নিজ সংবাদ \ রাজধানী ঢাকার বেইলি রোডের অগ্নিকান্ডে দগ্ধ হয়ে দ্য রিপোর্টের নারী প্রতিবেদকের মৃত্য হয়। এদিকে গতকাল শুক্রবার (১ মার্চ) দুপুর ২টায় তার গ্রামের বাড়িতে এই খবর পৌঁছানের সাথে সাথে তার প্রকৃত নাম এবং ধর্ম নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। অভিশ্রুতি শাস্ত্রী মূলত হিন্দু ধর্মবালম্বীদের নাম। কিন্তু সাংবাদিক অভিশ্রুতি শাস্ত্রীর সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তার আসল নাম বৃষ্টি খাতুন। সে কুষ্টিয়া জেলার খোকসা উপজেলার বেতবাড়িয়া ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডের বনগ্রাম পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দা। তার বাবার নাম শাবলুল আলম সবুজ ওরফে সবুজ শেখ এবং তার মায়ের নাম বিউটি বেগম। অভিশ্র“তি শাস্ত্রী ওরফে বৃষ্টির গ্রামের বাড়ীতে গিয়ে দেখা যায়, সাংবাদিক মেয়ের সঙ্গে কথা বলবেন তার মা, তাই হন্যে হয়ে নিজের মোবাইল ফোন খুঁজছেন মা বিউটি বেগম। কখনো ফোনের জন্য চিৎকার করে সারা বাড়ি মাথায় তুলছেন। ফোনকল পেলেই ঢাকায় মেয়ে বৃষ্টি খাতুনের কাছে ছুটে যাবেন। ছোট মেয়ে বর্ষা মাকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন। প্রতিবেশীরাও যেন শোকে পাথর হয়ে গেছেন! তার গ্রামের বাড়িতে ঢাকার স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইডেন মহিলা কলেজ থেকে পাওয়া একটি ক্রেস্ট দেখা যায়। সেই ক্রেস্টের গায়ে ‘অভিশ্রুতি বৃষ্টি’ নামটি ইংরেজি লেখা রয়েছে। এছাড়া বাকি সমস্ত কাগজপত্রে তাঁর নাম বৃষ্টি খাতুন উলেখ করা রয়েছে। জানা যায়, বৃষ্টি প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে পড়েছেন গ্রামের বিদ্যালয়ে। উচ্চ মাধ্যমিক পড়েছেন কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে। বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ঢাকার ইডেন মহিলা কলেজে দর্শন শাস্ত্র নিয়ে স্নাতক পড়েছেন। বিসিএস কোচিং নিয়েও ব্যস্ত ছিলেন। পরিবার সূত্রে জানা যায়, নিহত সাংবাদিকের বাবা শাবলুল আলম সবুজ ঢাকায় একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন। দরিদ্র বাবার তিনটিই কন্যা সন্তান। বড় মেয়ে বৃষ্টি খাতুন। মেজো মেয়ে ঝর্ণা রাজবাড়ী সরকারি কলেজে প্রথম বর্ষের ছাত্রী। তিনি রাজবাড়ী থেকেই পড়াশোনা করেন। ছোট মেয়ে বর্ষা মায়ের সাথে গ্রামের বাড়ীতেই বসবাস করেন। অভিশ্র“তি শাস্ত্রীর সিভিতে দেখা গেছে, সেখানে তিনি বাবার নাম লিখেছেন অভিরূপ শাস্ত্রী এবং মায়ের নাম লিখেছেন অপর্ণা শাস্ত্রী। সিভিতে তিনি নিজের বর্তমান ঠিকানা লিখেছেন সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির, মৌচাক। বায়োডাটায় তিনি একজন সনাতন ধর্মাবলম্বী বলে উলেখ রয়েছে। আর সেই কারনেই তার মরদেহ হস্তান্তর নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের অভ্যর্থনা কক্ষের সামনে গিয়ে শাবলুল আলম সবুজ অভিশ্র“তিকে নিজের মেয়ে বলে দাবি করলেও নিজের মেয়ের পেশা এবং ধর্মচর্চা নিয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেননি তিনি। মেয়ের সাথে কোনো ছবিও নেই তার কাছে। দুইদিন আগে অভিশ্র“তির সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে দাবি করলেও তার কল লিস্ট চেক করেও মেলেনি সে প্রমাণ। সবুজ আরও বলেন, ‘অভিশ্র“তি আমার মেয়ে। অভিশ্র“তি