ঢাকা অফিস ॥ বিতর্কিত ধর্মীয় বক্তা মুফতি আমির হামজাকে সংসদ সদস্য পদে মনোনয়ন দেওয়াকে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ভণ্ডামির এক অকাট্য প্রমাণ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার পুরোনো উসকানিমূলক বক্তব্য নতুন করে আলোচনায় আসার পরও দলটির এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক জাহেদ উর রহমান এক ভিডিও মন্তব্যে বলেন, আমির হামজাকে প্রার্থী করা জামায়াতের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বেরই প্রকাশ। তার ভাষায়, যে দল নিজেদের ‘সৎ লোকের শাসন’ প্রতিষ্ঠার কথা বলে, তারাই এমন একজন ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিল, যাঁর বক্তব্য বারবার সহিংসতা, বিভাজন ও ঘৃণাকে উসকে দিয়েছে।
আমির হামজার অতীত বক্তব্যে একাধিকবার ভিন্নমতাবলম্বীদের ‘কাফের’, ‘নাস্তিক’ আখ্যা দেওয়া এবং তাদের জানাজা না দেওয়ার মতো মন্তব্যের অভিযোগ রয়েছে। এসব বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। মানবাধিকারকর্মী ও সচেতন নাগরিকদের মতে, এ ধরনের বক্তব্য শুধু মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সীমা ছাড়িয়ে যায় না, বরং সমাজে কাউকে হত্যাযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করার ঝুঁকি তৈরি করে। জাহেদ উর রহমান দাবি করেন, তিনি নিজেও এ ধরনের আক্রমণের শিকার হয়েছেন। তার মতে,রাজনৈতিক বা আদর্শগত মতভেদের কারণে কাউকে ধর্মীয়ভাবে অবিশ্বাসী ঘোষণা করা বাংলাদেশের মতো সমাজে ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। অতীতে এ ধরনের রাজনীতির ফল কী হয়েছে, তা দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
জামায়াতে ইসলামী প্রায়ই দাবি করে যে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তৃণমূল পর্যায়ের সব কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এমপি প্রার্থী মনোনয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে এই যুক্তি খাটে না। কারণ প্রার্থী নির্বাচন দলীয় সর্বোচ্চ পর্যায়ের অনুমোদনেই হয়ে থাকে। সে কারণে আমির হামজার মনোনয়ন জামায়াতের আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক অবস্থানকেই প্রতিফলিত করে। জাহেদ উর রহমান আরও বলেন, জামায়াত দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের একটি ‘পরিষ্কার’ ও ‘নৈতিক’ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে। কিন্তু এই মনোনয়ন সেই মুখোশ খুলে দিয়েছে। তার ভাষায়, এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং দলটি আসলে কাদের রাজনীতিকে প্রতিনিধিত্ব করে, তারই প্রকাশ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সহনশীলতা ও বহুত্ববাদ নিশ্চিত করা।
কিন্তু বিভাজনমূলক বক্তব্য দেওয়া ব্যক্তিকে সংসদে পাঠানোর উদ্যোগ সেই চ্যালেঞ্জকে আরও গভীর করে। তারা মনে করেন, এতে গণতন্ত্র, সংখ্যালঘু অধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়ে। এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এখনো কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা বা প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে দলটির একাধিক নেতা অতীতে দাবি করেছেন, ব্যক্তিগত বক্তব্যের দায় দল নেবে না। বিশ্লেষকদের মতে, এই যুক্তি মনোনয়নের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নয়। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে, জামায়াতে ইসলামী কি সত্যিই নৈতিক রাজনীতির কথা বলে, নাকি ক্ষমতার রাজনীতিতে টিকে থাকতে বিতর্কিত ও উসকানিমূলক চরিত্রকেই তারা বেছে নিচ্ছে? অনেকের মতে, আমির হামজার মনোনয়ন সেই প্রশ্নেরই স্পষ্ট উত্তর দিয়ে দিয়েছে। সচেতন ভোটারদের জন্য এই মনোনয়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করে দলগুলোর স্লোগানের চেয়ে প্রার্থী নির্বাচনই বলে দেয়, তারা আসলে কেমন রাজনীতি করতে চায়। সূত্র: ইনকিলাব অনলাইন ডেস্ক।
