কুষ্টিয়া পৌরসভায় টেন্ডার ছিনতাই ও চুরির অভিযোগে পৃথক দুটি মামলা
কুষ্টিয়ায় প্রকাশ্য দিবালোকে সন্ত্রাসী কায়দায় টেন্ডার (দরপত্র) ছিনতাইয়ের অভিযোগ ও মেয়র কার্যালয়ে গ্রীল কেটে দড়জার তালা ভেঙ্গে কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক, গুরুত্বপূর্ন ফাইলপত্র ও নগদ টাকাসহ প্রায় সাড়ে ৮লক্ষ টাকা চুরির অভিযোগে পৃথক দুটি মামলা হয়েছে কুষ্টিয়া মডেল থানায়।

কুষ্টিয়া পৌরসভায় টেন্ডার ছিনতাই ও চুরির অভিযোগে পৃথক দুটি মামলা
রবিবার রাতে মামলা দুটি রেকর্ড করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন অফিসার ইনচার্জ। ১৭লক্ষ টাকার বিডিসহ টেন্ডার ছিনতাইয়ের অভিযোগে ভুক্তভোগী ইব্রাহিম হোসেনের করা মামলায় ৬জনের নামোল্লেখসহ ২০/২৫ জন অজ্ঞাতনামা এবং চুরির ঘটনায় পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা মাহমুদ রেজা চৌধুরী বাদি হয়ে করা মামলাটি অজ্ঞাত আসামীদের বিরুদ্ধে এজাহার দেয়া হয় বলে পুলিশ সূত্রে নিশ্চিত করেছে।
তবে মেয়র কার্যালয়ের সিসি ক্যামেরার আওতায় টেন্ডার ছিনতাই এবং চুরির ঘটনায় সিসি ক্যামেরা ভাঙ্গা কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক চুরি; দুটি ঘটনার মধ্যেই নিবির যোগসূত্র রয়েছে বলে মনে করছে পুলিশ।
টেন্ডার ছিনতাইয়ের অভিযোগে দ্রুত বিচার আইনে করা মামলার এজাহারভুক্তরা হলেন কুষ্টিয়া পৌর সভার ০৮নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ কৌশিক আহমেদ ওরফে বিচ্ছু (৪০), ০৫ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আফিল উদ্দিন (৫০), কুষ্টিয়া শহর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক আমলাড়ার বাসিন্দা গৌতম চাকীর ছেলে মানব চাকী (৩০), কুষ্টিয়া সরকারী কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি কোর্টপাড়ার বাসিন্দা মৃত: দুলাল সেখের ছেলে ফেরদৌস খন্দকার(৩৫), আড়ুয়াপাড়ার বাসিন্দা আনিস কোরাইশীর ছেলে হাসিব কোরাইশী(২৭) এবং আমলাপাড়ার বাসিন্দা বিজন ঘোষের ছেলে সুজন ঘোষ(৩৫)সহ অজ্ঞাত আরও ২০/২৫জনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অপরদিকে মেয়র কার্যালয়ে চুরির ঘটনায় করা মামলাটি অজ্ঞাত আসামীদের বিরুদ্ধে করা হয়েছে বলে এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কুষ্টিয়া মডেল থানার উপ পুলিশ পরিদর্শক দিপঙ্কর কুমার দেবনাথ জানিয়েছেন।
টেন্ডার ছিনতাই মামলার এজাহার সূত্রে জানায়, গত ২৩ ফেব্রুয়ারী,২০২৩ দুপুর পৌনে ১টায় আমি মেয়র কার্যালয়ের বারান্দায় রক্ষিত টেন্ডার বক্সে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে (২০২৩-২০২৪ অর্থ বছরের জন্য) পৌর এলাকাধীন ১০টি হাট বাজার ইজারার দরপত্র নির্ধারিত সকল শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ফেলতে যায়। এসময় সেখানে পূর্ব হতেই ওত পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা আকস্মিক আমার হাত থেকে জোড়পূর্বক দরপত্র ছিনিয়ে নেয়। ওরা আমার কাছ থেকে দরপত্র ছিনিয়ে নিয়ে নিচে ফেলে দেয়। সেখানে সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসীদের অপর সহযোগিরা দরপত্রগুলি টেনে ছিড়ে কয়েকটি পাশ্বস্ত ড্রেনে ফেলে দেয় এবং আরও কয়েকটি ছিনিয়ে নিয়ে চলে যায়। এসময় দোতালার সন্ত্রাসীরা আমাকে শারিবীক ভাবে লাঞ্চিত করে’। ঘটনার সময় সখানে নিরাপত্তা রক্ষায় ষ্ট্যান্ডবাই কুষ্টিয়া মডেল থানার পুলিশ উপস্থিত থাকলেও আমাকে কোন সাহায্য করেনি’। ওরা আমার ব্যাংক সিডিগুলি ছিড়ে ফেলেছে এবং ছিনিয়ে নিয়ে গেছে, আমি এখন চরম অসহায় এবং নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। একই সাথে প্রায় ১৭লক্ষ টাকার বিডি ছিনিয়ে নেয়ায় আমি আর্থিকভাবেও চরম সংকটের মুখে।
তবে এবিষয়ে পৌর সভার ০৮নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ কৌশিক আহমেদ ওরফে বিচ্ছু বলেন, ‘দেখুন আমি ঘটনা সম্পর্কে কিছুই জানিনা, অথচ আমার নামে মামলা হয়েছে শুনছি, এটা আমার বিরুদ্ধে একটা পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই না’।