আমার তিন মেয়ের মধ্যে বড়। আমার আরও দুটি মেয়ে রয়েছে। আমি আমার মেয়ের লাশ নিতে এসেছি। কিন্তু আমাকে আমার মেয়ের লাশ দেওয়া হচ্ছে না। কলেজের সার্টিফিকেট, জন্ম নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্রে অভিশ্র“তি শাস্ত্রীর নাম বৃষ্টি খাতুন উলেখ রয়েছে বলে জানিয়েছেন তার মা বিউটি বেগম ও বেতবাড়ীয়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল মজিদ। বৃষ্টির মা বিউটি বেগম ও তার খালা সাবানা খাতুন বলেন, বৃষ্টি হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করেছে কি না জানি না। সে আমাদের মুসলিম পরিবারের সদস্য। সার্টিফিকেট, জন্ম নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্রে তার নাম বৃষ্টি খাতুন। আমরা তার মরদেহ পাচ্ছি না। তার মরদেহ আমরা গ্রামের বাড়িতে দাফন করব। বৃষ্টি যত ভুলই করুক না কেন, আমাদের সন্তান আমরা দাফন করব। অন্য দিকে, তামিম নামে বৃষ্টির কাজিন জানায়, বৃষ্টি ধর্মান্তরিত হয়েছিলো। তারপর স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টির সত্যতা মেলে। দ্য রিপোর্টের প্রতিবেদক গোলাম রব্বানী গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে আজ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে অভিশ্র“তির সহকর্মী ও বন্ধুরা তার মরদেহ শনাক্ত করেন। আমরা জানতে পেরেছি ওই ভবনের একটি রেস্টুরেন্টে তিনি তার এক বন্ধুর সঙ্গে এসেছিলেন। গতকাল (বৃহঃবার) রাত থেকে তার ফোন বন্ধ ছিল এবং আমরা তার কোনো খোঁজ পাচ্ছিলাম না। রব্বানী আরও বলেন, আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহের হাতে থাকা লাল সুতো (মৌলি সুতো) দেখে অভিশ্র“তিকে শনাক্ত করি। অভিশ্র“তির পরিবারের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ করা যায়নি। কারণ আমাদের কাছে থাকা তার পরিবারের একমাত্র নম্বরটি বন্ধ রয়েছে। গোলাম রব্বানী আরও বলেন, ইডেন মহিলা কলেজের রাজিয়া হল শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন অভিশ্র“তি। আমরা তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছি। অভিশ্র“তি বাড়ি কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলায়। তিনি ইডেন মহিলা কলেজের দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। বৃষ্টির মেজো বোন ঝর্ণা জানান, ‘অভিশ্র“তি বৃষ্টি’ নামে ফেসবুক একটি আইডি চালাতেন বৃষ্টি। এ ছাড়া তিনি কখনো অন্য ধর্ম গ্রহণ করার কথা বলেননি। ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার জন্য তিন মাস আগে বাড়ি এসেছিলেন। নিহতের ছোট বোন বর্ষা জানায়, গত বৃহস্পতিবার দুপুরে মায়ের সঙ্গে বৃষ্টির শেষবার ফোনে কথা হয়। বৃষ্টি সাংবাদিকতা করলেও বাড়ি থেকে মা টাকা পাঠাতেন। বেতবাড়ীয়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল মজিদ বলেন, অভিশ্র“তি শাস্ত্রীর আসল নাম বৃষ্টি খাতুন। তিনি মুসলিম। বৃষ্টি ইডেন কলেজে পড়াশোনা করতেন। আমাদের হাতে থাকা তার জন্ম নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্রেও তার নাম বৃষ্টি খাতুন। তার বাবা শাবলুল আলম সবুজ ঢাকায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তিনি মেয়ের মরদেহ আনতে মর্গে গেছেন। কিন্তু তার বাবাকে মরদেহ বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে না। মরদেহ হস্তান্তর করা হলে গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হবে। তিনি আরও বলেন, বৃষ্টি বনগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। তারপর বনগ্রাম মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০১৫ সালে এসএসসি পাস করেন। এরপর কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ২০১৮ সালে ঢাকায় যান। বৃষ্টি ইডেন মহিলা কলেজ থেকে দর্শন বিভাগে অনার্স পাস করেছেন। বনগ্রাম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম জানান, ২০১৬ সালে মানবিক বিভাগ থেকে এসএসসি করেন বৃষ্টি। স্বাধীনচেতা ছিলেন। ছোটবেলা থেকে তিনি সরকারি বড় চাকরি করার স্বপ্ন দেখতেন। একই গ্রামের বাসিন্দা খোকসা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বাবুল আখতার বলেন, মেয়েটির বাবাকে আমি আগে থেকেই চিনি। তার তিন মেয়ে তাও জানি। কিন্তু নামের পরিবর্তন বা অন্য ধর্ম গ্রহণের বিষয়ে কখনো শুনি নাই। এদিকে রমনা কালি মন্দিরের সভাপতি উৎপল সাহা বলেন, গত আট মাস ধরে তার সঙ্গে আমাদের পরিচয়। এই আট মাসে সে আমাদের মন্দিরের সঙ্গে অনেকটাই কানেক্টেড। যে ভদ্রলোক (সবুজ) শাস্ত্রীকে নিজের মেয়ে বলে দাবি করছেন তিনি মিথ্যা কথা বলছেন। তার পরিবারের সবাই ভারতের বানারসে থাকেন। কুষ্টিয়ার খোকসা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আন নূর জায়েদ বলেন, জানতে পেরেছি অগ্নিকান্ডের ঘটনায় নিহত সাংবাদিক অভিশ্র“তি শাস্ত্রীর বাড়ি বনগ্রাম পশ্চিমপাড়ায়। এদিকে নানা নাটকীয় তার পরে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পুলিশ অভিশ্র“তি’ নামে পরিচিত নারী সাংবাদিকের প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে তার মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয় মাঝ রাতে। শুক্রবার (১ মার্চ) রাতে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে দায়িত্বরত পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) আব্দুল জব্বার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি নিহত নারী সাংবাদিকের পরিচয় নিশ্চিতকরণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এস আই আব্দুল জব্বার জানান, ফিঙ্গার প্রিন্টের মাধ্যমে অভিশ্র“তির প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। ওই সাংবাদিক কর্মক্ষেত্রে অভিশ্রুতি শাস্ত্রী নামে পরিচিত। তার একটি বায়োডাটায় লেখা আছে তিনি সনাতন ধর্মাবলম্বী। তবে তার মৃত্যুর খবর দেখে মরদেহ নিতে আসেন কুষ্টিয়ার শাবলুল আলম সবুজ নামে একজন। তিনি নিজেকে অভিশ্রুতির বাবা বলে পরিচয় দেন এবং দাবি করেন অভিশ্রুতি মুসলিম। ফলে ওই সাংবাদিকের প্রকৃত পরিচয় নিয়ে ধোঁয়াশা তেরি হয়। জটিলতা তৈরি হয় মরদেহ হস্তান্তর নিয়ে। তবে, কুষ্টিয়ার শাবলুল আলম ছাড়া ওই নারীর মরদেহ নিতে অন্য কেউ আসেননি। পরিচয় নিশ্চিত হতে ওই সাংবাদিকের ফিঙ্গার প্রিন্ট নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। তাতে দেখা গেছে এনআইডি বা জাতীয় পরিচয়পত্রে তার নাম বৃষ্টি খাতুন লেখা আছে। বাবার নাম সবুজ শেখ আর মায়ের নাম বিউটি বেগম লেখা আছে। এনআইডি অনুযায়ী তার গ্রাম বনগ্রাম, ডাকঘর বনগ্রাম, উপজেলা খোকসা এবং জেলা কুষ্টিয়া। এনআইডির তথ্যানুযায়ী পরিচয় শনাক্ত হওয়ায় এখন সাংবাদিক অভিশ্র“তির মরদেহ তার বাবা শাবলুল আলম সবুজের কাছে হস্তান্তর হয়।
