কুমারখালীর তাল পাতার হাত পাখা সরবরাহ হচ্ছে দেশ জুড়ে - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কুমারখালীর তাল পাতার হাত পাখা সরবরাহ হচ্ছে দেশ জুড়ে

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: মে ২, ২০২৩
কুমারখালীর তাল পাতার হাত পাখা সরবরাহ হচ্ছে দেশ জুড়ে

কুমারখালীর তাল পাতার হাত পাখা সরবরাহ হচ্ছে দেশ জুড়ে। প্রতিবছর কোটি টাকার পাখা বিক্রি। চৈত্রের দাবদাহ- গরমে অতিষ্ঠ মানুষ, হাত পাখার কদর বাড়ছে। পাখা পাড়ায় ব্যস্তসময় পার করছেন কারিগররা।

কুমারখালীর তাল পাতার হাত পাখা সরবরাহ হচ্ছে দেশ জুড়ে

কুমারখালীর তাল পাতার হাত পাখা সরবরাহ হচ্ছে দেশ জুড়ে

কুমারখালীর তাল পাতার হাত পাখা সরবরাহ হচ্ছে দেশ জুড়ে

দেশ জুড়ে চৈত্রের শুরুতে তীব্র দাবদাহে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। তাই এখন সর্বত্র কদর বেড়েছে তালের হাতপাখার। পাখার কদর ও বিক্রি বাড়ার কারণে এখন মহাব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার সদকী ইউনিয়নের মঠমালিয়াট গ্রামের পাখাপল্লীর কারিগররা। এখান থেকে কোটি টাকার পাখা বিক্রি হচ্ছে প্রতিবছর।

এ পল্লীর তৈরি পাখা স্থানীয়দের চাহিদা মিটিয়ে পাইকারদের মাধ্যমে চলে যাচ্ছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্নস্থানে। উপজেলা সদর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিম অবস্থিত মালিয়াট গ্রাম। এ গ্রামটিকেই এখন সবাই চেনের পাখার গ্রাম কিংবা পাখাপল্লী হিসেবেই। প্রায় শত’ বছর ধরে বংশ পরম্পরায় তাল পাতার হাত পাখা তৈরি হচ্ছে এই গ্ৰামে। এ গ্রামের প্রবেশ মুখেই বসবাস করে প্রায় শতাধিক পরিবার। এসব পরিবারের সবাই তালপাতার হাতপাখা তৈরি ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত। এককথায় বছরের পর বছর থেকে এসব পরিবারের সহস্রাধিক সদস্যের জীবন জীবিকা বাঁধা পড়েছে তালপাতার হাতপাখায়। বর্তমানে উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি হওয়ায় অর্থাভাবে এখানকার অনেকেই পেশা পরিবর্তন করতে শুরু করেছেন। যাঁরা এখনও এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন তাঁরা সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরের পৃষ্ঠপোষকতা চেয়েছেন। সুদমুক্ত ঋণ দিয়ে হস্ত শিল্পটিতে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সর্বস্তরে এখন জোর দাবি উঠেছে। সরজমিনে ওই গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিটি বাড়িতেই চলছে পাখা তৈরির কাজ।

বাড়ির গৃহবধূ থেকে শুরু করে ছেলে-মেয়েরাও ব্যস্ত সময় পার করছেন পাখা তৈরির কাজে। পাখা তৈরি ও সুতা দিয়ে বাঁধার কাজটি মূলত বাড়ির গৃহবধূ ও মেয়েরাই করে থাকেন। পাখা তৈরির জন্য তালপাতা সংগ্রহ, পাতা ছাঁটাই ও তৈরি পাখা বিক্রির দায়িত্ব পালন করে থাকেন বাড়ির পুরুষ সদস্যরা। গ্রামে ঢুকতেই দেখা যায়, পাখার কারিগর মুক্তা আক্তার, আছমা বেগমসহ কয়েকজন পাখা তৈরি করছেন।

