নিজ সংবাদ ॥ সাত স্ত্রীকে নিয়ে সুখের সংসার কুষ্টিয়ার রবিজুলকে নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে এমন শিরোনাম ভাইরাল হওয়ার পর থেকে তার সংসারে নেমে এসেছে সমাজের মাতুব্বরদের চাপ। মাস চারেক আগে ষষ্ঠ স্ত্রী নিজ থেকে তালাক দিয়ে চলে গেছেন। এখন ছয় স্ত্রী ও পাঁচ সন্তান নিয়ে তার সংসার।
এদিকে, গ্রামের ২২ মাতুব্বর এক হয়ে ইসলামী শরিয়ত মানাতে দুই জন স্ত্রীকে তালাক দিতে বাধ্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন রবিজুল। মাতুব্বররা বিচার ডেকে তাকে লাঞ্ছিত ও দুই স্ত্রীকে গ্রাম থেকে বের করে দিয়েছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
গতকাল শনিবার (৮ জুন) সকাল ১০টায় কুষ্টিয়া সদর উপজেলার পাটিকাবাড়ী ইউনিয়নের পাটিকাবাড়ী বাজারে ২২ জন মাতুব্ববের উপস্থিতিতে তাকে লাঞ্ছিত করা হয়। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মাতুব্বররা।
রবিজুল ইসলাম (৪০) পাটিকাবাড়ী গ্রামের মিয়াপাড়ার আয়নাল মন্ডলের ছেলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সকাল ১০টায় গ্রামের ২২ জন মাতুব্বর এক হয়ে পাটিকাবাড়ী বাজারে সামাজিক বৈঠক ডাকেন। সেখানে রবিজুলকেও ডেকে আনেন তারা। বৈঠকে প্রধানের ভূমিকা পালন করেন স্থানীয় মাতুব্বর নাজিম মন্ডল। ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সফর উদ্দিন, লিটন মন্ডল, মাজিলা দারুস সুন্নাহ বহুমূখী মাদ্রাসার মুহতামিম হাফেজ মাওলানা মুফতি আলমগীর হোসাইন, পাটিকাবাড়ী বায়তুল আমান জামে মসজিদের পেশ ঈমাম মাওলানা মীর শফিকুল ইসলাম, পাটিকাবাড়ী হেফজখানা ও বহুমূখী মাদ্রাসার শিক্ষক মিজানুর রহমান, মাজিলা পশ্চিমপাড়া দারুলউলুম হাফিজীয়া ক্বারিয়ানা মাদ্রাসার মুহতামিম ক্বারী মশিউর রহমান প্রমুখ গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে শরিয়ত মোতাবেক চারের অধিক স্ত্রী রাখার বিধান না থাকার ইসলামী ব্যাখ্যা দেন হাফেজ মাওলানা মুফতি আলমগীর হোসাইন। এ সময় রবিজুলের ৫ম ও ৭ম স্ত্রী উপস্থিত ছিলেন।
রবিজুল ইসলাম বলেন, ‘গ্রামের ২২ মাতুব্বর নিজেরা এক হয়ে সামাজিক বৈঠক ডেকে আমাকে উপস্থিত হতে বলেন। আমি তাদের বলেছিলাম, এ জন্য আমার সময় প্রয়োজন। কারণ আমি যাদের বিয়ে করেছি, তারা সবাই গরিব ঘরের সন্তান। তাদের চলার মতো একটা অবস্থা তৈরি করে পরবর্তীতে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। তারা আমার কথা না মেনে তাদের নিজেদের মতো করে আমার দুই স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার জন্য জোর করে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করে নেন। আমি তাদের তালাক দিতে চাই না। সালিশের পর তারা আমার দুই স্ত্রীকে গ্রাম থেকে বের করে দিয়েছেন। আমাকে এবং আমার মামাকে লাঞ্ছিত করেছেন। আমি এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবো।
এ বিষয়ে রবিজুলের স্ত্রী বানু ও মিতা বলেন, গ্রামের মাতব্বররা স্বামীর বাড়ি থেকে আমাদের বের করে দিয়েছে। স্বামীর বিরুদ্ধে আমাদের কোনো অভিযোগ নেই। গ্রামের মাতব্বররা জোর করে ভয়ভীতি দেখিয়ে দলিলে সই নিয়েছে এবং স্বামীর বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। স্বামীর ঘরে আমরা সুখে-শান্তিতে ছিলাম। স্বামীর ঘরে ফিরতে চাই, সুন্দরভাবে সংসার করতে চাই। যারা আমাদের সঙ্গে অন্যায় কাজ করেছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেব, থানায় মামলা করব।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য পাটিকাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রোকনুজ্জামান কানু, ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মতিউর রহমান ও মাতব্বরদের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করলেও তারা রিসিভ করেননি।
অভিযোগের বিষয়ে বৈঠকের প্রধান নাজিম মন্ডল বলেন, ‘ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক চার স্ত্রীর বেশি রাখার বিধান নেই। সামাজিকভাবে বসে আমরা তাকে সেটাই বোঝাতে চেয়েছিলাম।
