ঘুষ ছাড়া কাজ করেন না কুষ্টিয়ার সাব-রেজিস্ট্রার রাসেল মল্লিক - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

ঘুষ ছাড়া কাজ করেন না কুষ্টিয়ার সাব-রেজিস্ট্রার রাসেল মল্লিক

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: আগস্ট ৪, ২০২৪

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া জেলা রেজিস্ট্রার কর্যালয়ের সাব-রেজিষ্ট্রার রাসেল মল্লিকের বিরুদ্ধে পাহাড় সমান অভিযোগ। ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না তার অফিসে। সেই সাথে জমি রেজিস্ট্রি করতে আসা সাধারণ মানুষের সাথে র্দূব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। চাহিদা মত ঘুষ না দিলে বন্ধ রাখা হয় জমি রেজিস্ট্রির কাজ। জমি রেজিস্ট্রর আগেই তিনি ঘুষের অংক নির্ধারণ করে দেন বলে জানিয়েছেন একাধিক ভুক্তভোগী।

ঘুষ বাণিজ্যের সাথে জড়িত এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ায় প্রশাসনের স্বচ্ছতার বিরুদ্ধেও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। কুষ্টিয়া জেলা রেজিস্ট্রার কর্যালয়ের এক দলিল লেখকের সাথে কথা বলেও তার ঘুষ বাণিজ্যে সত্যতা পাওয়া গেছে।

তার ভাষ্যমতে, অপকর্ম গোপন রাখতে কিছু দলিল লেখক দিয়ে অফিসের গোপন নথিসহ অর্থ লেনদেনের কাজ করান অসাধু এই সাব-রেজিস্ট্রার রাসেল মল্লিক। আর বাধ্য হয়েছে ঘুষ দিয়ে নিরবে কাজ করেন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে আসা সেবা গ্রহীতারা।

এছাড়াও নিবন্ধন বাতিলের ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাননা দলিল লেখকরা। চাহিদা মত ঘুষের টাকা না দিলেই পোহাতে হয় নানা জটিলতা। আর সাব-রেজিস্ট্রার রাসেল মল্লিকের অনুসারি দালালদের ঘুষের টাকা দিলেই সহজেই জমি নিবন্ধনের কাজ করিয়ে দেন তিনি। সেক্ষেত্রে কাগজপত্রে সমস্যা থাকলেও ঠিকমতো যাচাই করা হয় না। আর দালাল ছাড়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গেলে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়, ঘুরতে হয় মাসের পর মাস।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দলিল লেখক জানান, রাসেল স্যার একটা ফালতু লোক। কাজ কাম নিয়ে গেলে খালি ঝামেলা করে। টাকা না দিলে কাজ করেনা সব দলিলে টাকাও খায় দুর্নিত করে। এখন কিছু বলার মতো নাই প্রতিবাদ করলে কাজ বন্ধ করে দিবে। ভুক্তভোগী রাজন জানান, আমাদের জমির বন্টন নামা করার জন্য কুষ্টিয়া জেলা রেজিস্ট্রার অফিসে যায়। বন্টন নামা করার জন্য সরকারি ভাবে দুই হাজার টাকা লাগে বলে জানান দলিল লেখক চাঁদ ।

কিন্তু রেজিষ্ট্রি করতে গেলে  সাব-রেজিষ্ট্রারকে ১ লক্ষ টাকা দেয়া লাগবে। রেজিষ্ট্রি করার আগেই এই টাকা চেয়ে রাখেন, না দিলে কাজ করবেন না সাব-রেজিষ্ট্রার রাসেল মল্লিক। এতো টাকা দিয়েতো আর বন্টন নামা করতে পারবো না। তাই চলে এসেছি। তিনি নাকি টাকা না দিলে ফাইল ধরেন না। আমি চাই এটার একটা সমাধান হোক।

মোরশেদ নামের এক ভুক্তভোগী আরও জানান, আমি মতিন নামের এক জনকে কাজ করতে দিয়েছিলাম। ছয় লক্ষ টাকার দলিল রেজিষ্ট্রি করতে এক লক্ষ টাকা চায়। কিন্তু সরকারি বিধি মোতাবেক ফি ৩৮ হাজার টাকা হয়, সেখানে আমি ৬০ হাজার টাকা জমা দিয়েছি তাও আমার দোকানের দলিল রেজিষ্ট্রি করে দেয় নাই। তাই আমি কাজ না করেই চলে এসেছি। আমিও শুনেছি সাব-রেজিষ্ট্রার নাকি অনেক টাকা খায়।

