খোকসা প্রতিনিধি ॥ এক সময় যে পল্লী ছিল আনন্দমুখর, গ্রামগুলোর ভেতর দিয়ে হেঁটে গেলে শোনা যেত তাঁতকলের খটখট শব্দ। সেই খটখট শব্দের তালে কারিগরদের কণ্ঠে শোনা যেত জারি সারি, ভাটিয়ালী গান। সে তাঁতপল্লীর গ্রামগুলো আজ নীরব। অধিকাংশ তাঁতকল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কারিগরদের পরিবারে নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে অভাব। প্রয়োজনীয় মূলধনের অভাব, কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার সংকটে অনেক তাঁত শিল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমিক ও মালিকরা পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছে।
অনেকেই লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে তাঁত বন্ধ করতে বাধ্য হন। এছাড়াও চরম অর্থ সংকট ও সহজ শর্তে ঋণ না পাওয়ার কারণে তাঁত শিল্প আজ বিলুপ্তির পথে। কুষ্টিয়ার খোকসায় এক দশক আগে প্রায় হাজার খানেক তাঁতকল সচল থাকলেও বর্তমানে রয়েছে মাত্র ৫০টির মতো। জানা গেছে, তাঁতিপাড়ায় তাঁতের তৈরি লুঙ্গি, শাড়ি ও গামছা উৎপাদন হতো। এখন বেশির ভাগ এলাকায় তাঁত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁত শ্রমিকরা বিভিন্ন পেশায় যেতে বাধ্য হয়েছে। বুধবার (০৮ অক্টোবর) দুপুরে উপজেলার পৌর এলাকার কালীবাড়ি পাড়া সড়ক দিয়ে যেতে শোনা যাচ্ছিল তাঁতের খটখট শব্দ।
বাপ-দাদার আমলের পেশা ধরে রেখেছেন এ এলাকার কয়েকজন তাঁতী। কালীবাড়ি পাড়া এলাকার মো. ইমামত আলী বলেন, কাপড়ের দামের চেয়ে সুতার দাম বেশি হওয়ায় তৈরি করে বাজারে বিক্রি করেও তেমন লাভ হয় না। এক তাঁতে ৪ পিস লুঙ্গি তৈরি হয়, এতে ব্যয় হয় ৫০০ টাকা আর বিক্রি হয় ৬৩০ টাকা। তাও পাশ্ববর্তী উপজেলা কুমারখালী থেকে সুতা এনে তৈরি করার পর আবার কাপড় কুমারখালীতে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করতে হয়। এতে শ্রমিকের বেতন, যাতায়াতসহ আনুষঙ্গিক খরচ পোষাতে পারি না। শুধু বাপ-দাদার ঐতিহ্য রক্ষার্থে শ্রমিক বাদ দিয়ে আমরা পরিবারের ৫ জন সদস্য শ্রম দিচ্ছি।
কমলাপুর এলাকার তুহিন ইসলাম বলেন, উপজেলার তাঁত শিল্প প্রায় বিলুপ্তির পথে। আমরা এখন তাঁত শিল্প নিয়ে বিপাকে পড়েছি। বাপ-দাদার ঐতিহ্য ধরে রাখতে গিয়ে লোকসান গুনতে হচ্ছে। সেক্ষেত্রে অর্থাভাবের কারণে ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। তাই এ তাঁত শিল্প ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।
অনেক তাঁতী এ শিল্প ছেড়ে কৃষি ও অন্যান্য পেশায় যোগ দিচ্ছেন। সরকার যদি নতুন উদ্যোগ নিয়ে আমাদের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে বাপ-দাদার গড়ে তোলা এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে। তাঁতী জুলমত আলী বলেন, কাঁচামাল—সাগু, আতপ চাল, সোহাগা, রং, সুতা এসব উপকরণের দাম বৃদ্ধি পেলেও কাপড়ের দাম না বাড়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে। এ কারণে ৫টি তাঁত কারখানার মধ্যে সচল রেখেছি মাত্র একটি। অর্থাভাবে এটিও বন্ধ করে দিতে হতে পারে।