স্ত্রীদের তালাক দিতে আপনারা বাধ্য করতে পারেন কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘রবিজুল তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেবেন বলে নিজে অঙ্গীকার করেছেন। আমরা তাকে বাধ্য করিনি, তাকে মারধরও করিনি।
সামাজিক বৈঠকে উপস্থিত পাটিকাবাড়ী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান সফর উদ্দিন বলেন, এটা অবৈধ বিয়ে। আমরা তাকে বাধ্য করিনি। তার দুই বউ মেনে নিয়েছেন। তাদের কাবিন ও খোরপোশ বাবদ দুই লাখ টাকাও দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে পাটিকাবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান শেখ রেজভিউজ্জামান বলেন, ‘আমি বিভিন্ন মাধ্যমে বৈঠকের বিষয়টি জেনেছি। যেহেতু আমাকে কেউ বৈঠকে উপস্থিত থাকতে বলেননি, তাই আমি এ ব্যাপারে তেমন কিছু জানি না।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, দরিদ্র পরিবারের সন্তান রবিজুল মাত্র ১৩ বছর বয়সে বিয়ে করেন জেলার মিরপুর উপজেলার বালুচর গ্রামের কিশোরী রুবিনা খাতুনকে। বিয়ের দুই বছরের মাথায় এই দম্পতির এক ছেলের জন্ম হয়। পরে বউ ও সন্তান বাড়ি রেখে লিবিয়া পাড়ি জমান রবিজুল। সেখানে টাইলসের কাজ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। পরে লিবিয়াতে পরিচয় হয় কিশোরগঞ্জের সদর উপজেলার হেলেনা খাতুনের সঙ্গে। পরে তারা দুই জন সম্পর্কে জড়ান এবং একপর্যায়ে তাদের বিয়ে হয়। তাৎক্ষণিক প্রথম স্ত্রীকে বিষয়টি না জানালেও পরে জানার পর তিনি এ বিয়ে মেনে নেন। এরপর প্রথম স্ত্রী রুবিনাকেও লিবিয়া নিয়ে যান রবিজুল। সেখানে দুই স্ত্রী এবং সন্তান নিয়ে ১২ বছর বাস করেন তিনি। এরপর দেশে ফিরে বাপের ভিটায় দুই তলা বাড়ি নির্মাণ করেন। এর কিছু দিন পরে মোবাইল ফোনে প্রেমের সম্পর্ক হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জের নুরুন্নাহারের সঙ্গে। পরে নুরুন্নাহারকে বিয়ে করেন রবিজুল। তবে নুরুন্নাহারের অভিযোগ সম্পর্কের শুরুতে তিনি জানতেন রবিজুলের স্ত্রী আছে।
রবিজুলের দাবি, মায়ের মানত রক্ষায় ধারাবাহিকভাবে তিনি চতুর্থ বিয়ে করেন। তার চতুর্থ স্ত্রীর নাম স্বপ্না খাতুন। বাড়ি চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার শ্রীরামপুর গ্রামে। এরপর তিন মাসে পরপর তিনটি বিয়ে করেন রবিজুল। তার পঞ্চম স্ত্রীর নাম বানু খাতুন, বাড়ি আলমডাঙ্গা উপজেলার ডম্বলপুর গ্রামে। ষষ্ঠ স্ত্রীর নাম রিতা আক্তার। তার বাড়ি জেলার মিরপুর উপজেলার পোড়াদাহ ইউনিয়নে। সর্বশেষ বিয়ে করা সপ্তম স্ত্রী মিতা খাতুনের বাড়ি সদর উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামে।
দুই তলা বাড়ির সাতটি কক্ষে বসবাস করেন স্ত্রীরা। প্রত্যেক স্ত্রীর শয়নকক্ষ আসবাবপত্র দিয়ে সাজিয়ে দিয়েছেন একইভাবে। তবে রবিজুলের দাবি, ‘বিধি সম্মত না হলেও’ তার স্ত্রীদের কারও অভিযোগ নেই। একসঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবেই তারা সংসার করছেন।
একাধিক বিয়ের ব্যাপারে বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন কুষ্টিয়ার উপপরিচালক মো. হেলাল উজ জামান বলেন, শরিয়া অনুযায়ী শর্ত সাপেক্ষে কোনো ব্যক্তি সর্বোচ্চ চারটি বিয়ে করতে পারেন। এ জন্য আগের সব স্ত্রীর অনুমতি থাকতে হবে। দাম্পত্য জীবনে সব স্ত্রীর সমঅধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এর বাইরে অতিরিক্ত কোনো স্ত্রী গ্রহণের বিধান নেই।
সামাজিক বৈঠকে জোরপূর্বক তালাক দিতে বাধ্য করা যায় কি-না প্রসঙ্গে কুষ্টিয়া জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) অনুপ কুমার নন্দী বলেন, সামাজিক বৈঠকে চাপ দিয়ে কাউকে তালাক দিতে বাধ্য করানো আইনের চোখে অপরাধ।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পার্থ প্রতিম শীল জানান, দ্ইু পক্ষের সমঝোতার ভিত্তিতে সেটা ভিন্ন। জোর জবরদস্তির কোনো সুযোগ নেই।
