বিচার চায় জিনিয়ার মা, শিক্ষকদের ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম
কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে একটি বিদ্যালয়ের ছাদে উঠে ধুমপান করার অভিযোগে পাঁচ ছাত্রীকে শিক্ষক কক্ষে ডেকে নিয়ে ভিডিও ধারণ, ব্যাগ কেড়ে নেওয়া এবং শারীরিক ও মানুষিকভাবে নির্যাতন করে এগুলো অভিভাবকদের মধ্যে ও অনলাইনে ছড়ানোর হুমকি দেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পরে বিদ্যালয় থেকে বাড়ি ফিরে স্কুল ড্রেস পরিধান করেই সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী জিনিয়া খাতুন মনকষ্ট নিয়ে গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করে। অপরদিকে নিহত ছাত্রীর জানাযায় গিয়ে গণপিটুনি ও হামলার শিকার হয়েছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুর রশিদ।

বিচার চায় জিনিয়ার মা, শিক্ষকদের ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম
উভয় ঘটনায় পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পালন করেছে নিহতের ও শিক্ষকরা। স্বজনরা অভিযুক্তদের বিচার চেয়ে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করে। আর শিক্ষকরা হামলাকারীদের শাস্তির দাবিতে প্রতিবাদ সভা করে।
বুধবার সকাল ১১ টার দিকে উপজেলার কয়া ইউনিয়নের সুলতানপুর মাহাতাবিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, বিদ্যালয়ের মাঠে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন। নিহত ছাত্রী মা, মামী, একাংশ ছাত্রীসহ প্রায় অর্ধশতাধিক ব্যক্তি একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বিদ্যালয় চত্বরে প্রবেশ করে। সেসময় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁদের শান্তনা দিয়ে ফিরিয়ে দেন। বিক্ষোভকারীদের হাতে ‘ জিনিয়া হত্যার বিচার চাই, আমাদের মেয়ে মরল কেন? বিচার চাই ‘ লেখা ফেস্টুন ছিল।
এসময় নিহত ছাত্রীর মা শান্তা খাতুন বলেন, স্যারেরা তাঁর মেয়েকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করেছে। তিনি বিদ্যালয়ে মেয়ে হত্যার বিচার চাইতে এসেছেন। জড়িতদের সঠিক বিচারের আশায় তিনি থানায় মামলা করবেন।
মামী মমতাজ খাতুন বলেন, তাঁদের মেয়ে সিগারেট খায়নি। তবুও তাকে স্যাররা দুইঘণ্টা রুমে আটকে রেখে শারীরিক ও মানুষিকভাবে নির্যাতন করেছে। স্যারের পা ধরেও বাঁচতে পারল না জিনিয়া। তিনি দোষীদের শাস্তি চান।
নাম প্রকাশে অনুচ্ছুক এক ছাত্রী বলেন, তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন। তিনি ও তাঁর বান্ধবী জিনিয়া সিগারেট খেয়েছিলনা। তবুও লাল্টু স্যার বারবার জিনিয়াকে বলছিল ‘ তোর ঠোট কালো, তুই সিগারেট খাইছিস, তোকে নায়িকা বানাবো, বিড়ি খাওয়া ছবি অনলাইনে ছাড়ে দেব ‘। আর ওলিদ স্যার ভিডিও করেছে।

অপরদিকে প্রধান শিক্ষকের উপর হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা ও দোষীদের শাস্তি চেয়ে বিদ্যালয়ের একটি শ্রেণি কক্ষে প্রতিবাদ সমাবেশ করে শিক্ষকরা। সমাবেশের আয়োজন করে জেলা শিক্ষক সমিতি। ওই বিদ্যালয়ের সভাপতি ও জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জিয়াউল ইসলাম স্বপনের সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য রাখেন জেলা শিক্ষক সমিতির জ্যেষ্ঠ সহ সভাপতি রুহুল আমীন, সাধারণ সম্পাদক মো. মাসুদুর রহমান, অতিরিক্ত সদস্য আব্দুর রহিমসহ প্রমূখ।
সভায় বক্তারা বলেন, শিক্ষার্থীরা তাঁদের কাছে সন্তানের মতো। জিনিয়ার মৃত্যুতে তাঁরা শোকাহত, মর্মাহত। কিন্তু শিক্ষকের উপর হামলা করা অতি নিন্দনীয় ও নেক্কারজনক কাজ। স্থানীয়দের উসকানীতে এ হামলার ঘটনা ঘটেছে। তবে হামলায় জিনিয়ার পরিবারের কেউ জড়িত নেই। কিন্তু যাঁরা জড়িত, তাঁদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আইনের আওতায় আনা না হলে কঠোর আন্দোলন, সংগ্রাম ও কর্মসূচি হুমকি দেন তাঁরা।
এবিষয়ে বিদ্যালয়ের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ও জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জিয়াউল ইসলাম স্বপন বলেন, আত্মহত্যার ঘটনায় তিনি মর্মাহত। বিদ্যালয়ের ঘটনায় প্রধান শিক্ষককে প্রধান করে তিনি পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। তাঁরা তিনকার্য দিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিবেন। তাঁর ভাষ্য, আত্মহত্যার ঘটনায় কোনো শিক্ষক জড়িত থাকলে তিনি আইনগত ব্যবস্থা নিবেন।
তিনি আরো বলেন, স্থানীয়দের উসকানীতে প্রধান শিক্ষকের বর্বর হামলা চালানো হয়েছে। হামলাকারীদের চিহৃত করে প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
জানা গেছে, গত সোমবার দুপুরে বিদ্যালয়ের ছাদে উঠে পাঁচ ছাত্রী ধুমপান করে। বিষয়টি জানতে পেরে বিদ্যালয়ের আয়া শিউলি খাতুন দেখে শিক্ষকদের জানান। পরে সহকারি শিক্ষক মশিউর রহমান লাল্টু ও মো. ওলিউর রহমান এবং একজন শিউলি খাতুন তাঁদের ডেকে এনে ভিডিও ধারণ করেন এবং অভিভাবকদের জানানো, অনলাইনে ছড়ানো ও টিসি দেওয়ার হুমকি দেন। এরপর বিদ্যালয় ছুটি শেষে বাড়ি দুই ছাত্রী নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। স্থানীয়রা তাদের জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও বিকেলে গলায় ফাঁস জিনিয়া খাতুন আত্মহত্যা করে। তিনি সুলতানপুর গ্রামের জিল্লুর রহমানের মেয়ে।
আরো জানা গেছে, ময়নাতদন্ত শেষে গত মঙ্গলবার সকালে মরদেহটি স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। দুপুরে মরদেহ নিয়ে সুলতানপুর বেলতলা বাজারে মানববন্ধন করে স্বজন ও এলাকাবাসী। সেসময় মরদেহ দেখতে আসেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুর রশিদ। এসময় উৎসুক জনতা প্রধান শিক্ষককে মারধর করে আহত করে। তিনি কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
অসুস্থ থাকায় কথা বলতে পারেনি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুর রশিদ। তবে তাঁর ছেলে তন্ময় মুঠোফোনে বলেন, তাঁর বাবা অসুস্থ। মামলা বিষয় প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
কুমারখালী থানার ওসি মো. আকিবুল ইসলাম বলেন, এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। এখন পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ পড়েনি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
