বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধ জেলা কুষ্টিয়া। আজ আমরা জানবো “কুষ্টিয়া” নামটির পেছনের ইতিহাস, প্রচলিত ধারণা, উপকথা ও ভূগোলভিত্তিক ব্যাখ্যা।

রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ী – কুষ্টিয়া জেলা
📜 প্রশাসনিক ইতিহাসে কুষ্টিয়া: জেলা হওয়ার পথচলা
- আনুষ্ঠানিকভাবে ১৪ আগস্ট ১৯৪৭, ভারত ভাগের প্রেক্ষাপটে বর্তমান কুষ্টিয়া জেলা পাকিস্তানের পূর্ব অংশ হিসেবে পূর্ব বাংলায় অন্তর্ভুক্ত হয়।
- তার আগে কুষ্টিয়া ছিল নদীয়া জেলার একটি মহকুমা, যা ছিল অবিভক্ত বাংলার প্রেসিডেন্সি বিভাগের অন্তর্গত।
- ১৯৪৭ সালের পর ধাপে ধাপে প্রশাসনিক স্বীকৃতি ও উন্নয়নের মধ্য দিয়ে কুষ্টিয়া আজ একটি পূর্ণাঙ্গ জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

গুগোল নিউজে আমাদের ফলো করুন
🧾 নামকরণ নিয়ে প্রচলিত মত ও ইতিহাসবিদদের বিশ্লেষণ
🔸 কুমুদনাথ মল্লিকের ভাষ্যে:
খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ কুমুদনাথ মল্লিক তাঁর ‘নদীয়া কাহিনী’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন—
“কুষ্টিয়া জেলার প্রাচীন ইতিহাস সুস্পষ্টভাবে জানা যায় না।”
তিনি নামকরণ নিয়ে সরাসরি কিছু না বললেও ভাষাগত পরিবর্তন ও লোকমুখে প্রচলিত ধ্বনিগত রূপান্তরকেই প্রধান কারণ হিসেবে অনুমান করেন।
📚 বিভিন্ন ব্যাখ্যায় ‘কুষ্টিয়া’ নামের সম্ভাব্য উৎস
১️⃣ হ্যামিলটনের গেজেটিয়ার অনুসারে (১৮২০):
স্থানীয় জনগণ ‘কুষ্টি’ নামে জায়গাটিকে ডাকত, সেই থেকে ‘কুষ্টিয়া’ নামের প্রচলন ঘটে।
২️⃣ ফারসি শব্দমূল ‘কুশতহ’ হতে:
- ‘কুশতহ’ অর্থ ‘ছাই দ্বীপ’ বা ভস্মভূমি।
- অনুমান করা হয়, এখানে কোনও সময়ে জ্বলন্ত ঘটনা বা ছাই জমার ইতিহাস থাকায় এমন নামকরণ হয়েছে।
৩️⃣ ‘কুষ্টা’ বা পাট গাছকে ঘিরে নামকরণ:
- এই অঞ্চলে প্রাচীনকাল থেকেই পাট (স্থানীয় ভাষায়: কুষ্টা) উৎপাদিত হত।
- সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলে (১৫৯২–১৬৬৬) এই অঞ্চল পাট ব্যবসাকেন্দ্রিক নৌবন্দর হিসেবে গড়ে ওঠে।
- অনেকের মতে, এই ‘কুষ্টা’ থেকেই কুষ্টিয়া নামের উদ্ভব।
৪️⃣ জনভাষায় প্রচলিত উচ্চারণ থেকে:
- এখনো বহু মানুষ কুষ্টিয়াকে ‘কুইষ্টে’ বা ‘কুষ্টে’ বলে।
- অতএব, ধারণা করা যায়, স্থানীয় উপভাষার ধ্বনিগত রূপান্তর থেকেই ‘কুষ্টিয়া’ নামটি এসেছে।
🗺️ প্রাকৃতিক ইতিহাস ও মানচিত্রে উল্লেখ
- খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে টলেমির মানচিত্রে গঙ্গা নদীর অববাহিকায় যে ক্ষুদ্র দ্বীপগুলো চিহ্নিত ছিল, অনেক ঐতিহাসিক তা-ই বর্তমান কুষ্টিয়া অঞ্চল বলে মনে করেন।
- কুষ্টিয়া নিজে কোনও প্রাচীন নগর ছিল না, বরং এটি নদীবিধৌত এক পাললিক সমতলভূমি, যেখানে কৃষিকাজ ও নদীবন্দর কেন্দ্রিক জনপদের বিকাশ ঘটেছে।
🕌 কুষ্টিয়ার নামের সঙ্গে ইতিহাস মিশে আছে এইসব গুরুত্বপূর্ণ চিহ্নে:
🔹 শিল্প–সংস্কৃতির মহারথী:
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিলাইদহ কুঠিবাড়ি
- ফকির লালন সাঁইজির মাজার ও আখড়া
- পাটের ইতিহাসঘেঁষা চাপড়া নৌবন্দর
- পুরনো বাজার ও কুমারখালীর প্রেস — বাংলা মুদ্রণ ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়

ফকির লালন সাঁইজির মাজার -কুষ্টিয়া জেলা
কুষ্টিয়া নামটি যেমন ইতিহাস আর সংস্কৃতির গন্ধে মিশে আছে, তেমনই এই নামের পেছনে রয়েছে নানা ভাষা, প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য এবং রাজনীতিক–অর্থনৈতিক বিকাশের ছাপ। কেউ বলেন ‘কুষ্টা’ থেকে, কেউ বলেন ‘কুশতহ’ থেকে, কেউ বলেন ‘কুষ্টি‘ বা ‘কুষ্টে‘ থেকে—সব মিলিয়ে কুষ্টিয়া নামকরণ একাধিক ধারা ও পরম্পরার ফসল।