এমন নিপুণভাবে পাখা তৈরির কাজ শিখলেন কিভাবে? এ প্রশ্নের জবাবে তাঁরা জানান, তাঁদের বাবা-মায়ের কাছে থেকেই পাখা তৈরির কাজ শিখেছেন। তালের পাতা কাটা ও ছাঁটাই থেকে শুরু করে কয়েক ধাপে শেষ হয় পাখা তৈরির কাজ। পাখা তৈরির শেষ ধাপে রয়েছে সুতা দিয়ে বাঁধাই। মারিয়া এখন প্রতিদিন একাই ১শ’টি পাখা বাঁধাই করতে পারেন। এ থেকে প্রতিদিন তাঁর প্রায় ১শ’ টাকা আয় হয়। মোঃ আবুল হোসেন (৬৫) জানান, গত ২৫ বছর ধরে তিনি পাখা বানানোর কাজ করছেন। তাঁর পরিবারের সদস্যদের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের ফলে তিনি এখনও এ পেশায় টিকে আছেন।

কুমারখালীর তাল পাতার হাত পাখা সরবরাহ হচ্ছে দেশ জুড়ে

কুমারখালীর তাল পাতার হাত পাখা সরবরাহ হচ্ছে দেশ জুড়ে

বর্তমানে পাখা তৈরির প্রধান উপকরণ তাল পাতার তীব্র সঙ্কট চলছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে ও পার্শ্ববর্তী উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে অধিকমূল্যে তাদের তালপাতা ও বাঁশ ক্রয় করতে হচ্ছে। বছরের ৬ মাসই তারা এ কাজ করে থাকেন। তার পরিবারের সকলে মিলে একদিন ২ থেকে ৩শ’ পিস করে পাখা তৈরি করতে পারেন। প্রতিটি পাখা তৈরি করতে তাঁদের খরচ হয় ৮ থেকে দশ টাকা আর পাইকারি হিসেবে তা বিক্রি করছেন ১৪/ ১৫ টাকায়। ওই পল্লীর আরেক হস্তশিল্পী ইছাহাক বলেন, পাইকার এসে বাড়ি থেকে হাত পাখা ক্রয় করে নিয়ে যায়। পাখা তৈরি করাই হচ্ছে আমাদের গ্রামের প্রধান আয়ের উৎস।

আমাদের পাখা পল্লীর তৈরিকৃত হাতপাখা বিভিন্ন মেলা, হাট-বাজার, বাসস্ট্যান্ডসহ এলাকার চাহিদা মিটিয়ে পাইকারদের মাধ্যমে চলে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে। পাখার কারিগররা জানান, পাইকারি পাখার মহাজনরা শুধু পুঁজি খাটিয়ে বেশি লাভবান হলেও হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে পাখা তৈরি করেও তারা অধিক লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

পাখার মহাজনরা জানান, শীত মৌসুমে পাখার কারিগরদের দাদন দিয়ে পাখা ক্রয় করে রেখেছেন। এখন সেগুলোর বিক্রি করা হবে। স্থানীয় সমাজ সেবক নয়ন শেখ জানান, একমাত্র আর্থিক দৈন্যের কারণে পাখা পল্লীর কারিগররা শীত মৌসুমে মহাজনদের কাছ থেকে দাদন নেয়ায় গরমকালে পাখার দাম বাড়লেও কারিগররা তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। লাভের অংশ চলে যায় মহাজনদের ঘরে। যেকারণে সরকারী বা বেসরকারীভাবে সুদমুক্ত কিংবা সহজশর্তে ঋণ সুবিধা প্রদান করা হলে জীবন-জীবিকায় বাঁধা পাখাপল্লীর কারিগররা মহাজনদের খপ্পর থেকে রক্ষা পেয়ে সঠিক মুনাফা অর্জন করতে পারবেন। এজন্য তিনি সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উর্ধতন কর্মকর্তাদের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

সদকী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিনহাজুল আবেদীন দীপ বলেন, পাখা পাড়ায় পরিবারগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হলে জরুরী ভিত্তিতে সহজ শর্তে সুদ মুক্ত ঋণ দেয়া না হলে হয়ত অচিরেই এসব পরিবারের সদস্যরা পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হবেন। এ ব্যাপারে কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়ার জন্য তিনিও সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরের উর্ধতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

কুমারখালী উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা বিতান কুমার মন্ডল জানান, সদকী ইউনিয়নের প্রায় দুই শতাধিক পরিবার । আমাদের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে। সেই সঙ্গে পুরাতন ঐতিহ্য কে তারা ধরে রেখেছে। উপজেলা প্রশাসন বাজার সম্প্রসারণ করতে অ্যাপস এর মাধ্যমে সাহায্য করছে। তাদের এই কাজ কে এগিয়ে নিতে উপজেলা প্রসাশন সকল ধরনের সহযোগিতা করবে।