার পর থেকেই নানা কর্মকাণ্ডে সমালোচনার মুখে পড়েন তানভীর আরাফাত। এমনকি এসব কাণ্ডে তাকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়, ভুগতে হয় বিভাগীয় শাস্তিও।

২০২০ সালের ২১ ডিসেম্বর কুষ্টিয়ায় ‘কুমারখালী নাগরিক পরিষদ’র ব্যানারে আয়োজিত এক সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য সেলিম আলতাফ। সেখানে অতিথি ছিলেন কুষ্টিয়ার তৎকালীন এসপি এস এম তানভীর আরাফাত। তিনি তার বক্তব্যে বিরোধী পক্ষগুলোকে ‘তিনটি অপশন’ দেন । তানভীর আরাফাত বলেন, ‘এক. উল্টাপাল্টা করবা হাত ভেঙে দেব, জেল খাটতে হবে। দুই. একেবারে চুপ করে থাকবেন, দেশের স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস নিয়ে কোনো প্রশ্ন করতে পারবেন না। তিন. আপনার যদি বাংলাদেশ পছন্দ না হয়, তাহলে ইউ আর ওয়েলকাম টু গো ইউর পেয়ারা পাকিস্তান। তার এ বক্তব্য তখন তুমুল আলোচনায় আসে। এসপি তানভীর এক সমাবেশে ‘বালিশ ছাড়া শোওয়াইয়া দেব’ বলেও ঘোষণা দেন, যেটাকে বিচারবহির্ভূত হত্যার হুমকি বলে সেসময় ব্যাপক সমালোচনা হয়। এমনকি ভেড়ামারায় পৌর নির্বাচনে ভোট কারচুপিতে বাধা দেওয়ায় কর্তব্য পালনরত একজন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে লাঞ্চিত করার অপরাধে উচ্চ আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল তানভীর আরাফাতকে। ওই ঘটনায় আগে থেকেই তিনি বিভাগীয় শাস্তি (পদায়ন বঞ্চিত) ভোগ করছিলেন। পাঁচ বছর আগে কুষ্টিয়ায় চাকরিকালে বহুল আলোচিত-সমালোচিত ও বিতর্কিত এসপি তানভীর আরাফাতের কারাগারে যাওয়ার সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে স্বয়ং আদালত পাড়াতেই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন অনেকে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক বেঞ্চ সহকারী জানান, একেই বলে ‘ধর্মের কল বাতাসে নড়ে’।