এবিষয়ে অভিযুক্ত কুষ্টিয়া শহর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাসিব কোরাইশী মুঠোফোনে আলাপকালে বলেন, ‘ঘটনাটি আমি শুনেছি, তবে এঘনায় আমি বা আমার কোন লোকজন জড়িত নয়’।
তবে এবিষয়ে কুষ্টিয়া শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কুষ্টিয়া সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতা মুঠোফোনে আলাপকালে জানান, ‘এখানে মামলার এজাহারে যাদের নাম এসেছে তারা আমার কোন লোক নয়। কেউ হয়ত আমার নাম ভাঙ্গিয়ে এসব করতে পারে। এরা দলের অন্যকোন শাখার নেতাকর্মী হতে পারে’।
কুষ্টিয়া শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি তাইজাল আলী খান বলেন, ‘দেখুন শহর আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পদধারীদের বিরুদ্ধে টেন্ডার ছিনতাই অভিযোগে মামলা হয়েছে, সেবিষয়ে আমি সঠিক কিছু জানিনা, যিনি মামলা করেছেন তিনি তো বুঝে শুনেই মামলা করেছেন, তিনি বুঝবেন, আইন আইনের গতিতে চলবে’।
এদিকে কুষ্টিয়া পৌরসভার মেয়র আনোয়ার আলীর কার্যালয়ের আশপাশের সিসি ক্যামেরা ভেঙ্গে গ্রীল কেটে দড়জার তালা ভেঙ্গে দুর্ধর্ষ চুরির ঘটনায় রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে মেয়র আনোয়ার আলী বলেন, ‘ আমার কার্যালয়ের গ্রীল কেটে তালা ভেঙ্গে ভিতরে প্রবেশ করে ড্রয়ার ভেঙ্গে ফাইলপত্র তছনছ করেছে, এখানে তো এমন কোন টাকা পয়সাও থাকে না যে ওগুলি চুরি করবে। তবে যারাই একাজটি করুক, তারা মূলত: আমাকে হেয় করার জন্য এবং পৌরসভার ভাবমুর্তি খুন্ন করার জন্য করেছে। তারা কৌশলে পৌর চত্বরের সকল সিসি ক্যামেরা ঘুরিয়ে দিয়েছে, পার্শ্ববর্তী শিল্পকলা একাডেমী ভবনের ক্যামেরা পর্যন্ত ঘুরিয়ে দিয়েছে। যারাই করুক এর সাথে যে বড় বড় মাথা কাজ করেছে সে বিষয়টা পরিস্কার। আমি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে সব কিছু বলেছি, কারা কি কারনে করেছে সেসবও বলেছি। যারাই করুক তাদের কোন রেহায় দেয়া হবেনা, চরম মূল্য দেয়া লাগবে তাদের’। কম্পিউটারের হার্ডডিস্কসহ কিছু ডিভাইস চুরির বিষয়টি দরপত্র ছিনতাইয়ে সাথে যোগসাজস আছে কিনা সেবিষয়েও খতিয়ে দেখতে পুলিশকে বলা হয়েছে’।
কুষ্টিয়া মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (ওসি) দেলোয়ার হোসেন খান বলেন, ‘কুষ্টিয়া পৌরসভার মেয়রের কার্যালয়ে রাতে গ্রীল কেটে এবং রুমের তালা ভেঙ্গে চুরির ঘটনায় এবং দরপত্র দাখিয়ে বাধাদানসহ ছিনিয়ে নেয়া এবং আইন শৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন আইন (দ্রুত বিচার আইন)এ পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। মামলায় এজাহারভুক্তদের কার কি পরিচয় আইনে সেটা দেখার কোন সুযোগ নেই। যারাই এই চুরির সাথে জড়িত থাক তাদের খুব শীঘ্রই সনাক্ত করে গ্রেফতার করবে পুলিশ। তথ্য প্রযুক্তির যুগে এসব করে পার পাওয়ার কোন সুযোগ নেই’
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার দুপুরে মেয়রের কার্যালয়ের বারান্দায় রক্ষিত টেন্ডার বক্সে হাট বাজার ইজারা দরপত্র ফেলতে গিয়ে একজন দরদাতা সেখানে পূর্ব হতেই ওৎ পেতে থাকা কুষ্টিয়া শহর আওয়ামী লীগসহ অঙ্গ সংগঠনের নেতাদের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে লাঞ্চিত হন এবং তার কাছে থাকা ১০টি দরপত্র পুলিশের সামনেই ছিনিয়ে নিয়ে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায় বলে ওই দরদাতা ইব্রাহিম হোসেনের অভিযোগ। ওই ঘটনার পুরা সিসি ফুটেজ ব্যাপক ভাবে সোস্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে জেলাজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। বিষয়গুলি ব্যাপকভাবে গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ায় অনেকটা বাধ্য হয়েই ঘটনার চারদিন পর মামলা রেকর্ড করেছে পুলিশ অভিযোগ এজাহারকারীর।