কুষ্টিয়া সদরের নিহত এক যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার ক্যান্সার আক্রান্ত স্ত্রী জমি রেজিস্ট্রি করতে গেলে তাকেও ঘুরানো হয় মাসের পর মাস। সর্বশেষ গত সপ্তাহে তাকে একবার জমি রেজিস্ট্রি না করে ফেরত পাঠানো হয়। কারণ হিসাবে সাব রেজিস্ট্রার রাসেল মল্লিক জানান, শুধু একজন হওয়ায় আজ আপনার জমি রেজিস্ট্রি করা হবে না। সেই সময় রাসেল মল্লিক আরো বলেন, আমি শুধু একজনের কাজ করতে পারবো না। তাই আপনি পরের ডেটে আসেন। এছাড়াও ঐ মুক্তিযোদ্ধার ক্যান্সার আক্রান্ত স্ত্রী আরো জানান, জমি রেজিস্ট্রি করার সময় মানুষের সামনে উনি যাচ্ছে তাই ব্যবহার করে আপমান করেন। আমার জমি আমি যাকে খুশি রেজিস্ট্রি করে দিবো উনি এত পার্সোনাল কথা জানতে চাওয়ার কে। উনার মত অভদ্র লোক হয় না।

কুষ্টিয়া জেলা রেজিস্ট্রার অফিসে আসার আগে তিনি মিরপুর সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসের দায়িত্ব পালন করেছেন। মিরপুর সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসের দায়িত্ব পালন কালে তিনি সাবেক কেরানি আতাউল ইসলামের ভাই রাজিব অফিসের সব অবৈধ অর্থ লেনদেন করতেন বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসছে। দলিল রেজিষ্ট্রির সময় কোন দলিল লেখক কয়টি দলিল রেজিষ্ট্রি করতে এসেছেন তা রেজিষ্ট্রারের পাসে বসে তালিকা করেন সাব রেজিষ্ট্রারের সহকারী। অফিসের কাজ শেষে বাসায় যাবার পূর্বে সাব-রেজিষ্ট্রার রাসেল মল্লিক রাজিবকে পাঠাতেন তালিকা করে রাখা প্রতিটি দলিল লেখকদের থেকে উৎকোচ এর টাকা সংগ্রহ করতে।

এমনটি অভিযোগ করে ছিলেন মিরপুর সাব রেজিস্ট্রার অফিসের দলিল লেখকেরা। এ বিষয়ে কুষ্টিয়া সাব-রেজিস্ট্রি কর্যালয়ের দলিল লেখক চাঁদকে মুঠোফোনে একটি জমি সংক্রান্ত বিষয়ে ফোন করলে তিনি বলেন, ১ লক্ষ টাকা না দিলে সাব রেজিস্টার কাজ করবে না। অথচ ঐ কাজের সরকার নির্ধারিত ফি মাত্র ৩৮ হাজার টাকা। এ বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা রেজিস্ট্রার কর্যালয়ের দলিল লেখক সমিতির সভাপতি লাইজুর সাথে কথা হলে মুঠোফোন তিনি জানান, মিরপুর জ্বালিয়ে শেষ করে আজ দুই মাস আমাদের এখানে এসেছে। উনার কারণে গ্রামের মানুষজন তো জমি রেজিষ্ট্রি করতেই আসেনা। অনেকেই অপেক্ষায় আছে এই সাব-রেজিষ্ট্রার চলে গেলে তারপর জমি রেজেস্ট্রি করতে আসবে। উনি আসার পর আমরাও শান্তিতে নাই।

একজন জায়গা বিক্রয় করতে গেলে নানা রকমের প্রশ্ন করেন। আপনি কেন জমি বিক্রি করবেন, সহ ইত্যাদি ইত্যাদি। মানুষ নিজের জমি নিজে বিক্রি করবে তাতে সাব-রেজিস্ট্রারের এত সমস্যা কেন। এটাতো সরকারের আইন, যার জমি সে বিক্রি করতেই পারে। আর তার খাজলত খারাপ বলে আমিও তার সাথে কথা বলি না। কোনো দলিল নিয়ে গেলে জমি যে কিনেছে তার সাথে সরাসরি ডিল করেন সাব-রেজিস্ট্রার রাসেল মল্লিক । আমরা এর জন্য কথা বলি না, তার যা হওয়ার হোক, আমরা কিছইু বলবো না।

কুষ্টিয়া সদর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের সাব-রেজিস্ট্রার রাসেল মল্লিকের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেন নাই।

এই বিষয়ে জানতে কুষ্টিয়া সদরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ রিফাতুল ইসলামের মুঠোফোন যোগাযোগ করা হলে তিনি এই বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা জেলা প্রশাসকের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন।

জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পার্থ প্রতীম শীল জানান, লিখিত অভিযোগ পাইলে আমরা বিষয়টি উর্দ্ধতন কর্মকর্তাকে জানবো। জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক এহেতেশাম রেজা বলেন, আমি বিষয়টি আপনার কাছ থেকে জানলাম। তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।