কুমারখালীতে ছাত্রীর লাশ নিয়ে মানববন্ধন, স্কুলের প্রধান শিক্ষক কে গণপিটুনি
কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে বিচারের দাবিতে সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রীর মরদেহ নিয়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন এলাকাবাসী ও স্বজনরা। মঙ্গলবার (৮ আগষ্ট) বেলা পৌণে দুইটার দিকে কয়া ইউনিয়নের সুলতানপুর বেলতলা বাজার এলাকায় শতশত মানুষ কর্মসূচিতে অংশ গ্রহণ করেন।

কুমারখালীতে ছাত্রীর লাশ নিয়ে মানববন্ধন, স্কুলের প্রধান শিক্ষক কে গণপিটুনি
অপরদিকে মানববন্ধন চলাকালীন সময়ে ছাত্রীর মরদেহটি দেখতে আসেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুর রশিদ। এসময় উৎসুক জনতা প্রধান শিক্ষককে পিটিয়ে রক্তাক্ত আহত করে। পরে পুলিশ ও স্থানীয়রা আহত শিক্ষককে উদ্ধার করে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
নিহত ছাত্রীর নাম মোছা. জিনিয়া খাতুন (১৪)। তিনি কয়া ইউনিয়নের সুলতানপুর গ্রামের ব্যবসায়ী জিল্লুর রহমানের মেয়ে এবং সুলতানপুর মাহতাবিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। তিনি গত সোমবার বিকেলে নিজ ঘরে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, ‘ বিদ্যালয়ের ছাদে সিগারেট খাচ্ছিলেন পাঁচজন ছাত্রী। এদৃশ্য দেখে তা স্মার্টফোনে ভিডিও ধারণ করেন শিক্ষক মশিউর রহমান লাল্টু, মো. ওলিউর রহমান এবং একজন শিউলি খাতুন। তা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ব্লাকমেইল করে ছাত্রীদের শিক্ষক কক্ষে দুইঘণ্টা আটকে রেখে মারধর করে ব্যাগ কেড়ে নেন এবং টিসি ও অভিভাবকদের জানিয়ে দেওয়ার ভয় দেখান শিক্ষকরা। সেই অভিমানে গলাই ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন এক ছাত্রী। নদীতে ঝাঁপ দিয়ে প্রীতি খাতুন নামের আত্মহত্যার চেষ্টা করেন আরো এক ছাত্রী।’
তাঁরা আরো বলেন, ‘ শিক্ষকদের অসৌজন্যমূলক আচরণের কারণেই ওই ছাত্রী মারা গেছেন। আরো একজন আহত রয়েছে। শিক্ষককের উপযুক্ত শাস্তি ও ফাঁসির দাবি জানান।’
মেয়ে হারানোর শোকে মাতম হয়ে অসুস্থ মা ও বাবা জিল্লুর রহমান। তাঁরা কোনো কথা বলতে পারেননি। তবে নিহত ছাত্রীর মামা জাহিদ হোসেন জানান, সিগারেট খাওয়া দৃশ্য ধারণ করে লাল্টু ও ওলিউর রহমান নামে দুই শিক্ষক এবং আয়া শিউলি খাতুন ছাত্রীদের ব্লাকমেইল করে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করেছেন। তিনি থানায় মামলা করবেন।
প্রধান শিক্ষককে মারপিটেরর বিষয় জানতে চাইলে কয়া ইউনিয়ন পরিষদের ( ইউপি) ৫ নং ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বর ও নিহত ছাত্রীর নানা গাজীউর রহমান বলেন, ঘটনার এতো সময় পার হলেও শিক্ষকরা কোনো খোঁজ নেননি। মানববন্ধনের সময় প্রধান শিক্ষক আসলে জনগণ মারপিট করেছেন। তিনি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছেন।
আহত ছাত্রী প্রীতি খাতুন বলেন, কয়েকটি মেয়ে সিগারেট খেয়েছিল। কিন্তু তিনি ও তাঁর বান্ধবী জিনিয়া সিগারেট খাননি। পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তবুও শিক্ষকরা তাঁদের ডেকে নিয়ে দুই ঘণ্টা কক্ষে আটকে রেখে মারধর ও ভিডিও করেছে। সেই ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া ও টিসি দেওয়ার ভয় দেখান।
![]()
তাঁর বাবা লিটন প্রামাণিক বলেন, শিক্ষকরা অমানবিক আচরণ করেছেন। সেজন্য একজন মারা গেছে। তাঁর মেয়ে আহত রয়েছে। তিনি শিক্ষকদের উপযুক্ত শাস্তি চান।
এবিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক মশিউর রহমান ও ওলিউর রহমান বলেন, ‘ ছাত্রীদের মুখ শুকে সিগারেট খাওয়ার গন্ধ পাওয়া গিয়েছিল। সেজন্য তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে স্কুল ব্যাগ কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শারীরিক বা মানসিক চর্চার বা ভিডিও ধারণ করা হয়নি। ‘
আহত প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুর রশিদ বলেন, তিনি সোমবার বিদ্যালয়ে ঘটনার সময় উপজেলা শিক্ষাকার্যালয়ে ছিলেন। রাতে জানতে পারেন ঘটনা। মঙ্গলবার সকালে বিদ্যালয়ে এসে ঘটনার তদন্ত করার জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ব্যস্ততার কারণে লাশ দেখতে যেতে পারেননি তিনি। দুপুরে জানাযায় অংশ নিতে গেলে তাঁর ওপর হামলা চালানো হয়েছে। তিনি আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. কাজী এজাজ কায়সার বলেন, তিনি সকালে বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছেন। ভিভিও নয়, শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের কথা রেকোর্ডিং করেছিলেন। তাঁর ভাষ্য, প্রধান শিক্ষককে মারপিট ও সপ্তর শ্রেণির ছাত্রীর আত্মহত্যার ঘটনা নেক্কারজনক।
কুমারখালী থানার ওসি মো. আকিবুল ইসলাম বলেন, মরদেহটি ময়না তদন্ত শেষে পরিবার নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত লিখিত কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
তিনি আরো বলেন, জানাযায় অংশ নিতে আসলে একটি পক্ষ উসকানী দিয়ে প্রধান শিক্ষকের ওপর হামলা চালিয়েছে। পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও শিক্ষককে শেষরক্ষা করতে পারিনি। বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত স্বাপক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
